

বৃত্ত সম্পূর্ণ করলেন চানু। ছবি - Google
২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
একটা সময় চানুদের পাকা ছাদ ছিল না। টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির সময় অঝোরে জল পড়ত ঘরে। গ্রামে বার্বেল দিয়ে ভারত্তোলন শুরু করেছিলেন মাত্র ১২ বছর আগে। অথচ এত দেরিতে শুরু করেও মাত্র এক যুগের মধ্যে তাঁর যে উত্থান ঘটেছে, সেটাই একটা রূপকথা।
প্রেরণার নাম মীরাবাই চানু, জেদের নামও। তিনি খেটে খাওয়া আমআদমি মানুষের কাছে আশার আলোকবর্তিকা। তিনি ৩২-এও ভারত্তোলনে পদকের আলোয় স্নাত হতে পারেন। তিনি প্রমাণ করতে পারেন, নিজের কাছে লড়াইয়ে হারতে নেই কখনও। তুমি যদি নিজে মনে করো তুমি শেষ, তা হলে উঠে দাঁড়াতে পারবে না। তাই এগিয়ে চলো নিজের লক্ষ্যে, তেমনটি করলেই তুমি আসল চ্যাম্পিয়ন।
মণিপুরের এক অজ গ্রাম থেকে উঠে এসে দেশের ক্রীড়া মানচিত্রে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখেছেন মীরাবাই। দু’বছর আগে প্যারিস অলিম্পিকে অল্পের জন্য পদক হাতছাড়া করেছিলেন। তারও আগে ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকেও হতাশ হতে হয়েছিল তাঁকে। অন্য কেউ হলে খেলাই ছেড়ে দিতেন। কিন্তু তিনি পাহাড়ি কন্যা, সেই কারণেই জেদি ও পরিশ্রমীও। সেটাকেই সম্বল করে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন, আর নিজের লক্ষ্য ঠিক করে এগিয়ে গিয়েছেন। আর তারই ফলশ্রুতিতে এবার জাপানের আইচি নাগোয়া এশিয়ান গেমসে তাঁর নামের পাশে রুপোর পদক।
প্যারিস অলিম্পিকে ব্যর্থ হয়ে চানু বলেছিলেন, আজ তাঁর পক্ষে দিনটা ছিল না, তবে তিনি আবারও সাফল্যের রাস্তায় ফিরবেন দারুনভাবে। সেটা যে শুধু কথার কথা ছিল না, সেটা মীরাবাই বুঝিয়ে দেন ২০২৬ কমনওয়েলথ গেমসে তৃতীয়বার সোনা জয়ের মাধ্যমে। চোটের কারণে তিনি বহুদিন কোনও প্রতিযোগিতায় নামতে পারেননি। কিন্তু তাঁর কোচ কুঞ্জরানি দেবীর কাছে তালিম নিয়ে টোকিও অলিম্পিকে রুপো জিতেছিলেন।
চানুর ক্যাবিনেটে এতদিন কোনও এশিয়ান গেমসের পদক ছিল না। ভারতীয় ভারত্তোলকদের মধ্যে কর্ণম মালেশ্বরী শেষবার ১৯৯৮ সালে ব্যাঙ্কক এশিয়ান গেমসে রুপো পেয়েছিলেন। দীর্ঘ ২৮ বছর পরে চানুর হাত ধরে সেই বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছে। টোকিও অলিম্পিকে পদকজয়ী মীরাবাই চলতি এশিয়ান গেমসে স্ন্যাচে ৮৮ কেজি ও ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১১১ কেজি, সবমিলিয়ে মোট ১৯৮ কেজি ওজন তুলে পদক জিতলেন। দু’বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়ার রি সং গুম স্ন্যাচে ৯৪ কেজি ও ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১২১ কেজি, মোট ২১৫ কেজি রেকর্ডব্রেকিং ওজন তুলে সোনা জেতেন। ২০১৮, ২০২৩ সালের পরে ২০২৬ সালেও সোনা জয়ের হ্যাটট্রিক করলেন তিনি। ব্রোঞ্জ জেতেন ইন্দোনেশিয়ার উইজয়ানা লুলুক দিয়ানা ১৯১ কেজি ( স্ন্যাচে ৮৭ ও ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১০৩) ওজন তুলে।
চানু স্ন্যাচে ৮৩ কেজি ওপেন তুলে শুরু করেছিলেন পদক জয়ের লড়াই। পরের দু’বারে তোলেন ৮৫ ও ৮৭ কেজি। তখন ছিলেন তৃতীয় স্থানে। কিন্তু ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১১১ কেজি ওজন তুলে রুপো জয় নিশ্চিত করেন ভারতের নামী তারকা, যিনি পদ্মশ্রী সম্মানও পেয়েছেন। এই পদক জয়ের সুবাদে চানু বিরল নজির গড়লেন। তিনি অলিম্পিক, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, কমনওয়েলথ গেমস ও এশিয়ান গেমসেও দেশের হয়ে পদক জিতলেন।
একটা সময় চানুদের ছাদের ঘর ছিল না। টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির সময় অঝোরে জল পড়ত ঘরে। গ্রামে বার্বেল দিয়ে ভারত্তোলন শুরু করেছিলেন মাত্র ১২ বছর আগে, এত দেরিতে শুরু করেও মাত্র এক যুগের মধ্যে তাঁর যে উত্থান ঘটেছে, সেটাই একটা রূপকথা। তাই চানু এশিয়ান গেমসে প্রথম পদক জয়ের পরে আবেগরুদ্ধ। তিনি জানিয়েছেন, "আমার ট্রফি ক্যাবিনেটে এই এশিয়ান গেমসের পদকটাই ছিল না। কিন্তু গত কমনওয়েলথ গেমসে সোনা পাওয়ার পরে হাল ছাড়িনি। এরমধ্যে চোট পেয়েছিলেন, তারপর অনুশীলন করে ফিরেও এসেছি। আমি তাই নতুন প্রজন্মের অ্যাথলিটদের উদ্দেশে বলব, হাল ছেড়ো না কখনও। নিজের কাছে হার মানে জীবনে বড় পরাজয়। সবকিছুর ওপর দেশ, এটা মাথায় রেখে নিজের কাজ করে যেতে হবে নিঃশব্দে, ফল এমনিই আসবে।"
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
