

রালি ব্রাদার্সদের প্রতীকী ছবি - AI
২৫শে আগস্ট, ২০২৬
ভাগ্যান্বেষণে হোক বা আশ্রয়ের খোঁজে কলকাতায় বারবার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন জাতি, মানুষ ছুটে এসেছে। ইংরেজ, ফরাসি, দিনেমার, আর্মানি থেকে শুরু করে পর্তুগিজরা পর্যন্ত এই শহরের বুকে নোঙর ফেলেছে। সেই স্রোতেই ভেসে এসেছিল আরেকদল মানুষ। তারা শাসক হতে আসেনি। এসেছিল বাণিজ্য করতে। তারা হল গ্রিক। অনেকেরই অজানা যে একদল গ্রিক এই কলকাতার বুকে এক বিশাল বাণিজ্যিক ও ব্যবসায়ী সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিল। তার পরোক্ষ নিদর্শন আজও এই দেশে বহাল তবিয়তে এগিয়ে চলেছে।
কলকাতার গ্রিকদের কথা উঠলেই সবার আগে যে নামটা অবধারিতভাবে উঠে আসে, তা হল 'রালি ব্রাদার্স' (Ralli Brothers)।
রালি পরিবারের শেকড় ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা চিওস (Chios) দ্বীপে। ১৮১৮ সালে জ্যানিস, অগাস্টাস, প্যান্ডিয়া, তোমাজিস এবং ইউস্ট্র্যাটিওস এই পাঁচ গ্রিক ভাই ব্যবসা করার তাগিদে মাতৃভূমি ছেড়ে লন্ডনে পাড়ি দিয়েছিল। সেখানেই প্রতিষ্ঠা করেন 'রালি ব্রাদার্স'।
১৮২২ সাল। গ্রিকদের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে। সেই সময় অটোমান সুলতানের নির্দেশে চিওস দ্বীপে এক ভয়াবহ গণহত্যা চালানো হয়। চোখের পলকে প্রাণ হারায় হাজার হাজার মানুষ। রালি পরিবারের বাকি যে সদস্যরা এবং আত্মীয়স্বজনরা চিওস দ্বীপে বসবাস করতেন তাঁরা প্রাণ বাঁচাতে চিরতরে মাতৃভূমি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। ছিন্ন হয়ে যায় মাতৃভূমির সঙ্গে তাঁদের সব সম্পর্ক। আর ঠিক এই জায়গা থেকেই তারা পুরোপুরি প্রবাসী আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলতে শুরু করেন।
লন্ডন, রাশিয়া, আমেরিকা জুড়ে ব্যবসা বিস্তারের পর, ১৮৫১ সালে প্যান্ডিয়া রালি এবং জ্যানিস রালির হাত ধরে কলকাতায় রালি ব্রাদার্সের অফিস স্থাপিত হয়। ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতা তখন বাণিজ্যের এক অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। রালি ব্রাদার্স খুব দ্রুত এখানকার কৃষিজাত পণ্যের বিপুল চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা বাড়াতে শুরু করে।
ডালহৌসি স্কোয়ারের কাছে ১৬ নম্বর হেয়ার স্ট্রিট বা চার্চ লেন-এ তারা নিজেদের সদর দফতর তৈরি করেছিল। এখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হত গোটা ভারতে রালিদের ব্যবসা। তাদের প্রধান ব্যবসার ক্ষেত্র ছিল পাট। এছাড়াও গালা, তিল, হলুদ, আদা, চাল, সল্টপিটার এবং বোরাক্সের বাণিজ্যও করত।
ব্যবসা এতটাই ফুলেফেঁপে উঠেছিল যে, হুগলি নদীর তীরে হাওড়া এবং কাশীপুরে তাদের বিশাল গুদাম ও ডক তৈরি করতে হয়। উনিশ শতকের শেষের দিকে এই কোম্পানিতে প্রায় ৪,০০০ ইউরোপীয় ও ভারতীয় কেরানি এবং ১৫,০০০ শ্রমিক কাজ করতেন! তৎকালীন বিশ্ববাজারে পাটের গুণগত মান নির্ধারণ করা হত রালিদের তৈরি করা 'রালি স্ট্যান্ডার্ড' (Ralli Standard) অনুযায়ী।
প্রথমদিকে কলকাতায় আসা গ্রিকরা ব্যবসার সুবিধার্থে আমড়াতলা স্ট্রিট, কলুটোলা এবং লালবাজার সংলগ্ন অঞ্চলে একসাথে বসবাস করতেন। কিন্তু রালি ব্রাদার্সের রমরমা শুরু হওয়ার পর, কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্তারা আলিপুর, বালিগঞ্জ এবং চৌরঙ্গীর মতো কলকাতার অভিজাত এলাকায় বড় বড় বাংলো ও প্রাসাদে বসবাস করতে শুরু করেন।
