

বিলাসব্যসনে ভোজনে মজে থাকা রাজবাড়ি। প্রতীকী ছবি - AI
২৪শে আগস্ট, ২০২৬
একটা সময় ইংরেজদের তোষামোদি করে কলকাতা শহরে রমরমা শুরু হয়েছিল হঠাৎ করে ব্যাপক পয়সাওয়ালা হয়ে ওঠা বাবু শ্রেণির। সেই বাবুদের হাত ধরে আসা বাবু কালচারের পরতে পরতে জড়িয়ে ছিল ব্যাপক রঙ্গ। বাতাসে উড়ত টাকা। সেই টাকার গরমে বাবুদের পা মাটিতে পড়ত না। অর্থ, প্রতিপত্তি আর উদ্দাম নারীসঙ্গ এই নিয়েই ছিল সেকালের নব্য ধনীদের জীবন। এই বাবুদের ভিড়েই একজন সরেস ব্যক্তি ছিলেন, যিনি চুঁচুড়া থেকে এসে কলকাতার বুকে রীতিমতো আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন। নাম প্রাণকৃষ্ণ হালদার। তাঁর কাজকর্ম দেখলে মনে হত যেন কুবেরের ধন পেয়েছেন। তবে এই ব্যক্তির পরতে পরতে জড়িয়ে ছিল ভয়ঙ্কর কেচ্ছা।
চুঁচুড়ার এক খুব সাধারণ গৃহস্থ পরিবারে জন্ম হয়েছিল প্রাণকৃষ্ণ হালদারের। তবে গোড়া থেকেই তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল আকাশছোঁয়া। হঠাৎ করেই যেন একদিন তাঁর হাতে এসে পড়ল আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। রাতারাতি বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে গেলেন তিনি। এরপরই চুঁচুড়া থেকে কলকাতায় এসে গড়ে তুললেন বিশাল প্রাসাদ। তাঁর বাড়ির আসবাবপত্র, ঝাড়লণ্ঠন থেকে শুরু করে রোজকার ব্যবহারের জিনিস সবকিছুতেই ছিল চূড়ান্ত আভিজাত্য ও বড়লোকিয়ানার ছাপ। রাতারাতি তাঁর এই নবাবিয়ানায় শহরের তাবড় জমিদাররাও বিস্মিত হয়েছিলেন।
প্রাণকৃষ্ণ হালদারের বাবুগিরির সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল তাঁর বাড়ির দুর্গোৎসব। ধর্মকর্মের চেয়ে নিজের প্রতিপত্তি দেখানোই ছিল প্রধান লক্ষ্য। এনার উৎসবের ধরন ছিল বাকিদের থেকে অনেকটাই আলাদা।
সাহেবি আনাগোনা: পুজোর সময় কলকাতার বড় বড় ইংরেজ সাহেব, ম্যাজিস্ট্রেট এবং কোম্পানির কর্তাদের বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হত। আভিজাত্য দেখাতে তিনি দুর্গাপুজোর নিমন্ত্রণপত্র ছাপতেন ইংরেজিতে! যা সেকালে বেশ অবাক করা ব্যাপার ছিল।
পূজোর মণ্ডপে বসাতেন বাইজি নাচের আসর! সাহেবদের আপ্যায়নের জন্য ঢালাও শ্যাম্পেন ও বিলাতি মদের ব্যবস্থা থাকত। তবে আরও একটা চমকপ্রদ ব্যাপার ছিল। তাঁর বাড়িতে আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথিদের সোনার থালায় খাবার পরিবেশন করা হত।
কিন্তু প্রশ্ন হল প্রাণকৃষ্ণের কাছে এত টাকা এল কোথা থেকে? পরিবারের কোনও বড় ব্যবসা ছিল না। পৈতৃক সম্পত্তিও তেমন কিছু নয়। এখানেই লুকিয়ে ছিল বাবু প্রাণকৃষ্ণের জীবনের সবচেয়ে বড় কেচ্ছা। তিনি আসলে ছিলেন একজন ঘাঘু জালিয়াত। তৎকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ডামাডোলের সুযোগ নিয়ে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারি 'প্রমিসরি নোট' বা ট্রেজারি বন্ড অত্যন্ত নিপুণভাবে জাল করতে শুরু করেন। যা আজকের দিনের ব্যাঙ্ক জালিয়াতির সমান। এই জালিয়াতির টাকা দিয়েই বছরের পর বছর ধরে চলত তাঁর নবাবিয়ানা এবং বিলাসবহুল পারিবারিক জীবন।
তবে কথাতেই আছে, পাপ চিরকাল চাপা থাকে না। একদিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তাদের হাতে জালিয়াতি সমেত ধরা পড়ে গেলেন প্রাণকৃষ্ণ। তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টে বিচার হয়। যে ব্যক্তি সোনার থালায় খেতেন, অতিথিদের সোনার তলার খাবার পরিবেশন করতেন, যাঁর কথায় শহরের বাঘা বাঘা লোক উঠত-বসত, সেই তাঁরই নাকি শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হল আলিপুর জেলে! শুধু জেল নয়, প্রাণকৃষ্ণ হালদারের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল।
শোনা যায়, জেলের ভেতর তাঁকে দিয়ে আক্ষরিক অর্থই ঘানি টানানো হত। তাঁর এই নাটকীয় পতন নিয়ে সেকালের কলকাতায় পথেঘাটে প্রচুর ব্যঙ্গাত্মক ছড়া ও গান রচিত হয়েছিল।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
