

কলকাতার দুর্গাপুজো। ছবি - Google
২৮শে আগস্ট, ২০২৬
দুর্গাপুজোর এখনও কয়েক সপ্তাহ বাকি। কিন্তু কলকাতার বড় পুজোগুলিতে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। কোথাও খুঁটিপুজো হয়ে গিয়েছে, কোথাও মণ্ডপের কাঠামো তৈরির কাজ শুরু। আর তার সঙ্গে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে এ বারের থিমও। তবে ২০২৬-এর কলকাতার পুজো শুধু থিমের কারণে আলাদা নয়। রাজনৈতিক পালাবদলের পরে একাধিক বড় পুজোর কমিটিতে বদল এসেছে। কোথাও পুরনো পৃষ্ঠপোষক নেই, কোথাও বাজেট কমেছে, কোথাও বড় আয়োজনের বদলে পাড়ার মানুষকে সামনে রেখে পুজো করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আবার কিছু পুজো আগের মতোই বড় চমকের পথে। এই বদলের কলকাতায় এমন পাঁচটি পুজো রয়েছে, যেগুলি এ বার কোনও ভাবেই বাদ দেওয়া যায় না।
এক সময় কলকাতায় ‘শ্রীভূমি’ বললেই পরের শব্দটি ছিল ‘সুজিত বসু’। বুর্জ খলিফা থেকে ডিজনিল্যান্ড, ভ্যাটিকান সিটি থেকে বাহুবলী- একটির পর একটি বিশাল মণ্ডপ তৈরি করে কলকাতার পুজোর মানচিত্রে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল লেকটাউনের শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব। সেই পুজোর সঙ্গে দীর্ঘ দিন অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে ছিল প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুর নাম। কিন্তু পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তিনি জেলবন্দি। আর রাজনৈতিক পালাবদলের পরে এ বার শ্রীভূমির পুজোতেও এসেছে বড় পরিবর্তন।
এ বার উদ্যোক্তাদের স্পষ্ট বার্তা, এটি আর কোনও ব্যক্তির পুজো নয়, ‘অধিবাসীবৃন্দের পুজো’। অর্থাৎ এলাকার মানুষকে সামনে রেখেই আয়োজন।
বদল এসেছে আয়োজনেও। আগের মতো বিপুল বাজেট, সুউচ্চ মণ্ডপ, লেজার শো এবং চোখধাঁধানো অলঙ্কারের বদলে এ বার তুলনায় সংযত আয়োজনের দিকে হাঁটছে শ্রীভূমি।
তবে তাই বলে থিমে পিছিয়ে যাচ্ছে না পুজো। এ বার মণ্ডপ তৈরি হবে রাজস্থানের জয়পুরের ঐতিহাসিক হাওয়া মহলের আদলে। অর্থাৎ সুজিতহীন শ্রীভূমির প্রথম পুজোতেই পুরনো জৌলুসের স্মৃতি আর নতুন কমিটির সংযম, দুইয়ের মুখোমুখি ছবি দেখা যাবে। আরও একটি বদল গুরুত্বপূর্ণ। পূজা কমিটির নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার পিতৃপক্ষ বা অনেক দিন আগে থেকে প্যান্ডেল উদ্বোধন করার দীর্ঘদিনের চেনা ট্রেন্ড বা প্রথা বন্ধ হচ্ছে। চিরাচরিত নিয়ম মেনে দেবীপক্ষে, অর্থাৎ ১৬ অক্টোবর ২০২৬ (মহাষষ্ঠী) বা তার এক-দুদিন আগে পুজোমণ্ডপ জনসাধারণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া বা উদ্বোধন করা হতে পারে। একইভাবে বিসর্জনের সময়ও এগিয়ে আনা হবে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন ৷ তাই শ্রীভূমি এ বার শুধু একটি থিমপুজো নয়, একটি বদলে যাওয়া পুজো দেখার জায়গা।
শ্রীভূমিতে যখন বদলের হাওয়া, তখন উত্তর কলকাতারই সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার যেন উল্টো পথে হাঁটছে। ৯১তম বর্ষে পা দেওয়া এই পুজো ইতিমধ্যেই খুঁটিপুজো সেরে ফেলেছে। প্রকাশ্যে এসেছে এ বারের ভাবনাও, ‘সনাতনী চেতনায় বন্দেমাতরম’।
গত বছর ‘অপারেশন সিঁদুর’ থিমে বিপুল আলোড়ন তৈরি করেছিল সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার। পহেলগাঁও হামলা এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর আবহ লাইট অ্যান্ড সাউন্ডের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ উদ্বোধন করেছিলেন পুজো। থিম দেখতে জনস্রোত নেমেছিল। একই সঙ্গে প্রশাসনের সঙ্গে পুজো কমিটির সংঘাতও প্রকাশ্যে এসেছিল।
এ বার সেই জায়গা থেকেই আরও বড় চমকের দাবি করছেন পুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক তথা বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ। তাঁর কথায়, এ বারের ভাবনা এমন, যা আগে কলকাতার পুজোয় দেখা যায়নি। তাঁর কথায়, "অতীতে আমাদের পুজো আটকাতে প্রতিবারে পুলিশ দিয়ে ঝামেলা করা হয়েছে৷ পালাবদল হয়েছে ৷ এবারে আর পুলিশের ঝামেলা নেই৷ এবার ফাটিয়ে দেব, অন্যরকম থিম হবে। দেখতে হবে, না হলে পস্তাতে হবে।"
