

ভিড়ের মধ্যে প্যানিক ছড়ালে কী হয়? ছবি - Google
ভিড়ের আচরণ কোনো এলোমেলো বিশৃঙ্খলা নয়, বরং এটি জটিল পদার্থবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের নিয়মে চলে। ভিড়ের মারাত্মক দুর্ঘটনায় মানুষ মূলত পদদলিত হয়ে মারা যায় না; সংকীর্ণ জায়গায় অতিরিক্ত চাপে বুক প্রসারিত করতে না পেরে শ্বাসরোধ হয়ে (কম্প্রেসিভ অ্যাসফিক্সিয়া) মারা যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, সংঘর্ষ এড়াতে মানুষ দূরত্বের চেয়ে সময়ের হিসাব করে গতিপথ বদলায়, কিন্তু ঘনত্ব অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ব্যক্তিগত ইচ্ছার কোনো ভূমিকা থাকে না—ভিড়ের ভৌত চাপই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে।
মানুষ যখন কোনো বৃহৎ জমায়েতের অংশ হয়, তখন তার নিজস্ব চিন্তাভাবনা, গতিবিধি এবং মানসিক অবস্থার চেয়ে ভিড়ের সমষ্টিগত গতিপ্রকৃতি বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। কোনো আকস্মিক আতঙ্ক বা সন্ত্রাসী হামলার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তা মারাত্মক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। ২০১০ সালে জার্মানির ডুইসবার্গে আয়োজিত 'লাভ প্যারেড' মিউজিক ফেস্টিভ্যালের ঘটনাটি এর অন্যতম উদাহরণ, যেখানে একটি সংকীর্ণ সুড়ঙ্গপথে অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে দম আটকে ২১ জন মারা যান। সাধারণ মানুষের কাছে যা কেবল বিশৃঙ্খলা বা পদপিষ্ঠ মনে হয়, বিজ্ঞানীদের চোখে তা আসলে জটিল এক গাণিতিক ও পদার্থবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।
ভিড়কে বোঝার জন্য আধুনিক বিজ্ঞান কেবল সমাজবিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ নেই; এতে যুক্ত হয়েছে পরিসংখ্যানগত পদার্থবিজ্ঞান, কম্পিউটেশনাল বিজ্ঞান এবং 'থিওরি অব কমপ্লেক্স সিস্টেম্স'। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, প্রতিটি ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব আলাদা হওয়ায় ভিড়ে যেমন স্বার্থপরতা দেখা যায়, তেমনই আবার একে অপরকে সাহায্য করার মানসিকতাও প্রকাশ পায়। কিন্তু যখন হাজার হাজার মানুষ একত্র হয়, তখন তাদের সম্মিলিত আচরণে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়, যাকে জটিল বিজ্ঞানে বলা হয় 'ইমার্জেন্স' (Emergence)। ঠিক যেমন শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে জলের অণুগুলো হঠাৎ এক হয়ে কঠিন বরফে পরিণত হয় কিংবা আকাশে ঝাঁক বেঁধে ওড়ার সময় বহু পাখির দল একটি সুশৃঙ্খল বিন্যাস গড়ে তোলে, ভিড়ের ভেতরের মানুষগুলোর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াও তেমনই এক অপ্রত্যাশিত সম্মিলিত আচরণ তৈরি করে।
২০১৪ সালে মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ভিড়ের মধ্যে মানুষের চলাচলের গতিবিধি নিয়ে একটি যুগান্তকারী গবেষণা করেন। পূর্বে পদার্থবিজ্ঞানের ধারণার ওপর ভিত্তি করে ভাবা হতো, মানুষ হয়তো ইলেকট্রনের মতো কাজ করে—একে অপরের খুব কাছাকাছি এলে দূরত্বের কারণে একে অন্যকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু বাস্তব ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মানুষ কেবল দূরত্বের ওপর নির্ভর করে গতি বদলায় না; বরং কত সময়ের মধ্যে ধাক্কা লাগতে পারে (Time until collision), তার ওপর নির্ভর করে পথ পরিবর্তন করে।
এই গাণিতিক সূত্র প্রয়োগ করে গবেষকরা বাস্তব ভিড়ের বেশ কিছু স্বাভাবিক আচরণ নিখুঁতভাবে সিমুলেট করতে সক্ষম হয়েছেন—যেমন কোনো সরু গেট দিয়ে প্রবেশের সময় ভিড় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্ধবৃত্তাকার আকার ধারণ করে, কিংবা বিপরীতমুখী চলাচলের সময় মানুষ নিজে থেকেই আলাদা লাইন বা লেন তৈরি করে নেয়। আধুনিক সময়ে নিরাপদ জরুরি প্রস্থান পথ এবং বড় পরিসরের পরিকাঠামো নকশায় এই অ্যালগরিদমগুলো অপরিহার্য হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণমাধ্যমে প্রায়ই এ ধরনের দুর্ঘটনাকে "পদদলিত হয়ে মৃত্যু" বা "স্ট্যাম্পিড" বলা হলেও তা সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। ফাঁকা জায়গায় আতঙ্কে ছোটাছুটি করলে সাধারণত বড় আকারের প্রাণহানি ঘটে না; আসল বিপদটি তৈরি হয় ‘ক্রাউড ক্রাশ’ (Crowd Crush) বা ভিড়ের সংকুচিত চাপে।
যখন একটি বিশাল জনস্রোত কোনো সংকীর্ণ জায়গায় একমুখী চাপে আটকে যায়, তখন সেখানে প্রায় ৪,৫০০ নিউটন পর্যন্ত চাপ তৈরি হতে পারে—যা ইস্পাতের ব্যারিকেড দুমড়েমুচড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই পরিমাণ চাপে মানুষের পা মাটিতে থাকলেও বুক এতটাই পিষে যায় যে ফুসফুস প্রসারিত হতে পারে না। ডাক্তারি পরিভাষায় একে বলা হয় কম্প্রেসিভ অ্যাসফিক্সিয়া (Compressive Asphyxia)। ফলে মানুষ পদদলিত হয়ে নয়, সোজা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়।
এমন চরম মুহূর্তে ভিড়ের কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় চলতে পারে না। শুরুতে মানুষ হয়তো কোনো বিপদ থেকে বাঁচতে বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সামনের দিকে এগোতে থাকে, কিন্তু ঘনত্ব একটি নির্দিষ্ট সীমার ওপরে চলে গেলে পুরো ভিড় তরলের মতো তরঙ্গের আচরণ শুরু করে। তখন কেউ পেছনে ফিরতে চাইলেও পেছনের হাজার হাজার মানুষের শারীরিক ধাক্কা তাকে একমুখী রাখতে বাধ্য করে। ফলে বিজ্ঞানীদের মতে, ভিড়ে মানুষের আচরণ কোনো ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং নিরেট পদার্থবিজ্ঞানের এক নির্মম নিয়মের অধীনে চলে যায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