রালি সহ কলকাতায় বসবাসরত গ্রিকদের জীবনযাত্রা ছিল পুরোপুরি ব্রিটিশ অভিজাতদের মতো। নিজস্ব জুড়িগাড়ি, পরবর্তীতে দামি মোটরগাড়ি, আর প্রাসাদ দেখভালের জন্য বহু কাজের লোক- সব মিলিয়ে এক নিখাদ 'সাহেবি' লাইফস্টাইল। তবে, আর্মানি বা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের মতো এরা স্থানীয়দের সঙ্গে খুব একটা মিশতেন না। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি আর ধর্ম নিয়ে একটি 'ক্লোজ-নিট' সমাজ তৈরি করে নিয়েছিলেন। তাই কলকাতা সংস্কৃতি বা রন্ধনশৈলীতে গ্রিক প্রভাব সেভাবে পড়েনি। অফিসে হাজার হাজার ভারতীয় কর্মী কাজ করলেও, গ্রিকরা একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই থাকতে পছন্দ করত।
তবে রালি ব্রাদার্সের ইতিহাস যে শুধুই সাফল্যের, তা কিন্তু নয়। এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বেশ কিছু বিতর্কিত এবং ব্যতিক্রমী অধ্যায়।
উনিশ শতকের শেষের দিকে এরা সরাসরি কুখ্যাত আফিমের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ আমলে চিন ও ভারতের সাধারণ মানুষের চরম দুর্দশার অন্যতম কারণই ছিল এই আফিম বাণিজ্য। আর রালি ব্রাদার্স এর থেকে প্রচুর মুনাফা লুটেছিল।
আরেকটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। সামরিক পরিখার জন্য বালি ভরার পাটের বস্তা সরবরাহের বিশাল এক চুক্তি ব্রিটিশ ওয়ার অফিস তুলে দেয় রালি ব্রাদার্সের হাতে। একটি বিদেশি কোম্পানিকে এত বড় সুযোগ দেওয়ায় স্থানীয় ভারতীয় ও ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা তখন চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আইনের জগতেও এদের একটি যুগান্তকারী অবদান রয়েছে। স্পেনে পাট সরবরাহ নিয়ে রালি ব্রাদার্সের একটি মামলার রায় থেকে তৈরি হয় 'Ralli Brothers Principle'। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনও চুক্তি যেখানে কার্যকর করা হবে, সেখানকার স্থানীয় আইনে তা বেআইনি হলে সেই চুক্তি বলবৎযোগ্য নয়।
কলকাতার বুকে গ্রিক স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় নিদর্শনটি কিন্তু এই রালি ব্রাদার্স ও রালি পরিবারেরই অবদান। ১৯২৪ সালের দিকে আমড়াতলা স্ট্রিটের পুরনো গ্রিক চার্চটির চারপাশ অত্যন্ত ঘিঞ্জি হয়ে যাওয়ায়, সেটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯২৫ সালে কালীঘাট ট্রাম ডিপোর ঠিক পাশে তৈরি হয় অপূর্ব সুন্দর গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ। প্রাচীন গ্রিসের 'ডরিক কলাম'-এর আদলে তৈরি এই চার্চটির প্রায় সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করেছিল রালি ব্রাদার্স।
এছাড়া ফুলবাগানের ঐতিহাসিক গ্রিক সমাধিক্ষেত্রটির রক্ষণাবেক্ষণেও তাদের বড় অবদান ছিল।
দীর্ঘ ৮০ বছর দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করার পর, ১৯২৯ সালের পৃথিবীব্যাপী মহামন্দা (Great Depression) এবং ১৯৩১ সালের বিশ্ব মুদ্রা সঙ্কটে ভারতীয় পাটের বাজার ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৩১ সালে রালি ব্রাদার্সকে ভারতে তাদের মূল পাট ও ট্রেডিং ব্যবসা বন্ধ করতে হয়।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৪৮ সালে কলকাতায় 'র্যালিস ইন্ডিয়া লিমিটেড' (Rallis India Ltd.) নামে তাদের পুনর্জন্ম ঘটে। ১৯৬১ সালে লন্ডনের ব্যবসায়ী স্যার আইজ্যাক উলফসন মূল কোম্পানিটি কিনে নেন এবং ১৯৬২ সালে ভারতীয় শাখাটি বিক্রি করে দেন। সেই সময় টাটা গ্রুপ (Tata Group) এটিকে অধিগ্রহণ করে।
আজকের 'র্যালিস ইন্ডিয়া' আসলে সেই গ্রিক বণিক পরিবারেরই রেখে যাওয়া এক দীর্ঘ লিগ্যাসি। যারা একদিন খালি হাতে এই শহরে এসেছিল, তারা চলে গেলেও তাদের স্মৃতি আজও মিশে আছে কলকাতার ধুলোবালিতে, কালীঘাটের ওই চার্চের কলামে আর পুরনো নথিপত্রের বিবর্ণ পাতায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
