১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
দেশে বেনামি সম্পত্তির ‘প্রাণপুরুষ’ কুমোরটুলির গোবিন্দরাম মিত্র!

গোবিন্দরাম মিত্রের প্রতীকী ছবি - AI

দেশে বেনামি সম্পত্তির ‘প্রাণপুরুষ’ কুমোরটুলির গোবিন্দরাম মিত্র!

calender icon 2 ৩১শে আগস্ট, ২০২৬

মূল বিষয়

অষ্টাদশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ার দিকে সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কলকাতা এই তিন গ্রাম নিয়ে হুগলি নদীর তীরে সবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে এক নতুন বসতি। সকলেই জানেই সেটা আজ কলকাতা। সেই সময় মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করা কলকাতার বাণিজ্য আর ক্ষমতার অলিন্দে বিলেতের সাহেবদের একচ্ছত্র দাপট। তবে সাহেবদের কড়া নজরদারির পাশ কাটিয়ে এক বাঙালি নীরবে চরম দুর্নীতি করে নিজের এক সমান্তরাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলছিলেন। নাম গোবিন্দরাম মিত্র। কলকাতার ইতিহাসে যিনি 'ব্ল্যাক ডেপুটি' বা 'কালা জমিদার' নামে পরিচিত।

তাঁর দাপট এতটাই ছিল যে, তৎকালীন সমাজে একটা প্রবাদ মুখে মুখে ফিরত— "বনমালী সরকারের বাড়ি, গোবিন্দরামের ছড়ি, উমিচাঁদের দাড়ি, হুজুরিমলের কড়ি, কে না জানে?" এই 'ছড়ি' নিছকই একটি লাঠি ছিল না। ছিল ক্ষমতা, দুর্নীতি আর প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের এক মূর্তিমান দুঃস্বপ্নের প্রতীক।

গোবিন্দরাম কে?

আজকের ব্যারাকপুরের কাছে চনক বা চানক নামে এক গ্রামে জন্ম গোবিন্দরামের। ১৭২০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকে কলকাতার 'দেশীয় জমিদার' বা ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে নিয়োগ করে। এই পদে প্রথমে ছিলেন নন্দরাম সেন। তারপরই দায়িত্ব পান গোবিন্দরাম মিত্র। তাঁর মূল কাজ ছিল সাহেবদের হয়ে এদেশীয় প্রজাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা এবং ছোটখাটো বিচারের কাজ সামলানো।

ক্ষমতা হাতে পেয়েই শুরু হল এক অভাবনীয় লুটপাট। কীভাবে গোবিন্দরাম ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিতেন, সেই কৌশল জানলে আজও চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। বর্তমান ভারতীয় অর্থনীতিতে 'বেনামি সম্পত্তি' নিয়ে আজকাল কতই না শোরগোল হয়। কিন্তু মজার বিষয় হল, এই বেনামি প্রথার আদি উদ্ভাবকদের একজন ছিলেন খোদ গোবিন্দরাম। কোম্পানির কড়া নিয়ম ছিল, শহরের বাজারগুলোর ইজারা প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে দেওয়া হবে। গোবিন্দরাম নিজেই যেহেতু সেই নিলামের তদারকি করতেন, তাই অত্যন্ত সুকৌশলে তিনি নিজের ভৃত্য, কর্মচারী বা সম্পূর্ণ কাল্পনিক কোনও ব্যক্তির নামে জলের দরে সেই লাভজনক ইজারাগুলো কিনে নিতেন। এরপর সেই বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ীদের উপর ইচ্ছেমতো কর চাপিয়ে বিপুল মুনাফা লুটে নিতেন নিজের পকেটে।

গোবিন্দরাম মিত্রের দুর্নীতির পাহাড়

গোবিন্দরামের দুর্নীতির জাল আরও বহুদূর বিস্তৃত ছিল। তৎকালীন কলকাতায় চুরি-ডাকাতি ঠেকাতে কোম্পানির নিজস্ব রক্ষী বা 'পাইক' থাকত। গোবিন্দরাম খাতায়-কলমে প্রচুর ভুয়ো পাহারাদারের নাম দেখিয়ে ব্রিটিশ কোষাগার থেকে তাদের বেতন তুলতেন। গোটা টাকাটাই ঢুকে যেত তাঁর নিজস্ব সিন্ধুকে! যাদের কয়েক দশক আগের 'সত্যম কম্পিউটার'-এর দুর্নীতির কথা মনে আছে, তাঁরা বিষয়টা ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।

বিচারক হিসেবেও গোবিন্দরামের ক্ষমতা ছিল অবাধ। ছোটখাটো অপরাধে তিনি এমন অদ্ভুত সব জরিমানা করতেন, যা কোম্পানির কোষাগারে না গিয়ে জমা হতো তাঁর পকেটে। দাগি অপরাধীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে তিনি তাদের চুপচাপ ছেড়ে দিতেন, আর ইংরেজদের খাতায় স্রেফ লিখে দিতেন- 'আসামী পলাতক'।

পর্দা ফাঁস

আরও পড়ুন
কলকাতার বুকে গ্রিক রালি ব্রাদার্সের আধিপত্যের অজানা ইতিহাস
মাছ কেনার অপমানের জ্বালা ভুলতে তৈরি হয় ছাতুবাবুর বাজার!
গরুদের জল খাওয়ার জন্য ধর্মতলায় দিঘি খনন!

