

ময়ূরাক্ষীর চরে সাদা কাশের মেলা আর দূর দিগন্তের শান্ত জলছবি
পুজোয় শহরের ভিড়ভাট্টা আর যানজট এড়াতে চান? ঘাটশিলা, টাকী থেকে গড় জঙ্গল—কলকাতা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে সেরা ৫টি নিরিবিলি ছুটির ঠিকানা ও ট্রিপ গাইড।
পুজোর ক'টা দিনই তো ছুটি! মন তো পালাই পালাই করবেই! শহরের রাস্তায় সেই একঘেয়ে ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা কিংবা মণ্ডপের সামনে থিকথিকে ভিড় কিংবা লাউডস্পিকারের কানফাটানো আওয়াজ আর রেস্তরাঁর লম্বা লাইন—কিছুই যদি আপনার ভাল না লাগে, এই প্ল্যানটা আপনার জন্য।
সোজা বেরিয়ে পড়ুন গাড়ি নিয়ে। বাস বা ট্রেনের টিকিট পেলে তো কথাই নেই! কলকাতা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেখানে ভিড়ের উপদ্রব নেই, উৎসবের হুজুগ নেই— শুধু অপার নিস্তব্ধতা। পুজোয় দিন তিনেকের ছুটিতে ব্যাগ গুছিয়ে যদি এমন কোথাও হারিয়ে যেতে পারেন, মন্দ কী! কাছেই রয়েছে সেরা ৫ ছুটির ঠিকানা! জানেন কোনগুলো? চলুন বেরিয়ে আসা যাক।

শহরের কংক্রিট ছেড়ে একটু খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিতে চান? স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সোজা ধরে নিন বোম্বে রোড। খড়্গপুর পেরিয়ে গাড়ি যখন ঝাড়খণ্ডের সীমানায় ঢুকবে, রাস্তার দু’ধারে শাল-মহুয়ার জঙ্গল আপনাকে স্বাগত জানাবে।
ঘাটশিলায় পা রাখা মানেই অদ্ভুত এক নস্টালজিয়া। ঘুরে আসুন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গৌরী কুঞ্জ’। সাহিত্যিকের লেখার টেবিলে বসে আজও যেন অপুর পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। একটু বেলার দিকে গাড়ি ছুটিয়ে চলে যান বুরুডি লেক কিংবা ধারাগিরি ফলস। চারপাশের নীল পাহাড় আর লেকের শান্ত জলের মায়ায় শহরের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষে উবে যাবে। আর বিকেলটা? সুবর্ণরেখার পাড়ে পাথরের ওপর বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে গরম চায়ে চুমুক—পুজোর ছুটি সার্থক হতে আর কী চাই?

পুজোয় শান্তিনিকেতনে পা ফেলার জায়গা থাকে না। তবে বীরভূমের আসল সোঁদা গন্ধটা নিতে চান? চলে আসুন সিউড়ির কাছে তিলপাড়া ব্যারেজে।
শরতের এই সময়টায় ময়ূরাক্ষীর চরে সাদা কাশের মেলা বসে। নীল আকাশ, নদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা হাওয়া আর দূরে সাঁওতালি গ্রামের মেঠো সুর। ব্যারেজের ওপর দিয়ে অলস হাঁটা কিংবা চরে বসে একলা সময় কাটানো—মনে হবে এক লহমায় জীবনটা শান্ত হয়ে গেল। কাছেই রয়েছে মহম্মদবাজারের নির্জন শালবন। কোনো দ্রষ্টব্য দেখার তাড়া নেই, শুধু মাটির সোঁদা গন্ধ বুকে টেনে নেওয়ার আদর্শ স্পট।

লং ড্রাইভের মেজাজে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে একেবারে বর্ডার ঘেঁষা নিস্তব্ধতায় পৌঁছতে চান? তবে হাসনাবাদের টাকী আপনার জন্য বেস্ট। এখানে মূল ম্যাজিক ইছামতী নদী। নদীর একপারে দাঁড়িয়ে ওপার বাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবন দেখা যায় খালি চোখেই। একটা ইঞ্জিন নৌকো ভাড়া করে ভেসে পড়ুন মাঝনদীতে। ঠান্ডা বাতাসে মন জুড়িয়ে যাবে। নদীর ঘাট ছাড়াও ঘুরে নিন জোড়াশিব মন্দির আর শতবর্ষ প্রাচীন জমিদার বাড়ির ভগ্নাবশেষ। আর হ্যাঁ, ফেরার আগে টাকীর খাঁটি ছানার মালপোয়া আর গরম কচুরি কিন্তু খেতেই হবে!

