

SIR বিতর্কে বিদ্ধ নির্বাচন কমিশন। ছবি - Google
২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
SIR-এর উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা ও সংশোধন করা। সেই প্রক্রিয়ায় পুরনো ভোটার তালিকার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু নতুন ভোটার, যিনি প্রথমবার ভোটার তালিকায় নাম তুলছেন, তাঁর ক্ষেত্রে বাবা-মা বা ঠাকুর্দা-ঠাকুমার পুরনো ভোটার তালিকায় নাম থাকা কেন প্রয়োজন, এই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
নতুন ভোটার হতে আবেদন করছেন। নিজের নাম, বয়স, ঠিকানা, পরিচয়পত্র- এত দিন এই তথ্যেই মূলত কাজ চলত। এ বার সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গেই জুড়ে গেল বাবা-মা, এমনকি ঠাকুর্দা-ঠাকুমার পুরনো ভোটার তালিকার তথ্য! নির্বাচন কমিশনের অনলাইন Form 6-এ SIR-সংক্রান্ত একটি অতিরিক্ত ঘোষণা ঘিরে এমনই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেও মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।
Form 6 হল নতুন ভোটার হিসাবে নাম নথিভুক্ত করার আবেদনপত্র। Registration of Electors Rules, 1960-এর অধীনে নির্ধারিত এই ফর্মে সাধারণত আবেদনকারীর নাম, বয়স, ঠিকানা এবং পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য নেওয়া হয়।
কিন্তু ECINET-এ Form 6 পূরণের সময় SIR বা Special Intensive Revision-সংক্রান্ত একটি অতিরিক্ত Declaration দেখা যায়। সেখানে আবেদনকারীকে জানাতে বলা হয়েছিল, শেষ SIR-এর সময় তাঁর নিজের নাম ভোটার তালিকায় ছিল কি না। নিজের নাম না থাকলে বাবা-মা অথবা ঠাকুর্দা-ঠাকুমার নাম পুরনো ভোটার তালিকায় ছিল কি না, সেই তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিধানসভা কেন্দ্র, বুথ এবং ক্রমিক নম্বরের তথ্যও চাওয়া হয়।
কমিশনের ব্যবস্থায় ওই অংশকে ‘non-mandatory’ বা বাধ্যতামূলক নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ, অনলাইনে সেই প্রশ্নগুলির উত্তর না দিলে আবেদনকারী পরবর্তী ধাপে যেতে পারছিলেন না। ফলে কাগজে বাধ্যতামূলক না হলেও বাস্তবে তা কতটা ঐচ্ছিক, সেই প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষ করে যাঁদের বাবা-মা বা পূর্বপুরুষের পুরনো ভোটার তালিকার তথ্য নেই, তাঁদের জন্য এই অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া কতটা সহজ হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিতর্ক আরও বাড়ে যখন নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য Form 6-এর সঙ্গে এই অতিরিক্ত তথ্য যুক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁদের বক্তব্যের মূল প্রশ্ন ছিল আইনি প্রক্রিয়া। Registration of Electors Rules-এর অধীনে নির্ধারিত একটি বিধিবদ্ধ ফর্মে পরিবর্তন আনতে হলে যথাযথ নিয়ম মেনে সংশোধন করা প্রয়োজন। কমিশনের অভ্যন্তরীণ আপত্তিতে বলা হয়, শুধুমাত্র প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে এ ভাবে Form 6-এর কাঠামো বদলানো যায় কি না, তা স্পষ্ট নয়।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য এই ব্যাখ্যা মানছে না। তাদের বক্তব্য, মূল Form 6-এ কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। SIR-সংক্রান্ত তথ্যের জন্য আলাদা Declaration বা Annexure যুক্ত করা হয়েছিল। অর্থাৎ কমিশনের দাবি, এটি Form 6 সংশোধন নয়; বরং নতুন ভোটারদের কাছ থেকে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা। ২০২৫ সালের SIR-সংক্রান্ত নির্দেশের ভিত্তিতেই এই declaration নেওয়া হয়েছে বলে কমিশনের তরফে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বিতর্কের আসল জায়গা এখানেই। SIR-এর উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা ও সংশোধন করা। সেই প্রক্রিয়ায় পুরনো ভোটার তালিকার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু নতুন ভোটার, যিনি প্রথম বার ভোটার তালিকায় নাম তুলছেন, তাঁর ক্ষেত্রে বাবা-মা বা ঠাকুর্দা-ঠাকুমার পুরনো ভোটার তালিকায় নাম থাকা কেন প্রয়োজন, এই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত তথ্য যাচাইয়ের কাজে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এই তথ্য ভবিষ্যতে নতুন ভোটারের যোগ্যতা নির্ধারণে কী ভূমিকা নেবে, তা নিয়েই রাজনৈতিক ও আইনি মহলে প্রশ্ন উঠছে।
SIR নিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও ইতিমধ্যেই বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, SIR-এর পরে রাজ্যে 27.16 লক্ষ নাম বাদ পড়েছিল। তাঁদের মধ্যে 22 লক্ষেরও বেশি ভোটার পুনর্বহালের জন্য আবেদন করেছেন বলে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন ভোটারদের Form 6-এ পুরনো ভোটার তালিকার তথ্য চাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবেই আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
Form 6-এর বিতর্কের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংবাদসংস্থার প্রকাশিত একাধিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, গত 10 মাসে SIR, ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন-বিয়োজন এবং Form 6-সহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার একাধিক বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন।
তবে কমিশনের তরফে বলা হয়েছে, মতামতের আদানপ্রদান একটি বহু-সদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ। কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়েছে বলেও তাদের বক্তব্য।
ফলে Form 6-এর সঙ্গে একটি অতিরিক্ত declaration যোগ করা নিয়ে বিতর্ক এখন আর নিছক প্রযুক্তিগত বিষয় নেই। প্রশ্ন উঠছে, নতুন ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতার পাশাপাশি পরিবারের পুরনো ভোটার-পরিচয় কতটা প্রাসঙ্গিক? সেই তথ্য কি শুধুই প্রশাসনিক যাচাইয়ের জন্য, নাকি ভবিষ্যতে ভোটার তালিকায় নাম রাখার সিদ্ধান্তেও তার প্রভাব পড়তে পারে?
নির্বাচন কমিশন বলছে, মূল Form 6 অপরিবর্তিত। কিন্তু সেই ফর্মের সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত ঘোষণাকে ঘিরে কমিশনের অন্দরেই প্রশ্ন ওঠার খবর সামনে আসায় SIR বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। নতুন ভোটারদের একটি সাধারণ আবেদনপত্রই এখন হয়ে উঠেছে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে বড় রাজনৈতিক ও আইনি প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
