

আজকের নিজাম প্যালেস। ছবি - Google
২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
পারস্য থেকে এসে কলকাতার অন্যতম সেরা ধনী হয়ে উঠেছিলেন। শহরের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ক্ষেত্রে ছিলেন মুকুটহীন সম্রাট। আজকের নিজাম প্যালেসের জন্মদাতা। অনেকটা তাজমহলের কাহিনী মনে করিয়ে দেয় মিজান প্যালেস তৈরীর ঘটনা স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই নিজাম প্যালেস তৈরি করেছিলেন আর্মেনিয়ান জে. সি. গ্যালস্টাউন। কিন্তু জুয়ার নেশায় সব ধ্বংস হয়ে যায়। যে মানুষটার অঙ্গুলিহেলনে একদিন কলকাতার বাজার চলত, ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার ঠিক পরে তাঁর মৃত্যু হয় কলকাতার এক চিলতে ভাড়া ঘরে!
কলকাতা বা তার আশেপাশের এলাকার বাসিন্দা, আর নিজাম প্যালেস চেনেন না এমন মানুষ বিরল। শুধু কলকাতা কেন, বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারি ও দুষ্কৃতীদের দৌলতে গোটা বাংলার মানুষের কাছেই নিজাম প্যালেসের নাম ও ছবি অত্যন্ত পরিচিত হয়ে উঠেছে। এ. জে. সি. বোস রোড ধরে যাওয়ার সময় নিজাম প্যালেসের দিকে চোখ গেলেই বর্তমানে প্রায় সকলেরই সিবিআইয়ের দফতরের কথা মনে পড়ে। এছাড়াও এখানে কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যান্য আরও নানান দফতর আছে।
অথচ আজকের এই ব্যস্ত নিজাম প্যালেসের ইটের পাঁজর আর সরকারি ফাইলের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মন খারাপ করা পতনের ইতিহাস। এক প্রবল প্রেমের গল্প। আর এক মানুষের আকাশছোঁয়া উত্থান থেকে পথের ভিখারি হয়ে যাওয়ার আখ্যান!
সেই দুর্দান্ত রঙিন চরিত্রের মানুষটি ছিলেন জোহানেস ক্যারাপিয়েট গ্যালস্টাউন। বিংশ শতকের গোড়ার দিকের কলকাতার মুকুটহীন সম্রাট। জাতিতে ছিলেন আর্মেনিয়ান। স্ত্রীর প্রতি প্রবল ভালোবাসা থেকেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ। নাম দিয়েছিলেন গ্যালস্টাউন পার্ক। অনেকটা যেন শাহজাহান আর মমতাজ বেগমের কাহিনী। সেই প্রাসাদের জৌলুস এতটাই চোখধাঁধানো ছিল যে স্বয়ং ব্রিটেনের ভাবী রাজা এডওয়ার্ড কলকাতা সফরে এসে ভাইসরয় হাউস বা আজকে রাজভবনের পরিবর্তে সেখানে অতিথি হিসেবে উঠেছিলেন। এটাই আজকের নিজাম প্যালেস!
অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এই বিলিয়নেয়ারের জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছিল চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। কলকাতার এক চিলতে ভাড়া ঘরে।
কাহিনীর শুরুটা ১৮৫৯ সালে। পারস্যের ইসফাহান শহরের নিউ জুলফা এলাকায় এক আর্মেনীয় পরিবারে জন্ম গ্যালস্টাউনের। তখন কে জানত এই ছেলেই একদিন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানীর রূপ বদলে দেবে। ১৮৭৩ সাল নাগাদ খুব অল্প বয়সে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। ভর্তি হন ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের আর্মেনিয়ান কলেজে। পড়াশোনা শেষ করে কাকা এ. জে. গ্যারিকের হাত ধরে ব্যবসায় নামেন।
তারপরের ইতিহাস শুধুই ছুটে চলার। কলকাতার রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় জাদুর কাঠি ছুঁইয়েছিলেন গ্যালস্টাউন। তাঁর হাত ধরেই সেকালের কলকাতায় মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩৫০টি বিলাসবহুল ইমারত। আজকের পার্ক স্ট্রিটের কুইন্স ম্যানশন আসলে তাঁরই তৈরি গ্যালস্টাউন ম্যানশন।
ব্যবসায়ী হিসেবে গ্যালস্টাউন যেমন ডাকাবুকো ছিলেন, ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন ততটাই রোমান্টিক। স্ত্রী রোজ ক্যাথরিনকে তিনি পাগলের মতো ভালোবাসতেন। রোজের শখ আর মর্জির চেয়ে মূল্যবান তাঁর কাছে আর কিছুই ছিল না। স্ত্রীর মন পেতেই তিনি তৈরি করেন এক বিশাল আর্ট ডেকো প্রাসাদ। চারপাশের সাজানো বাগান আর রাজকীয় অন্দরমহল নিয়ে গড়ে উঠেছিল গ্যালস্টাউন পার্ক।