গোবিন্দরাম মিত্রের এই অবাধ লুটের রাজত্ব নির্বিঘ্নে চলেছিল প্রায় তিন দশক। কেউ কোন‌ও টুঁ শব্দ করতে পারেনি। কিন্তু তাল কাটে ১৭৫২ সালে এসে।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতার চিফ কালেক্টর হয়ে ১৭৫২ সালে আসেন জে. জে. হলওয়েল। মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত কড়া ধাঁচের। আর হিসাবনিকাশে একেবারে তুখোড়। দায়িত্ব নিয়েই তিনি কোম্পানির পুরনো হিসাবের খাতা মেলাতে বসেন।

তাতে দেখা গেল, কলকাতার আয়তন হু হু করে বাড়ছে, ব্যবসাবাণিজ্য বহুগুণ ফুলেফেঁপে উঠেছে, অথচ কোম্পানির রাজস্ব সেই অনুপাতে বাড়ছে না। কিন্তু এমন বিচিত্র অবস্থা কেন? সর্ষের মধ্যেই যে ভূত লুকিয়ে আছে, তা বুঝতে খুব একটা সময় লাগেনি হলওয়েলের। নিখুঁত অডিট করে তিনি ধরে ফেলেন গোবিন্দরামের চুরি। এক-আধ টাকার নয়। একেবারে ৩৮ হাজার টাকার বিশাল দুর্নীতি! সে যুগে এই অর্থের পরিমাণ ছিল আক্ষরিক অর্থেই আকাশছোঁয়া। আজকের হিসেবে বহু কোটি টাকা।

গোবিন্দরাম মিত্রের চওড়া কপাল

খুব স্বাভাবিকভাবেই সকলে ভাববেন, প্রমাণ যখন কড়ায়-গণ্ডায় পাওয়া গিয়েছিল তার মানে এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির নিশ্চয়ই চরম শাস্তি হয়েছিল। ফাঁসি বা অন্তত দ্বীপান্তর? ইতিহাস ঠিক এখানেই সবচেয়ে বড় চমকটা দেয়। হলওয়েল তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টরদের কাছে গোবিন্দরাম মিত্রের বিষয়ে দুর্নীতির এক বিশাল এবং প্রামাণ্য রিপোর্ট জমা দেন। কিন্তু এরপরও বাস্তবে গোবিন্দরামের টিকিও কেউ ছুঁতে পারেনি।

কারণটা হল- সর্ষের মধ্যে আরও বড় ভূতের উপস্থিতি! তৎকালীন ইংরেজ গভর্নর থেকে শুরু করে কাউন্সিলের অন্যান্য কর্তাব্যক্তিদের নিজেদেরই প্রচুর ব্যক্তিগত অবৈধ ব্যবসা ছিল। আর সেই বাণিজ্যের জন্য স্থানীয় প্রভাবশালী হিসেবে গোবিন্দরামের সাহায্য তাদের পদে পদে দরকার হত। ফলে হলওয়েলের এত খাটাখাটনির রিপোর্ট কার্যত ধামাচাপা দেওয়া হয়। দীর্ঘ টালবাহানার পর লোকদেখানো বিচার হয়। কাউন্সিল গোবিন্দরামকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ ধার্য করে মাত্র ৩,৩৯৭ টাকা! কোথায় ৩৮ হাজার টাকার প্রমাণিত দুর্নীতি, আর কোথায় মাত্র তিন হাজার টাকার নামমাত্র জরিমানা। একে চওড়া কপাল ছাড়া আর কীই বা বলবেন।

আবারও বহাল তবিয়তে প্রতিষ্ঠা

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হয়েছিল, এই ঘটনার কিছুদিন পরই নিজের বিপুল প্রভাব আর কূটনীতির জোরে গোবিন্দরাম মিত্র আবারও কোম্পানির সুনজরে চলে আসেন এবং নিজের হারানো ক্ষমতা অনেকটাই পুনরুদ্ধার করেন। দুর্নীতির সামান্যতম আঁচড় তাঁর গায়ে দীর্ঘস্থায়ী কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি।

গোবিন্দরাম মিত্রের বৈভব

এই বিপুল কালো টাকায় ততদিনে তিনি নিজেকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কুমারটুলিতে গঙ্গার ধারে ৫০ বিঘা জমি জুড়ে তৈরি করেন এক রাজকীয় প্রাসাদ। তার দুর্গাপুজোয় দেবী মূর্তিকে সোনা ও রুপোর গয়নায় পুরোপুরি মুড়ে ফেলা হত। চিৎপুর রোডে তৈরি করেছিলেন ১৬৫ ফুট উঁচু এক বিশাল নবরত্ন মন্দির, যা দেখে হুগলি নদীর ইংরেজ নাবিকরা নাম দিয়েছিল 'ব্ল্যাক প্যাগোডা'। ১৭৩৭ সালের প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে সেটি ভেঙে না পড়লে হয়তো আজও কলকাতার অন্যতম ল্যান্ডমার্ক হয়ে থাকত।

এদিকে উত্তর কলকাতার পরিচিত 'জোড়াবাগান' এলাকার নামটাই এসেছে তাঁর এবং উমিচাঁদের পাশাপাশি থাকা দুটো সুবিশাল বাগানবাড়ির অবস্থান থেকে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য