২৯শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
চা ছেড়ে ‘স্পেশাল্টি কফি’তে মজে কলকাতার নতুন জেনারেশন?

চা বনাম কফি — দুই জেনারেশন। ছবি:AI

চা ছেড়ে ‘স্পেশাল্টি কফি’তে মজে কলকাতার নতুন জেনারেশন?

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

চায়ের শহরে কফির রমরমা: স্পেশাল্টি কফিতে কেন মজছে কলকাতা?

কাচের গ্লাসের কড়া চা ছেড়ে কলকাতার তরুণরা এখন মজেছে চিকমাগালুর আর আরাকুর সিঙ্গেল অরিজিন কফিতে।

মূল বিষয়

কফি? না না! দিনের শুরুটাও ছিল চায়ে, শেষটাও। মর্নিং ওয়াক সেরে বাঙালির জমায়েত হতো সেই চায়ের ঠেকেই। আবার সন্ধে নামলেই পাড়ার মোড়, রকের কোণ কিংবা ভাঙাচোরা কাঠের বেঞ্চ। ধোঁয়া ওঠা মাটির ভাঁড় হাতে নিয়ে বিশ্বরাজনীতি থেকে পাড়ার ফুটবল—চায়ের কাপে তুফান তুলে আড্ডা না দিলে বাঙালির দিনটাই যেন পূর্ণতা পেত না।

এতদিন ছবিটা এমনই ছিল। এক কাপ চা শেষ হয়ে গেলেও তর্কের ঝাঁঝ যেখানে ফুরোয় না, সেখানে ‘দুটো হাফ করিস তো’ বলে আড্ডার মেয়াদ আরও আধ ঘণ্টা বাড়িয়ে নেওয়াটাই এই শহরের চিরন্তন দস্তুর। সেই অফুরন্ত তর্কের জ্বালানি আর আড্ডার শতাব্দীপ্রাচীন অভ্যাসে কি এবার সত্যি চিড় ধরল? যে শহর গরম গরম চায়ের ভাঁড়ে বিপ্লব আর প্রেম দুটোই লালন করেছে, সেই কলকাতার নতুন প্রজন্ম এখন কোন জাদুতে মাটির ঠেক ছেড়ে কাচঘেরা ঘরের কোল্ড ব্রু আর অ্যারোপ্রেসে মজেছে?

দৃশ্যপট কিন্তু দ্রুত বদলাচ্ছে। শহরের এক বড় অংশের তরুণ প্রজন্ম এখন আর ফুটপাথের ফুটন্ত পাতা-চায়ে আটকে নেই। তাদের টেবিলে এখন জায়গা করে নিচ্ছে কাচঘেরা ‘ভি৬০ ড্রিপার’ (V60 Dripper), চাপ দিয়ে ব্রু করা ‘অ্যারোপ্রেস’ (Aeropress) কিংবা ঠান্ডা বরফে বারো ঘণ্টা ধরে তৈরি হওয়া ধীরস্থির ‘কোল্ড ব্রু’।

কলকাতায় নিঃশব্দে ঢুকে পড়েছে ‘থার্ড ওয়েভ কফি’ (Third Wave Coffee) আর ‘স্পেশাল্টি কফি’র (Specialty Coffee) এই নতুন উন্মাদনা।

১. ‘নেসক্যাফে’ থেকে ‘সিঙ্গল অরিজিন’: কফির রূপান্তর কীভাবে?

কলকাতায় কফি সংস্কৃতি নতুন নয়। কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের ইনফিউশন থেকে শুরু করে সাউথের পুরনো কফি ডে—দুটোই শহর দেখেছে। তবে সেগুলো ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের কফি, যেখানে অতিরিক্ত চিনি আর ঘন দুধের চাদরে কফির নিজস্ব চরিত্রটাই ঢাকা পড়ে যেত।

স্পেশাল্টি কফি সেই চেনা সমীকরণ ভেঙে দিয়েছে:

  • বিনসের শিকড়ের সন্ধান: আজকের কফিপ্রেমী জেন-জি শুধু কফি অর্ডার করেই খালাস নয়; তারা জানতে চায় বিনস কোথা থেকে আসছে। চিকমাগালুর না আরাকু উপত্যকা? গাছগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ঠিক কত উচ্চতায় তৈরি?
  • রোস্টিংয়ের সূক্ষ্মতা: কফি বিনসকে অতিরিক্ত পুড়িয়ে তেতো করে ফেলা নয়—লাইট, মিডিয়াম নাকি ডার্ক রোস্ট? এই বিচার এখন নিত্যদিনের আড্ডার বিষয়।
  • দুধ ও চিনিকে বিদায়: খাঁটি স্পেশাল্টি কফি খাওয়া হয় কোনো চিনি বা প্রিজারভেটিভ ছাড়া। কফির ভেতরের স্বাভাবিক ফলের নির্যাস (Fruity Notes), চকোলেটের সুবাস আর অম্লতার (Acidity) নিখুঁত ভারসাম্য চেখে দেখাটাই এখানকার আসল আর্ট।
আরও পড়ুন
দরজায় খাবার, তবু মানুষ কেন ছুটছে রেস্তোরাঁয়?
ক্যাফে মাছি মারছে! ফের জমছে কফি হাউসের আড্ডাটাই?
ছানা কাটানোই ছিল ‘পাপ’! বাঙালির মিষ্টি-বিপ্লবের অজানা গপ্পো