এই 'রাজপ্রাসাদের' অন্দরমহল ছিল আক্ষরিক অর্থেই রাজকীয়। গ্যালস্টাউন দম্পতির সন্তানদের দেখাশোনার জন্য সুদূর ইউরোপ থেকে বিশেষ আয়া বা গভর্নেস আনা হত। তাঁদের বাড়িতে নিয়মিত বসত ইউরোপীয় ঘরানার পার্টি। সেখানে ব্রিটিশ রাজপুরুষ থেকে শুরু করে দেশীয় মহারাজারাই হতেন অতিথি। রোজ নিজে সেই পার্টিগুলোর তদারকি করতেন। ১৯২১ সালে যখন প্রিন্স অফ ওয়েলস (পরবর্তীকালে রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড) কলকাতায় আসেন, তখন তিনি ভাইসরয়ের প্রাসাদে থাকেননি। তিনি বেছে নিয়েছিলেন এই গ্যালস্টাউন পার্ককেই। একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর প্রাসাদে খোদ ব্রিটিশ যুবরাজের এই আতিথ্য গ্রহণ সেকালের বাবু সমাজে রীতিমতো আলোড়ন ফেলেছিল। এই বাড়িতে সব মিলিয়ে একশোর বেশি পরিচারক প্রতিদিন কাজ করতেন।
গ্যালস্টাউনের দরাজ হৃদয়ের কথা সেকালের সবাই জানতেন। ব্রিটিশ সরকার যখন কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল তৈরির উদ্যোগ নিল, তখন লর্ড কার্জন তহবিল সংগ্রহের ডাক দেন। গ্যালস্টাউন সেই সময় একাই ২০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়েছিলেন! আজকের দিনে অঙ্কটা সামান্য মনে হলেও সেই যুগে এটি ছিল বিপুল অর্থ। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মূল ফটকের ওপরে দাতাদের নামের তালিকায় আজও তাঁর নাম জ্বলজ্বল করছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করায় তাঁকে OBE (অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার) উপাধিতেও ভূষিত করা হয়েছিল।
গ্যালস্টাউনের পতনের বীজ লুকিয়ে ছিল তাঁর এক সর্বনাশা নেশার মধ্যে। সেই নেশা হল ঘোড়দৌড় বা হর্স রেসিং। গ্যালস্টাউন রেসের মাঠে শুধু দর্শক ছিলেন না। তিনি ছিলেন রেসিং দুনিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি। ভারত এবং ইংল্যান্ড মিলিয়ে তাঁর আস্তাবলে ছিল তিনশোর বেশি বিশ্বমানের রেসের ঘোড়া। সেকালের ব্রিটিশ ভাইসরয়ের নিজস্ব অশ্বারোহী বাহিনীর চেয়েও এই সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। মর্যাদাপূর্ণ ডার্বি থেকে শুরু করে কিং এম্পায়ার কাপ সবই তাঁর ঘোড়া জিতেছিল। তিনি ঘোড় দৌড় নিয়ে এতটাই প্যাশনেট ছিলেন যে, জকিদের যে পরিমাণ বেতন দিতেন তা অনেক মহারাজার বার্ষিক ভাতার থেকে বেশি! কিন্তু রেসের মাঠে বাজির নেশা তাঁকে অন্ধ করে দেয়। জেদের বশে জলের মতো টাকা ওড়াতে শুরু করেন।
১৯২০ এর দশকের শেষভাগ থেকে গ্যালস্টাউনের জীবনে অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে শুরু করে। একদিকে ১৯৩০-এর দশকের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দায় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় ধস নামে। অন্যদিকে রেসের মাঠের বাজিতে তিনি সর্বস্বান্ত হতে থাকেন। দেনার দায়ে ডুবতে বসেন একসময়ের এই ধনকুবের। সেকালের মাড়োয়ারি মহাজন, বিশেষ করে চামারিয়া পরিবারের কাছে তিনি ঋণের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েন।
ঋণ মেটাতে প্রথমে তিনি বন্ধক রাখতে শুরু করেন নিজের সাধের সম্পত্তিগুলো। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। ১৯৩৩ সালে এক বুক হাহাকার নিয়ে তিনি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন তাঁর স্ত্রীর জন্য গড়া বিশাল গ্যালস্টাউন পার্ক।
সেই প্রাসাদ কিনে নেন হায়দ্রাবাদের সপ্তম নিজাম মীর ওসমান আলি খান। গ্যালস্টাউন পার্কের নতুন নাম হয় নিজাম প্যালেস। রোজ গ্যালস্টাউনকে চোখের সামনে দেখতে হয় নিজের সাজানো সংসারের এই চরম পরিণতি।
এক এক করে পার্ক স্ট্রিট, ক্যামাক স্ট্রিট আর বালিগঞ্জের সমস্ত সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যায়। আভিজাত্যের শিখরে থাকা পরিবারটি নিমেষে মাটিতে আছড়ে পড়ে। সন্তানরা হৃতগৌরব আর কোনোদিন ফিরে পাননি। আর্থিক অনটনে অনেকেই পরে বিদেশে পাড়ি জমান। যে মানুষটার অঙ্গুলিহেলনে একদিন কলকাতার বাজার চলত, ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার ঠিক পরে তাঁর মৃত্যু হয় চূড়ান্ত নিঃস্ব অবস্থায়। বিশাল প্রাসাদ থেকে বিতাড়িত হয়ে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছিল সামান্য এক চিলতে ভাড়া ঘরে। এককালের মুকুটহীন সম্রাট পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন কার্যত পথের ভিখারি হয়ে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
