

এসথার ভিক্টোরিয়া আব্রাহাম। ছবি - Google
২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কলকাতার অতি রক্ষণশীল বাগদাদি ইহুদি সমাজে মূর্তিমান বিদ্রোহের শিখা হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন এসথার ভিক্টোরিয়া আব্রাহাম। বাবার ব্যাপক মারধোর সত্ত্বেও অভিনয়ের টানে অল্প বয়সেই বাড়ি ছেড়ে দেওয়া থেকে শুরু করে বলিউডে প্রথম মহিলা স্টান্ট কুইন ও প্রথম মহিলা প্রযোজক হওয়া। ভালোবেসে স্বেচ্ছায় মুসলিম অভিনেতার দ্বিতীয় স্ত্রী হওয়া, এসথারের জীবন বড়ই রঙিন ও বিতর্কিত।
কলকাতার বুকে তখন ব্রিটিশ আভিজাত্যের ব্যাপক রমরমা। শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করছে বাগদাদি ইহুদিরা। বাইরে থেকে দেখে এদের যতটা আধুনিক মনে হত, অন্দরে নারী স্বাধীনতার প্রশ্নে তারা ছিল ততটাই রক্ষণশীল। মেয়েদের জন্য ছিল কড়া পর্দা প্রথা আর হাজারো বিধিনিষেধ। ঠিক এরকমই এক সোনার খাঁচায় জন্ম নিয়েছিলেন এক স্বাধীনচেতা মেয়ে।
তিনি শুধু সেই খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসেননি, বরং হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম মিস ইন্ডিয়া এবং হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রথম মহিলা প্রযোজক। তাঁর নাম এসথার ভিক্টোরিয়া আব্রাহাম। বলিউড যাকে চেনে 'প্রমীলা' নামে।
১৯১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর কলকাতার এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত বাগদাদি ইহুদি পরিবারে এসথারের জন্ম। বাবা রিউবেন আব্রাহাম ছিলেন শহরের নামকরা ধনী ব্যবসায়ী। মা মাতিল্ডা আইজ্যাক এসেছিলেন করাচি থেকে। দশ ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ এসথারের ছোটবেলা কেটেছে চূড়ান্ত বৈভব আর কড়া অনুশাসনের মধ্যে। মেধাবী এসথার কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। এরপর কলকাতারই একটি স্কুলে কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষিকা হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু ওই রুটিনমাফিক জীবনে তাঁর মন টেকেনি। আসলে তাঁর চোখ জুড়ে তখন ছিল রূপোলি পর্দার স্বপ্ন।
ইহুদি সমাজে সেই সময় মেয়েদের থিয়েটার বা সিনেমায় অভিনয় করাকে চরম অসম্মানের চোখে দেখা হত। আর কলকাতার বাগদাদি ইহুদিরা তো আরও বেশি রক্ষণশীল ছিল। ফলে এসথারের অভিনয়ের শখের কথা জানতে পেরে তাঁর বাবা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। এসথারকে রীতিমতো মারধর করা হয়েছিল। কিন্তু কোনও বাধাই এই জেদি মেয়েকে আটকে রাখতে পারেনি। সমস্ত সামাজিক বেড়াজাল ছিন্ন করে তিনি বাড়ি ছাড়েন। যোগ দেন একটি পার্সি থিয়েটার কোম্পানিতে। সেখানে রিল পরিবর্তনের ১৫ মিনিটের ছোট্ট বিরতিতে তিনি দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য নাচতেন।
থিয়েটারের গণ্ডি পেরিয়ে এসথার পাড়ি দেন স্বপ্নের শহর বোম্বেতে। সেখানে গিয়ে তিনি নিজের নাম বদলে রাখেন 'প্রমীলা'। শুরু হয় তাঁর বলিউডের এক নতুন অধ্যায়। ১৯৩৯ সালে 'জঙ্গল কিং' বা ১৯৪২ সালে 'বসন্ত' সিনেমায় তিনি পর্দায় আসেন স্টান্ট কুইন হিসেবে। সেই যুগে যখন অভিনেত্রীরা পর্দায় আসতে দ্বিধা করতেন, তখন প্রমীলা অনায়াসে একের পর এক দুঃসাহসিক স্টান্ট করে দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিতেন। অভিনয়ের পাশাপাশি নিজের ছবির পোশাক এবং গয়নার নকশাও তিনি নিজেই করতেন। তাঁর এই সাহসী এবং স্বাধীন ভাবমূর্তি তাঁকে বলিউডের প্রথম দিককার বোল্ড আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
