মেক্সিকোর এই মাঠ বহু ইতিহাসের সাক্ষী। ছবি : Google
১২ই জুন, ২০২৬
উৎসব করতে মেক্সিকানদের জুড়ি মেলা ভার। আর ফুটবল হলে তো কথাই নেই। ফুটবলটা মেক্সিকানদের কাছে যত না প্রতিযোগিতা, তার চেয়ে বেশি উৎসব। ম্যাচ জেতা–হারাও তাতে প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ। আর বিশ্বকাপ হলো বিশ্বকাপ। যেটিকে অনায়াসে ফুটবল মহোৎসব বলে ফেলা যায়। এই যে বিশ্বজুড়ে যেকোনো খেলার গ্যালারিতে সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়া মেক্সিকান ওয়েভ, সেটিও তো মেক্সিকানদের সেই উৎসবপ্রবণ মনেরই জ্বলজ্যান্ত এক প্রমাণ। যার শুরুটাও একটা বিশ্বকাপেই।
উদ্বোধনী ম্যাচের মতো এবারের ফাইনাল ম্যাচটিও আজটেকায় হলে মেক্সিকান গর্বের ষোলোকলা পূর্ণ হতো। মেক্সিকোতে আগের দুটি বিশ্বকাপের ফাইনাল এই মাঠেই হয়েছে, যা অমরত্ব পেয়ে গেছে ফুটবলের দুই মহানায়ক পেলে ও মারাদোনার বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে উল্লাসের রঙিন সব ছবিতে। এবার ফাইনাল আজটেকায় নয়। কারণ, আগের দুটি বিশ্বকাপের মতো মেক্সিকো এবার একক আয়োজনের অধিকার পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাও যে সঙ্গে আছে। একটু ভুল বলা হলো। ‘একটু’ বললে আসলে কমই বলা হয়; বরং বলা উচিত, ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আছে মেক্সিকো ও কানাডা। ১০৪ ম্যাচের ৭৮টি খেলাই যুক্তরাষ্ট্রে। প্রতিবেশী দুই দেশ পেয়েছে ১৩টি করে ম্যাচ। এই বিশ্বকাপ নিয়ে কথাবার্তায় যুক্তরাষ্ট্রই যে ঘুরেফিরে আসছে, এতে তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটি সর্বার্থেই ‘আমেরিকান বিশ্বকাপ’।
আমেরিকার ৭৫ শতাংশ ম্যাচের আয়োজক বলেই নয়, এই বিশ্বকাপের পদে পদেই ‘আমেরিকানীকরণ’ ঘটেছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির লীলাভূমিতে টিকিটের দাম সর্বকালের রেকর্ড ছুঁয়েছে। এতটাই যে খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও যা মনে হচ্ছে ‘সাধ্যের’ বাইরে! ফাইনালের একটি টিকিটের দাম ২৮ কোটি টাকা পর্যন্ত ওঠার খবর পাওয়া গেছে। শেষ পর্যন্ত তা সেই দামেই বিক্রি হয়েছে কি না, তা অবশ্য জানা নেই। ট্রাম্পের বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে টিকিট লাগবে না, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তো পারলে মাঠের মাঝখানেই তাঁকে বসিয়ে দেন! টিকিটের দাম নিয়ে ট্রাম্পের কথাটাকে তাই রসিকতা হিসেবে নেওয়াই ভালো। ঠিক রসিকতাও অবশ্য নয়। টিকিটের দাম কেমন কল্পনা ছাড়ানো—সেটা বোঝাতেই হয়তো বলেছেন, এত দাম দিয়ে টিকিট কেটে খেলা দেখতে হলে তিনি তা দেখতেন না। তারপরেও আমেরিকার দাদাগিরি নিয়ে সমালোচনা চলছে।
শুধু কি আর টিকিট, হোটেলভাড়া, যাতায়াত খরচ—সবকিছুতেই চলছে পরস্পরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। শুধু সাধারণ দর্শকই নন, অংশগ্রহণকারী দলগুলো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে খরচ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ করেছে।
ইরান দলকে নিয়ে যা হচ্ছে, সেটিও কি তা–ই নয়! বিশ্বকাপ খেলতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রে যাবে কি যাবে না—এই দোলাচল চলেছে অনেক দিন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেজক্যাম্প মেক্সিকোতে সরিয়ে নিতে হয়েছে। কিন্তু খেলা তো আমেরিকায়। ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসার শর্তে ভিসা দেওয়ার অদ্ভুত ঘটনাও ঘটেছে। পরে অবশ্য মহা উদারতার পরিচয় দিয়ে ম্যাচের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার অনুমতি মিলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কল্যাণে বিশ্বকাপের রেফারিকে ভিসা থাকার পরও বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো অভূতপূর্ব ঘটনারও সাক্ষী এই বিশ্বকাপ। সোমালিয়া না হয় ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায়ই আছে, তারপরও বিশ্বকাপের কথা বিবেচনায় নিয়ে একটু ছাড় পাবেন আশা করেই তো মায়ামিতে নেমেছিলেন সোমালিয়ার রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান। কিন্তু পত্রপাঠ বিদায় করে দেওয়া হয়েছে তাঁকে। ‘আমেরিকান বিশ্বকাপ’ বলে কথা।
২০ জুলাই সেখানেই মঞ্চস্থ হবে বিশ্বকাপ ফুটবল নামের মহানাটকের চূড়ান্ত অঙ্ক। চার বছর আগে লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ–দুঃখ ঘুচেছিল বলে ফুটবল ইতিহাসে অমরত্ব পেয়ে গেছে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম। এবার মেটলাইফ স্টেডিয়াম কার জন্য বরণমালা সাজিয়ে রেখেছে, কে জানে!
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল ১৩টি দেশ। এই সংখ্যা একেক বিশ্বকাপে একেক রূপ নেওয়ার পর একসময় ১৬–তে স্থির হয়েছিল। সেখানে থেকে ২৪, তারপর ৩২। যেখানে এবারের বিশ্বকাপে খেলছে ৪৮টি দেশ। এর আগে কখনো তিন দেশে বিশ্বকাপ হয়নি, এত দেশও কখনো খেলেনি বিশ্বকাপে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।