পুজোয় বনের নির্জনতা আর ইতিহাসের রোমাঞ্চ একসাথে পেতে চান? দুর্গাপুরের কাছে কাঁকসা-আউশগ্রামের সীমানায় থাকা ‘গড় জঙ্গল’ আপনাকে চমকে দেবে।
ঘন শাল-পিয়ালের জঙ্গল ভেদ করে চলে গেছে লাল মোরামের রাস্তা। গাড়ি চালানোর আসল মজা পাবেন এখানেই। কথিত আছে, এই বনেই রাজা সুরথ প্রথম দুর্গোৎসবের সূচনা করেছিলেন মেধস মুনির আশ্রমে। প্রাচীন শ্যামরূপা মন্দির আর শিবমন্দির তো রয়েছেই, তবে আসল পাওনা এখানকার নিস্তব্ধতা—গাছের পাতার খসখস আর পাখির ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।

কলকাতা থেকে হাত বাড়ালেই নদী, অথচ ভিড়ের লেশমাত্র নেই—এমন ডেস্টিনেশন চান? ডায়মন্ড হারবারের ভিড় কাটিয়ে সোজা চলে যান ফলতা বা নূরপুর।
এখানে হুগলি নদী এসে মিশেছে রূপনারায়ণের সঙ্গে, ফলে নদীর বিস্তার এখানে সমুদ্রের মতো বিশাল। নদীর ধারের রিসর্টে বসে শুধু তাকিয়ে থাকুন—সামনে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে দৈত্যাকার পণ্যবাহী জাহাজ আর ছোট ছোট ট্রলার। ভাটার সময় চরে নেমে গাঙচিলদের ওড়াউড়ি দেখা কিংবা লোকাল বাজার থেকে টাটকা ইলিশ-চিংড়ি কিনে এনে রিসর্টে রাঁধিয়ে খাওয়া। আড়মোড়া ভেঙে শুধু অলসভাবে দুটো দিন কাটানোর এর চেয়ে ভালো ঠিকানা আর নেই।
| গন্তব্য | গাড়িতে সময় | সেরা আকর্ষণ | থাকার সেরা অপশন |
| ঘাটশিলা | ৫ ঘণ্টা | সুবর্ণরেখা, বুরুডি লেক, বিভূতিভূষণের বাড়ি | সুবর্ণরেখার ধারের প্রাইভেট রিসর্ট |
| তিলপাড়া | ৪.৫ ঘণ্টা | ময়ূরাক্ষী ব্যারেজ, শরতের কাশবন, নির্জন গ্রাম | সিউড়ির হোটেল বা হোমস্টে |
| টাকী | ২.৫ ঘণ্টা | ইছামতী নদী, সীমান্ত দর্শন, মালপোয়া | সরকারি ট্যুরিজম লজ বা রিভারসাইড হোটেল |
| গড় জঙ্গল | ৩.৫ ঘণ্টা | ঘন শালবন, অফ-রুট ড্রাইভ, প্রাচীন মন্দির | পানাগড় বা দুর্গাপুরের রিসর্ট |
| ফলতা | ২ ঘণ্টা | নদীর সঙ্গম, বিশাল জাহাজ, টাটকা মাছ | নদীর পাড়ের লাক্সারি রিসর্ট |
শহরের কৃত্রিম আলো আর ভিড়ভাট্টা তো প্রতি বছরই থাকে। এবার পুজোর ক'টা দিন না হয় নিজের মতো করে নদীর হাওয়া আর বনের শান্তিতেই নিঃশ্বাস নেওয়া যাক। হ্যাপি ভ্যাকেশন!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।
