

লিঙ্গ বৈষম্য ভারতের লজ্জা বাড়াচ্ছে। ছবি - Google
১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে লিঙ্গবৈষম্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, বিশ্বে পূর্ণাঙ্গ লিঙ্গসমতা আসতে আরও প্রায় ১২০ বছর সময় লাগবে। বিশেষ করে ভারতের অবস্থান বিশ্বের সর্বনিম্ন ১৫টি দেশের মধ্যে, যা অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার সংকট এবং পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার ফল। এই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নীতি নির্ধারণে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির দ্রুত পরিবর্তন জরুরি।
সভ্যতার অগ্রগতি নিয়ে মানুষের আত্মতৃপ্তির শেষ নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দৌড়ে মানবজাতি আজ যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা একসময় ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু এই চোখধাঁধানো অগ্রগতির সমান্তরালে যখন আমরা সমাজের মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ নারী-পুরুষের অধিকারের দিকে তাকাই, তখন এক নির্মম বৈপরীত্য চোখে পড়ে। সাম্প্রতিক বিষয় লিঙ্গবৈষম্য সংক্রান্ত খতিয়ান বলছে, গত দুই দশকের নিরিখে নারী ও পুরুষের মধ্যে সার্বিক ব্যবধান হয়তো কিছুটা কমেছে, কিন্তু সেই ব্যবধান সম্পূর্ণ ঘুচিয়ে সত্যিকারের সমতা আনতে এখনও লেগে যাবে এক শতাব্দীরও বেশি সময় প্রায় ১২০ বছর।
আজকের শিশুটি যখন বড় হয়ে বার্ধক্যে পৌঁছাবে, তখনও হয়তো এই পৃথিবী নারীদের জন্য সম-অধিকার নিশ্চিত করে উঠতে পারবে না। আর এই বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের অবস্থান তলানির দেশগুলোর তালিকায়। ফলে উন্নয়ন ও অগ্রগতির যে বড় বড় দাবি আমরা প্রতিদিন শুনি, তার আসল রূপটি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
গত বিশ বছরে বিশ্বজুড়ে নারী অধিকার নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্মেলন, আইনি সংস্কার এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতিও ঘটেছে। বিশেষ করে মেয়েদের মৌলিক শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অনেক দেশই আগের চেয়ে ভালো ফল করছে।
তবে এই উন্নতিকে যদি আন্তর্জাতিক গতির নিরিখে বিচার করা হয়, তবে তাকে সন্তোষজনক বলা কঠিন। যদি একটি ন্যায্য সমাজ তৈরি করতে ১২০ বছর অপেক্ষা করতে হয়, তবে তা মানুষের সম্মিলিত ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়। সমস্যাটি হল, সংস্কারগুলো ঘটে খুব ধীরগতিতে, অথচ পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে অতি দ্রুত যেমনটা ঘটেছিল মহামারি কিংবা সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাতগুলোর সময়। ফলে দুই দশকের ব্যবধান সংকোচনের এই পরিসংখ্যান যতটা না আনন্দের, তার চেয়ে অনেক বেশি এক তীব্র সতর্কবার্তা।
যে দেশ অর্থনীতিতে বিশ্বের শীর্ষ সারিতে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে, সেই ভারতের লিঙ্গসমতার সূচকে নিচের ১৫টি দেশের মধ্যে অবস্থান করা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও উদ্বেগজনক। জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক থেকে ভারত এক বিশাল শক্তি হলেও, নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে দেশটির সামগ্রিক পারফরম্যান্স এখনও হতাশার কারণ হয়ে রয়েছে।
অর্থনৈতিক সুযোগ ও অংশগ্রহণের খরা: দেশের মোট কর্মক্ষম নারীদের একটি বিশাল অংশ আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রের বাইরে। মহিলাদের ঘরের কাজের কোনো অর্থনৈতিক স্বীকৃতি মেলে না, আবার কর্মক্ষেত্রে ঢুকলেও সমান কাজের জন্য সমান বেতন পাওয়ার অধিকার থেকে তারা প্রায়শই বঞ্চিত। উচ্চপদে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীদের উপস্থিতি এখনও নগণ্য।
