

সুপারহিরোদের একঘেয়েমি ভেঙে বিশ্বমঞ্চে কেন জায়গা করে নিচ্ছে ভারতীয় মহাকাব্য? নীতেশ তিওয়ারির ‘Ramayana’, অস্কারজয়ী ভিএফএক্স এবং বৈশ্বিক বক্স অফিসের নতুন সমীকরণ।
পশ্চিমি বিনোদন দুনিয়ায় দীর্ঘ দিন ধরে একটাই ধারা দেখা গেছে। গ্রিক বা নর্ডিক দেবদেবীদের গল্প নিয়ে হলিউড বারবার কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা করেছে। থর, জিউস কিংবা হারকিউলিসের গল্প সারা বিশ্বের কাছে ঘরের বিষয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই চিত্রে এখন এক বিপুল বদল ঘটছে। ভারতীয় চলচ্চিত্রের নতুন উত্থানে মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে নিজস্ব মহাকাব্য। আজকের বিনোদন দুনিয়ায় সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনা হল indian cinema globalisation myth। কেন আন্তর্জাতিক বাজার এখন ভারতীয় পুরাণের দিকে এতটা আগ্রহী? নীতেশ তিওয়ারির বহু প্রতীক্ষিত মেগা-প্রজেক্ট ‘Ramayana’ এই বৈশ্বিক উন্মাদনাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
হলিউডের মার্ভেল ও ডিসি সিনেমাটিক ইউনিভার্স গত এক দশকে বিশ্বের বক্স অফিস শাসন করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দর্শক এই চেনা সুপারহিরো ফর্মুলা দেখে কিছুটা ক্লান্ত। স্প্যান্ডেক্স সুট পরা কমিক হিরোদের লড়াইয়ের মধ্যে নতুনত্ব প্রায় শেষ। ঠিক এই শূন্যস্থানেই বিশ্বমঞ্চে প্রবেশ করেছে ভারতীয় মিথোলজি।
ভারতীয় পুরাণ নিছক ভালো আর মন্দের সাদাকালো সংঘাত নয়। এখানে প্রতিটি চরিত্র ধূসর এবং দার্শনিক দ্বন্দ্বে ভরা। মহাভারতের কর্ণ কিংবা রামায়ণের বিভীষণ—প্রতিটি চরিত্রের ভেতর গভীর মানসিক লড়াই রয়েছে। এই বহুমাত্রিক গল্পগাথা আধুনিক বৈশ্বিক দর্শকের কাছে সম্পূর্ণ টাটকা বাতাসের মতো কাজ করছে। ফলে আন্তর্জাতিক স্টুডিওগুলো এখন চেনা স্পাইডার-ম্যান বা ব্যাটম্যানের বাইরে এসে ভারতীয় পুরাণের আকর খুঁজতে শুরু করেছে।

রণবীর কাপুর, সাই পল্লবী এবং যশ অভিনীত নীতেশ তিওয়ারির ‘Ramayana’ স্রেফ একটি প্যান-ইন্ডিয়া ছবি নয়। এটিকে পরিকল্পনা করা হয়েছে সম্পূর্ণ হলিউড ধাঁচে গ্লোবাল রিলিজের জন্য।
পৌরাণিক গল্পের এই আন্তর্জাতিক যাত্রা একদিনে শুরু হয়নি। রাজামৌলির ‘Baahubali’ ভারতীয় আঞ্চলিক ছবিকে সারা দেশের মূলধারায় নিয়ে এসেছিল। এরপর ‘RRR’ দেখিয়ে দেয় যে ভারতীয় নিজস্ব মেলোড্রামা আর অ্যাকশন পশ্চিমি দর্শক ও অস্কারের মঞ্চ পর্যন্ত কাঁপাতে পারে।
পরবর্তী ধাপে ‘Kantara’ দেখিয়েছে গ্রামীণ লোকগাথা ও দেবতার বিশ্বাস কীভাবে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশংসিত হতে পারে। আর নাগ অশ্বিনের ‘Kalki 2898 AD’ ভারতীয় পুরাণের সঙ্গে সায়েন্স-ফিকশন ডিস্টোপিয়াকে মিলিয়ে এক নতুন পথ দেখিয়েছে। মহাভারতের অশ্বত্থামার সাথে ভবিষ্যতের প্রযুক্তির লড়াই বিশ্বের দর্শককে হতবাক করে দিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার আগেই বুঝে গিয়েছে যে ভারতীয় নির্মাতারা এখন আর রূপকথার মতো গল্প বলেন না, তাঁরা আধুনিক সিনেমাটিক ভাষায় প্রাচীন দর্শন পরিবেশন করতে পারেন। আরও জানতে পড়ুন আমাদের ভারতীয় প্যান-ইন্ডিয়া সিনেমার উত্থান এবং সিনেমা হলে দর্শক ফেরানোর রাজনীতি বিষয়ক বিশ্লেষণ।

আন্তর্জাতিক প্রযোজনা সংস্থা এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো এখন ভারতীয় পৌরাণিক কন্টেন্টে কোটি কোটি টাকা ঢালতে পিছপা হচ্ছে না। এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণ:
তবে এই বৈশ্বিক দৌড়ের পথে কিছু কাঁটাও রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল—আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে চরিত্রগুলোকে প্রাসঙ্গিক করতে গেলে চিত্রনাট্যে কিছুটা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি আনতে হয়। কিন্তু ভারতে পৌরাণিক চরিত্রগুলোর সাথে কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট সরাসরি যুক্ত। ‘Adipurush’-এর ব্যর্থতা বুঝিয়ে দিয়েছিল যে প্রযুক্তি থাকলেও যদি মেজাজ ও সংলাপ হালকা হয়, তবে দেশের দর্শকই সবার আগে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
তাই নির্মাতাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—আসল ভক্তির মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে হলিউডি স্কেলের সিনেমা তৈরি করা যায়।
সিনেমার দুনিয়ায় এক সময় ভারতের পরিচয় ছিল নিছক গান-বাজনা আর দারিদ্র্য দেখানোর ট্রোপে। সেখান থেকে বেরিয়ে ভারত এখন নিজের মহাকাব্যিক ঐতিহ্যকে বৈশ্বিক সম্পদ হিসেবে তুলে ধরছে। যদি ‘Ramayana’ আন্তর্জাতিক স্তরে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়, তবে তা ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা করবে। রামায়ণ ও মহাভারতের অফুরন্ত সম্পদ নিয়ে ভারতীয় সিনেমা এখন বিশ্বজয়ের মঞ্চে পা রাখতে পুরোপুরি তৈরি।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।