২. হিন্দুস্তান পার্ক থেকে সল্টলেক: বুটিক রোস্টারির রমরমা

কফি কালচারের এই রেনেসাঁ শহরের মানচিত্রে নতুন হটস্পট তৈরি করেছে।

  • সাউথ কলকাতার বুটিক হাব: পূর্ণদাস রোড, হিন্দুস্তান পার্ক, সাদার্ন অ্যাভিনিউ কিংবা যোধপুর পার্কের শান্ত চওড়া অলিগলিতে মাথা তুলেছে একঝাঁক নান্দনিক ‘আর্টিজানাল ক্যাফে’। বড় মাল্টিন্যাশনাল চেইনের চেয়ে মানুষ এখন বেশি ঝুঁকছে লোকাল রোস্টারিগুলোর দিকে।
  • আইটি ও স্টার্টআপ সংস্কৃতির হাওয়া: সেক্টর ফাইভ আর নিউ টাউনের টেক-পেশাদারদের জন্য কফি এখন আর কেবল স্বাদের প্রশ্ন নয়, দিনের কার্যক্ষমতা (Productivity) আর লাইফস্টাইলের প্রতীক। গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হোক বা কোডিংয়ের ফাঁকে ক্লান্তি কাটানো—হাতে ব্ল্যাক কফির গ্লাস যেন আজকের কর্পোরেট ব্যাজ।
  • কেন জেন Z মজেছে? CoLAB এর কো-ফাউন্ডার বলছেন — "coffee is definitely more than a cup, it's also community" — যেটা কলকাতার আড্ডা কালচারের সাথে মিলে যায়।

৩. ক্যাফে এখন নতুন কো-ওয়ার্কিং স্পেস

বাড়ি থেকে কাজ (Work from Home) আর হাইব্রিড কালচার কলকাতার কফি শপগুলোকে নতুন জীবন দিয়েছে:

  • কাঠের খোলামেলা টেবিল, দ্রুতগতির ওয়াই-ফাই, মৃদু ল্যাটিন জ্যাজ কিংবা লো-ফাই মিউজিকের ব্যাকগ্রাউন্ড—ক্যাফেগুলো হয়ে উঠেছে অলিখিত কাজের স্টেশন।
  • এক কাপ হ্যান্ড-ক্রাফটেড পোউর-ওভার (Pour-over) কফি নিয়ে ৩-৪ ঘণ্টা ল্যাপটপে বসে নিরিবিলিতে কাজ নামানো আজকাল অত্যন্ত সাধারণ এক দৃশ্য। ক্যাফে এখন আড্ডার চেয়েও বেশি হয়ে উঠেছে ফোকাসড কাজের নিরাপদ ডেরা।

৪. তাহলে কি চায়ের রাজত্ব সত্যিই শেষ?

প্রশ্নটা উঠতেই পারে—স্পেশাল্টি কফির এই গ্ল্যামার কি কলকাতার শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী ‘চা’ সংস্কৃতিকে গিলে ফেলবে? বাস্তবতা হল, কলকাতা এত সহজে তার শেকড় ভোলে না।

  • সকালের খবরের কাগজ আর বিকেলের রাজনৈতিক তর্কে কাচের গ্লাসের চা কিংবা দার্জিলিং লিকারের মর্যাদা কোনোদিন কমবে না। মোড়ের মাথার কড়া চা সবসময় তার নিজস্ব জায়গাতেই থাকবে।
  • কিন্তু স্পেশাল্টি কফি এনে দিয়েছে বৈচিত্র্যের স্বাদ। শহরটা বড় হচ্ছে, তার রুচির পরিধি বাড়ছে। কলকাতার তরুণরা এখন খুব অনায়াসেই একদিকে মোড়ের ঠেকে দাঁড়িয়ে কাচের গ্লাসে দশ টাকার চায়ে আড্ডা মারতে পারে, আবার কাজের প্রয়োজনে চারশো টাকার ইথিওপিয়ান কোল্ড ব্রু-তেও সমান তৃপ্তি খুঁজে নিতে পারে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়

সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য