২৯শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
টানা বসে কাজ করেন? কোন রোগ বাসা বাঁধছে শরীরে!

টানা বসে কাজ করার ক্লান্তি কাটান! ছবি: AI

টানা বসে কাজ করেন? কোন রোগ বাসা বাঁধছে শরীরে!

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থেকে ফ্যাটি লিভার: ডেস্ক জব কি শরীর শেষ করছে?

টানা বসে কাজ কীভাবে ডেকে আনছে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার? সিটিং ডিজিজের আসল বিপদ এবং ডেস্ক জবে থেকেও লিভার সুস্থ রাখার সহজ বৈজ্ঞানিক উপায়।

মূল বিষয়

সকাল দশটায় অফিসের চেয়ারে বসা, মাঝে কেবল লাঞ্চের জন্য মিনিট কুড়ির বিরতি, আর তারপর আবার ল্যাপটপের নীল স্ক্রিনে চোখ রেখে রাত আটটা বাজিয়ে দেওয়া। বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীরে সোফায় এলিয়ে পড়া। আধুনিক নগরজীবনের এটাই চেনা ছবি। আমাদের কাজগুলো হয়তো শারীরিক ক্লান্তি দিচ্ছে না, কিন্তু মস্তিষ্ক আর চোখ বাদে শরীরের বাকি অংশ ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকছে সম্পূর্ণ অকেজো।

চিকিৎসাবিজ্ঞান এই দশাকেই বলছে ‘সিটিং ডিজিজ’ (Sitting Disease)। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই, অথচ চেয়ারে আট-নয় ঘণ্টা একটানা বসে থাকার ফলে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে আমাদের মেটাবলিক ইঞ্জিন। যার সরাসরি পরিণতি—ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং নিঃশব্দ ঘাতক নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার (NAFLD বা MASLD)।

১. পেশি যখন ঘুমিয়ে: ইনসুলিনের অকেজো হয়ে পড়া

আমরা যখন হাঁটাচলা করি বা শরীর সচল থাকে, তখন আমাদের বড় পেশিগুলো (বিশেষ করে উরু ও কাফ মাসল) রক্তে থাকা অতিরিক্ত গ্লুকোজ সরাসরি জ্বালানি হিসেবে টেনে নেয়।

  • ইনসুলিনের কাজ: আমরা যাই খাই না কেন, তা ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়। অগ্ন্যাশয় থেকে ক্ষরিত ইনসুলিন হরমোনের কাজ হলো কোশের তালা খুলে সেই গ্লুকোজকে কোশের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া, যাতে কোশ শক্তি পায়।
  • টানা বসে থাকার বিপদ: যখন শরীর ঘণ্টার পর ঘণ্টা নড়াচড়া ছাড়া বসে থাকে, তখন পেশিকোষে থাকা ‘GLUT-4’ নামের গ্লুকোজ ট্রান্সপোর্টারগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পেশি আর রক্ত থেকে চিনি টানতে পারে না।
  • রেজিস্ট্যান্সের জন্ম: অগ্ন্যাশয় তখন ভাবে ইনসুলিনের ঘাটতি হয়েছে, তাই সে আরও বেশি করে ইনসুলিন তৈরি করতে থাকে। রক্তে গ্লুকোজ ও ইনসুলিন—দুটোর মাত্রাই অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে। কোশগুলো অতিরিক্ত ইনসুলিনে সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একেই বলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স।

২. ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থেকে লিভারে চর্বির পাহাড়

রক্তে যখন অতিরিক্ত ইনসুলিন আর গ্লুকোজ ঘুরপাক খেতে থাকে, তখন শরীর সেই অতিরিক্ত চিনিকে নষ্ট হতে দেয় না। সে সোজা লিভারকে নির্দেশ দেয় অতিরিক্ত চিনিকে ট্রাইগ্লিসারাইড বা ফ্যাটে রূপান্তরিত করতে (De Novo Lipogenesis)।

আরও পড়ুন
ট্রেকিং থেকে স্কুবা ডাইভিং: অ্যাড্রেনালিন রাশ খুঁজছেন? রইল সেরা ঠিকানা
ছানা কাটানোই ছিল ‘পাপ’! বাঙালির মিষ্টি-বিপ্লবের অজানা গপ্পো
সোলো ট্রিপ আর স্বপ্ন নয়! মেয়েদের নিরাপদে ঘোরার সেরা ৫ গন্তব্য
  • স্বাভাবিক অবস্থায় লিভারের ওজনের ৫ শতাংশের কম ফ্যাট থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ফলে লিভার অবিরাম গ্লুকোজ থেকে ফ্যাট তৈরি করে এবং সেই ফ্যাট নিজের কোশেই জমাতে শুরু করে।
  • লিভারের কোশগুলো ফ্যাটে বোঝাই হয়ে ফুলতে শুরু করে। যাকে আমরা চলতি ভাষায় বলি গ্রেড-১ বা গ্রেড-২ ফ্যাটি লিভার।
  • বিপজ্জনক বিষয় হলো, অ্যালকোহল স্পর্শ না করেও শুধু নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন আর অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটের কারণে এই ফ্যাটি লিভার হতে পারে, যা চিকিৎসা পরিভাষায় মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ
  • (MASLD)।

৩. নিশ্চুপ ঘাতক: লক্ষণহীন বিপদ

ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে মারাত্মক দিক হলো—এর নিজস্ব কোনো আগাম ব্যথা বা তীব্র উপসর্গ থাকে না।

  • সামান্য পেটের ডানপাশে অস্বস্তি, দুপুরের পর অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঝিমুনি ভাব, কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই ওজন বৃদ্ধি ছাড়া তেমন কোনো সংকেত মেলে না।
  • নিয়মিত পেটের আল্ট্রাসাউন্ড বা ফাইব্রোস্ক্যান না করালে বছরের পর বছর এই চর্বি জমতে থাকে।
  • দীর্ঘদিন প্রদাহ (Inflammation) চলতে থাকলে লিভারের স্বাভাবিক কোশগুলো শুকিয়ে শক্ত হতে শুরু করে—যাকে বলে ‘লিভার ফাইব্রোসিস’ বা ‘সিরোসিস’।

৪. অফিস ডেস্কেই বদলান অভ্যাস: বাঁচার সহজ বিজ্ঞান

জিমে গিয়ে এক ঘণ্টা ঘাম ঝরানো নিঃসন্দেহে ভালো, কিন্তু দিনের বাকি নয় ঘণ্টা যদি একনাগাড়ে চেয়ারে বসে থাকেন, তবে সেই এক ঘণ্টার জিম ফ্যাটি লিভার আটকাতে যথেষ্ট নয়। সারাদিনের নিষ্ক্রিয়তাকে ভাঙতে হবে ছোট ছোট পদক্ষেপে:

  • ‘পোমোডোরো’ মুভমেন্ট (প্রতি ৩০ মিনিটে বিরতি): প্রতি আধঘণ্টা বা চল্লিশ মিনিট অন্তর চেয়ার ছেড়ে অন্তত ২ মিনিটের জন্য উঠুন। একটু জল খান, করিডোরে হাঁটুন বা দাঁড়িয়ে হাত-পা টানটান করুন। এতে পেশির গ্লুকোজ শোষণ সক্রিয় থাকে।
  • পোস্ট-মিল ওয়াক (খাওয়ার পর ১০ মিনিট হাঁটা): দুপুরের ভারী লাঞ্চের পর কখনোই সরাসরি চেয়ারে গিয়ে বসবেন না। খাওয়ার পর অন্তত ১০–১৫ মিনিট ধীরেসুস্থে হাঁটাহাঁটি করুন। এতে খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ লাফিয়ে বাড়ে না (Glucose Spike আটকায়)।
  • সোলেয়াস পুশ-আপ (চেয়ারে বসেই এক্সারসাইজ): চেয়ারে বসেই পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে গোড়ালি বারবার ওঠানামা করান (Calf Raises)। কাফ মাসলের ‘সোলেয়াস’ পেশি শরীরের অন্যতম প্রধান গ্লুকোজ বার্নার; বসে বসেও এই ব্যায়াম রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
  • কার্ব ও মিষ্টি পানীয়ে রাশ: কাজের ফাঁকে কোল্ড ড্রিঙ্কস, প্যাকেটজাত ফলের রস, বিস্কুট বা মিষ্টি চা খাওয়ার অভ্যাস পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। ফ্রুক্টোজ সরাসরি লিভারে গিয়ে ফ্যাট তৈরি করে। বদলে ব্ল্যাক কফি, গ্রিন টি বা সাধারণ জল খান।
  • স্ট্যান্ডিং মিটিং বা ওয়াকিং কল: ফোনে কথা বলার সময় এক জায়গায় বসে না থেকে হেঁটে হেঁটে কথা বলার অভ্যাস করুন। সম্ভব হলে অল্টারনেট করে দাঁড়িয়ে কাজ করার মতো অ্যাডজাস্টেবল ডেস্কের সাহায্য নিন।

দৈনন্দিন রুটিরুজির তাগিদে চেয়ারে বসে কাজ করা হয়তো আটকানো সম্ভব নয়, কিন্তু শরীরকে সম্পূর্ণ স্থবির করে রাখা একেবারেই ব্যক্তিগত অভ্যাসের বিষয়। লিভারের ফ্যাট কোনো ওষুধ দিয়ে রাতারাতি ম্যাজিকের মতো গলানো যায় না—তার জন্য প্রয়োজন পেশির সচলতা আর সচেতন রুটিন। চেয়ারের আয়েশ যেন শরীরের ভেতরে স্থায়ী রোগের বাসা না বাঁধে, সময় থাকতে সতর্ক হওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়

সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য