স্বাস্থ্য ও বেঁচে থাকার অধিকারের সঙ্কট: কন্যাভ্রূণ হত্যা, অপুষ্টি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিষেবায় নারীদের কম গুরুত্ব দেওয়ার যে দীর্ঘ সামাজিক ব্যাধি, তা এখনও পুরো নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। জন্মকালীন লিঙ্গ অনুপাতের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান আন্তর্জাতিক গড় থেকে অনেকটাই পিছিয়ে।
রাজনীতিতে নামমাত্র প্রতিনিধিত্ব: পঞ্চায়েত বা তৃণমূল স্তরে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ থাকলেও লোকসভা বা বিধানসভার মতো নীতিনির্ধারণী উচ্চকক্ষে নারীদের উপস্থিতি মোটেই সন্তোষজনক নয়।
ভারতের এই শোচনীয় অবস্থানের পেছনে কেবল নীতি প্রণয়নের অভাব দায়ী নয়, দায়ী আমাদের গভীরে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা। সমাজে এখনও মেয়েদের একটি বড় অংশের ভবিষ্যৎ কেবল 'বিবাহ' এবং 'সংসার পরিচালনা'-র ফ্রেমেই আটকে রাখা হয়।
আইনগতভাবে সমতা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে নারীরা প্রতিনিয়ত নানাবিধ অদৃশ্য বাধার মুখোমুখি হন। উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়লেও সেই শিক্ষাকে স্বাধীন উপার্জনে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে পারিবারিক অনুমতি, বিয়ের চাপ এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ঘরে-বাইরে শারীরিক ও মানসিক সহিংসতার ভয় নারীদের সম্ভাবনাকে ডানা মেলতে দেয় না।
যদি ভারতকে এই গাড্ডা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়, তবে নিছক পরিসংখ্যানের খেলা খেলে কিংবা কাগুজে প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজ হবে না। প্রয়োজন আমূল কাঠামোগত রূপান্তর:
নিরাপদ ও সহায়ক কর্মপরিবেশ: নারীদের কর্মক্ষেত্রে ধরে রাখতে নিরাপদ গণপরিবহন, প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র (ডে-কেয়ার) এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
অবেতনভুক্ত গৃহস্থালি কাজের মূল্যায়ন: ঘরের রান্না, ধোয়া-মোছা বা শিশুদের লালন-পালনকে 'নারীর সহজাত দায়িত্ব' বলে উড়িয়ে না দিয়ে সমাজ ও অর্থনীতিতে এর মূল্যকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং পরিবারে এই কাজের সমান ভাগাভাগি নিশ্চিত করতে হবে।
নীতিনির্ধারণে নারীর আসন: মহিলা সংরক্ষণ আইনের বাস্তব ও কার্যকর প্রয়োগ ঘটাতে হবে, যাতে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মহিলারা কেবল 'মুখোশ' হিসেবে নয়, বরং প্রকৃত ক্ষমতা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
সামাজিক মনস্তত্ত্বের রূপান্তর: পাঠ্যক্রম থেকে শুরু করে পারিবারিক শিক্ষা সব স্তরেই লিঙ্গভিত্তিক সমতার ধারণা ছড়িয়ে দিতে হবে।
১২০ বছর অপেক্ষা করার অর্থ হল আরও অন্তত তিন-চারটি প্রজন্মের নারীদের বঞ্চিত, শোষিত ও অবহেলিত জীবন মেনে নেওয়া। এটি কোনো সভ্য সমাজের লক্ষ্য হতে পারে না। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দিয়ে কোনো দেশ মহান হতে পারে না, যদি সেই দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নিজের ঘরে ও বাইরে বৈষম্যের শিকার হয়।
ভারতের জন্য তলানির ১৫-তে থাকা কেবল একটি র্যাঙ্কিং নয়, এটি একটি জোরালো ধাক্কা। এখন আর ধীরে চলার সময় নেই; যদি আমরা প্রকৃত অর্থেই একটি মানবিক, সমৃদ্ধ ও সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তুলতে চাই, তবে মহিলাদের হাত শক্ত করে সেই ১২০ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পথকে এক দশকে নামিয়ে আনার দায় আজ আমাদের সবার।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