মণ্ডপের কারকাজের দায়িত্বে শিল্পী শিবশঙ্কর পাল। প্রতিমা তৈরি করছেন মিন্টু পাল। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এ বারও সাবেকি মৃন্ময়ী প্রতিমার সঙ্গে থিমের মেলবন্ধন ঘটানো হচ্ছে। অর্থাৎ দর্শকের জন্য এখানে শুধু মণ্ডপ নয়, থিমের বক্তব্যটিও গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর কলকাতার থিমপুজোর মধ্যে কলেজ স্কোয়ারের আকর্ষণ অন্য জায়গায়। এখানে মণ্ডপ দেখার পাশাপাশি দেখতে হয় জলের উপর মণ্ডপের প্রতিচ্ছবি। ৭৯তম বর্ষে এ বার থিম রাজস্থানের জয়পুরের ঐতিহ্যবাহী অ্যালবার্ট হল মিউজিয়াম। কলেজ স্কোয়ারের বিশাল জলাশয়ের পাড়ে তৈরি হবে মণ্ডপ। সন্ধ্যা নামার পর আলো জ্বললে জলের উপর তার প্রতিফলনই হয়ে উঠবে পুজোর অন্যতম বড় আকর্ষণ।
বড় থিমের পুজো দেখতে গিয়ে যদি শুধু মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে ফিরে আসেন, কলেজ স্কোয়ারে সেই অভিজ্ঞতা হবে না। এখানে মণ্ডপের পাশাপাশি জল, আলো এবং প্রতিফলন- তিনটিই পুজোর অংশ। তাই উত্তর কলকাতার পুজো-পরিক্রমায় শ্রীভূমি এবং সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের সঙ্গে কলেজ স্কোয়ারকেও রাখতেই হবে।
দক্ষিণ কলকাতার পুজো মানেই শুধু বিশাল থিম নয়। সেই জায়গাটাই প্রতি বছর মনে করিয়ে দেয় একডালিয়া এভারগ্রিন। ৮৪তম বর্ষে এ বার তাদের মণ্ডপে উঠে আসছে গুজরাটের সোমনাথ মন্দির। অর্থাৎ থিম থাকছে, কিন্তু একডালিয়ার মূল পরিচয় বদলাচ্ছে না, সাবেকিয়ানা।
এখানে প্রতিমা, মণ্ডপ, ঝাড়বাতি এবং আলোকসজ্জা- সব মিলিয়ে একটা রাজকীয় পরিবেশ তৈরি করা হয়। থিমের দৌড়ে যেখানে অনেক পুজো প্রতিমাকেও বদলে ফেলছে, সেখানে একডালিয়া এখনও সাবেকি প্রতিমার সৌন্দর্যকেই সামনে রাখে। এই কারণেই কলকাতার পুজোর তালিকায় একডালিয়া আলাদা। এখানে গেলে দর্শক একসঙ্গে পাবেন বড় মণ্ডপের চমক এবং পুরনো কলকাতার পুজোর স্বাদ।
দক্ষিণ কলকাতার আর এক বড় নাম সুরুচি সঙ্ঘ। দীর্ঘ দিন এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বিশ্বাস পরিবারের নাম- অরূপ বিশ্বাস, স্বরূপ বিশ্বাস। রাজনৈতিক পালাবদলের পরে সেই ছবিও বদলেছে। নতুন কমিটিতে উত্তর দমদমের বিজেপি বিধায়ক সৌরভ সিকদার সম্পাদক হয়েছেন; অরূপ ও স্বরূপ বিশ্বাস বাদ পড়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হল, কমিটি বদলালেই কি পুজোর চরিত্র বদলে যাবে? সুরুচির পরিচিতি শুধু বাজেট বা মণ্ডপের আকারে নয়। সমাজসচেতন থিম, শিল্পীর কাজ এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ—এই তিনটি বরাবর এই পুজোর বড় শক্তি। ফলে এ বার নতুন কমিটির অধীনে সেই পুরনো পরিচিতি কতটা বজায় থাকে, সেটিও দর্শকদের আগ্রহের কারণ। অর্থাৎ সুরুচিতে এ বার শুধু মণ্ডপ দেখতে যাওয়ার বিষয় নয়। বদলে যাওয়া কলকাতার পুজোর ভিতরে একটি পুরনো পুজো কী ভাবে নিজের পরিচয় ধরে রাখে, সেটিও দেখার।
২০২৬-এর কলকাতার দুর্গাপুজোর আসল আকর্ষণ এখানেই। শ্রীভূমিতে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক পুজো থেকে ‘অধিবাসীবৃন্দের’ পুজোয় বদল। সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারে জাতীয় চেতনার থিম। কলেজ স্কোয়ারে ঐতিহাসিক স্থাপত্যের সঙ্গে জলের খেলা। একডালিয়ায় থিমের মধ্যেও সাবেকিয়ানা। আর সুরুচিতে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে নতুন কমিটির হাত ধরে পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখার পরীক্ষা।
তাই এ বার পুজোর মণ্ডপ দেখতে বেরোনোর আগে তালিকাটা ছোট করে নিন। মনে রাখবেন, সব দেখা সম্ভব না হলেও এই পাঁচটি বাদ দিলে ২০২৬-এর কলকাতার পুজোর বড় একটা গল্পই বাদ পড়ে যাবে!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