এসথারের ব্যক্তিগত জীবন ছিল আরও বেশি রোমাঞ্চকর এবং বিতর্কিত। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি মাণিকলাল ডাঙ্গি নামের এক মাড়োয়ারি হিন্দু ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন। যদিও সেই সম্পর্ক বেশিদিন টেকেনি। এক বছর পরই সেই বিয়ে ভেঙে যায়। এরপর ১৯৩৯ সালে তাঁর আলাপ হয় বলিউডের তৎকালীন জনপ্রিয় শিয়া মুসলিম অভিনেতা সৈয়দ হাসান আলি জায়েদির সঙ্গে। পর্দায় এই অভিনেতা 'কুমার' নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। কুমারের প্রেমে পড়ে এসথার তাঁকে বিয়ে করেন এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হন।
এই বিয়ের খবর কলকাতার ইহুদি সমাজে কার্যত ভূমিকম্প ঘটিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই অস্থির সময়ে একদিকে ইউরোপে ইহুদিদের ওপর অত্যাচার চলছে। ঠিক সেই সময়েই এসথার নিজের ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। কলকাতার রক্ষণশীল বাগদাদি সমাজ এই ঘটনাকে চরম অবমাননাকর বলে ধরে নেয়। এমনিতেই সিনেমায় নামার জন্য সমাজ তাঁকে বাঁকা চোখে দেখত। তার উপর এক মুসলিম অভিনেতাকে বিয়ে করার অপরাধে ইহুদি সম্প্রদায় তাঁকে চিরতরে একঘরে করে দেয়।
সমাজের রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা না করে এসথার নিজের শর্তে জীবন কাটিয়েছেন। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতে প্রথমবার মিস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এসথার সেখানে অংশগ্রহণ করেন এবং খেতাব জেতেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, খেতাব জয়ের সময় তাঁর বয়স ছিল ৩১ এবং তিনি তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
শুধু রূপের জাদুই নয়, বুদ্ধিমত্তাতেও এসথার ছিলেন সমসাময়িকদের থেকে অনেক এগিয়ে। স্বামীর সঙ্গে মিলে তিনি তৈরি করেন 'সিলভার ফিল্মস' নামের একটি প্রোডাকশন হাউস। তিনিই ছিলেন হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের প্রথম মহিলা প্রযোজক। তাঁদের এই প্রযোজনা সংস্থা থেকে প্রায় তেরোটি সিনেমা তৈরি হয়েছিল।
এসথার এবং কুমারের চার সন্তান ছিল। ১৯৬৩ সালে বিখ্যাত 'মুঘল-ই-আজম' সিনেমা রিলিজের পর কুমার চিরতরে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এসথার নিজের জন্মভূমি ভারতবর্ষ ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন। তিনি ভারতেই থেকে যান এবং একাই সন্তানদের বড় করে তোলেন। তাঁর মেয়ে নকি জাহান ১৯৬৭ সালে মিস ইন্ডিয়া খেতাব জেতেন। ভারতের ইতিহাসে তাঁরাই একমাত্র মা এবং মেয়ে যাঁরা দু'জনেই এই সম্মান অর্জন করেছেন।
জীবনের শেষ দিকে আর্থিক অনটন তাঁকে গ্রাস করেছিল। তা সত্ত্বেও তিনি মাথা নত করেননি। ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় এবং প্রযোজনা চালিয়ে গেছেন। ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট মুম্বাইতে প্রায় নব্বই বছর বয়সে এই অসামান্যা নারীর জীবনাবসান হয়। কলকাতার এক রক্ষণশীল পরিবার থেকে বেরিয়ে এসে নিজের আত্মপরিচয় তৈরির যে লড়াই এসথার লড়েছিলেন, তা আজও এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
