

জাপানি 'দাদু' তোসিসুক কানাজাওয়া। ছবি - Google
২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জীবনে কোনওদিন কোনও নেশা করেননি। মোট আট ঘণ্টা বিশ্রাম করবেনই। পাশাপাশি মনকে ফুরফুরে রাখতে গান শোনেন, আড্ডা দেন ও বিদেশ সফরে বেরিয়ে পড়েন নাতি-নাতনিদের নিয়ে। ৮০ বছর বয়সেই তিনি ছ’টি মাস্টার্স কাপ জিতেছেন, দশবছরে আরও ১৩টি।
বয়স একটা সংখ্যা মাত্র। এই বহু প্রচলিত কথাটি জাপানের এই প্রবীণ বডিবিল্ডারের ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। ইনি চলতি বছর সেপ্টেম্বর মাসেই আন্তর্জাতিক মাস্টারস বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৯০ বছর বয়সে খেতাব জিতেছেন। এগুলো গল্পকথা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ বেশিরভাগ ৭০ পেরনো মানেই লাঠিতে ভর করে হাঁটে। সেখানে দেহের পেশির সঞ্চালন দেখিয়ে বিশ্বকে মোহিত করছেন ‘দাদু’ তোসিসুক কানাজাওয়া।
এই প্রথম নয়, মোট ১৯টি আন্তর্জাতিক খেতাব আছে তোসিসুক কানাজাওয়ার। মানুষটি ৩৪ বছর বয়সে বডিবিল্ডিংকে বিদায় জানিয়েছিলেন হাঁটুতে একটি বড় চোট নিয়ে। তারপর দীর্ঘ ১৬ বছর পর চোট কাটিয়ে আবারও প্রাণশক্তি নিয়ে ৫০ বছর বয়সে ফিরেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। সেই শুরু, তারপর বয়স যত বেড়েছে, এই প্রবীণ আরও ক্ষুরধার হয়েছেন।
কী করে শরীরের এমন ম্যাজিক দেখানো সম্ভব হল? সেই নিয়ে প্রশ্নের জবাবে কানাজাওয়া জানিয়েছেন, ‘‘জীবন থেকে মাছ-মাংস বাদ দিতে হবে। ধূমপান ও মদ্যপান নয় কোনওমতেই। প্রতিদিন দু’ঘণ্টা করে শারীরিক কসরত করতে হবে।’’ তিনি খেতে ভুলে গেলেও জিমে যাওয়া ছাড়েন না! যৌবনে দিনে টানা তিন ঘণ্টা করে অনুশীলন করতেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেড় ঘণ্টাতে নামিয়ে এনেছেন কসরতের সময়। এমনকী প্রোটিন শেক খান সপ্তাহে তিনদিন।
২০২৬ সালের আগস্টে ৯০ বছর বয়সে অল জাপান মাস্টার্স ওপেন ফিটনেস চ্যাম্পিয়নশিপে অনুর্ধ্ব ৮৫ বয়সীদের আসরে তিনি চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। হারান তাঁর থেকে বয়সে অনেকটাই কম সাত বডিবিল্ডারকে। ১৯৩৬ সালে জাপানের শিমানে প্রিফেকচারে জন্ম কানাজাওয়ার। বডিবিল্ডার হওয়ার আগে তাঁর স্বপ্ন ছিল অলিম্পিকে সাঁতার কাটা। স্কুলে তিনি এক হাজার পাঁচশো মিটার ফ্রিস্টাইলে চ্যাম্পিয়ন ছিলেন, কিন্তু পেশির সমস্যার কারণে সেই স্বপ্ন থেমে যায়। এরপরই তাঁর জীবনে আসে বডিবিল্ডিং। বাবা-মাকে জানান, জাপানের সেরা বডিবিল্ডার হতে চান। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পরবর্তী পাঁচ বছর প্রায় পুরোপুরি প্রশিক্ষণে ডুবে ছিলেন। কখনও দিনে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত শরীরচর্চা করতেন। খাবারেও ছিল না কোনও বিলাসিতা। মায়ের হাতে তৈরি সাধারণ খাবারই ছিল তাঁর ভরসা।
চব্বিশ বছর বয়সে কানাজাওয়া প্রথম মিস্টার জাপান খেতাব জেতেন। তিন বছর পরে ফের জাতীয় সেরা হন। ষাটের দশকে জাপানের বডিবিল্ডিং মঞ্চ থেকে তাঁর পরিচিতি পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়। ১৯৬৭ সালে কানাডার মন্ট্রিয়লে মিস্টার ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় তিনি আর্নল্ড সোয়ার্জেনেজার এবং সার্জিও অলিভার সঙ্গে একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নামেন। সেই আসরে কানাজাওয়া চতুর্থ হয়েছিলেন। তারপর তিনি বডিবিল্ডিং ছেড়ে দিয়েছিলেন। নিজের চোট, সেইসঙ্গে স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে একটি বেসরকারী সংস্থায় পরামর্শদাতার কাজ করতেন। কিন্তু মনের মধ্যে তখনও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার একটা খিদে ছিল। সেটিকেই বাড়িয়ে দিয়েছিলেন স্ত্রী সুমি। স্ত্রী-ই স্বামীকে উৎসাহিত করে আবারও মঞ্চে নামান, আর সফলও হন ৫০ বছর বয়সে গিয়ে, তখনই কানাজাওয়ার মোট চারজন সন্তান ছিলেন।
৫০ বছর বয়সে বডিবিল্ডিংয়ে ফিরলেও মাছ-মাংস জীবন থেকে বাদ দিয়ে দেন। ঘরের তৈরি খাবার খেতে শুরু করেন, প্রয়োজনে পান্তা-ভাত খেতেন শরীর বড় করার জন্য। তাঁর প্রতিদিনের খাবার অত্যন্ত সাধারণ। সকালে বাদামি চালের ভাত, নাত্তো এবং মিসো স্যুপ থাকে। নাত্তো তৈরি হয় সোয়াবিন থেকে। দুপুর ও রাতে বাদামি ভাতের সঙ্গে অল্প ফুরিকা খান। মিসো স্যুপে কাঁচা ডিমও যোগ করেন। একসময় দিনে ছয়টি প্রোটিন শেক খেতেন, সেটি কমিয়ে এখন সপ্তাহে তিনটিতে নিয়ে এসেছেন।
জীবনে কোনওদিন কোনও নেশা করেননি। মোট আট ঘণ্টা বিশ্রাম করবেনই। পাশাপাশি মনকে ফুরফুরে রাখতে গান শোনেন, আড্ডা দেন ও বিদেশ সফরে বেরিয়ে পড়েন নাতি-নাতনিদের নিয়ে। ৮০ বছর বয়সেই তিনি ছ’টি মাস্টার্স কাপ জিতেছেন, দশবছরে আরও ১৩টি। হিরোশিমায় নিজের অর্থে একটি বিলাসবহুল জিম বানিয়েছেন, সেখানেই প্রতিদিন গা ঘামান। খুব সাধারণভাবে কানাজাওয়া থাকতে ভালবাসেন। যিনি মনে করেন মনের বয়সই বাড়ে, শরীরের বয়স একই থাকে!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
