

Urinary Incontinence মোটেও বার্ধক্যের স্বাভাবিক বিষয় নয়। ছবি - Google
২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
হাঁচি দিলেন, কাশলেন কিংবা একটু জোরে হাসলেন- আর অজান্তেই কয়েক ফোঁটা প্রস্রাব বেরিয়ে গেল। আবার কারও ক্ষেত্রে টয়লেটে যাওয়ার আগেই এমন তীব্র প্রস্রাবের বেগ আসে যে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। বয়স বাড়লে এমনটা হবেই, এমন ধারণাও রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, অনিচ্ছাকৃত ভাবে প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়া বা Urinary Incontinence বার্ধক্যের স্বাভাবিক অংশ নয়। এর পিছনে বিভিন্ন শারীরিক কারণ থাকতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসার মাধ্যমে সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সহজ কথায়, নিজের ইচ্ছা বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়াকেই মূত্র অসংযম বলা হয়। কখনও অল্প কয়েক ফোঁটা, কখনও তার চেয়ে বেশি পরিমাণে প্রস্রাব বেরিয়ে যেতে পারে। কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সমস্যা হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে বার বার বা প্রায় প্রতিদিনই হতে পারে। কারণ বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে, ঠিক কোন ধরনের Incontinence হচ্ছে।
কাশি, হাঁচি, হাসি, দৌড়ানো, ব্যায়াম করা কিংবা ভারী জিনিস তোলার সময় পেটের ভিতরে চাপ বাড়ে। সেই চাপ মূত্রথলির উপর পড়ে প্রস্রাব বেরিয়ে যেতে পারে। একে Stress Incontinence বলা হয়। সাধারণত পেলভিক ফ্লোরের পেশি দুর্বল হওয়া বা প্রস্রাবের পথকে ধরে রাখার স্বাভাবিক সমর্থন কমে যাওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থা ও প্রসবের পর অনেক মহিলার এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে হঠাৎ প্রবল প্রস্রাবের বেগ আসে। টয়লেট পর্যন্ত পৌঁছনোর আগেই প্রস্রাব বেরিয়ে যেতে পারে। মূত্রথলির পেশি ও স্নায়ুর নিয়ন্ত্রণে সমস্যা বা Overactive Bladder-এর সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। বার বার প্রস্রাব পাওয়া এবং রাতে ঘন ঘন টয়লেটে ওঠাও এর সঙ্গে দেখা যেতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে মূত্রথলি সম্পূর্ণ খালি হতে পারে না। ফলে অল্প অল্প করে বার বার প্রস্রাব পড়তে থাকে। প্রস্রাবের পথে বাধা, যেমন পুরুষদের ক্ষেত্রে Enlarged Prostate, অথবা মূত্রথলির পেশি ঠিক ভাবে সংকুচিত হতে না পারা এর কারণ হতে পারে। প্রস্রাব করার পরও মূত্রথলি পুরো খালি হয়নি বলে মনে হওয়া এই ধরনের সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
এ ক্ষেত্রে মূত্র নিয়ন্ত্রণের মূল ব্যবস্থাটি সব সময় সরাসরি সমস্যাগ্রস্ত নাও হতে পারে। কিন্তু চলাফেরায় অসুবিধা, স্মৃতিভ্রংশ বা অন্য শারীরিক সমস্যার কারণে সময়মতো টয়লেটে পৌঁছনো সম্ভব হয় না। ফলে প্রস্রাব বেরিয়ে যেতে পারে।
কখনও Stress এবং Urge, দুই ধরনের লক্ষণই একই ব্যক্তির মধ্যে দেখা যায়। যেমন, কাশলে প্রস্রাব পড়ছে, আবার একই সঙ্গে হঠাৎ তীব্র বেগ এলেও সামলানো যাচ্ছে না। একে Mixed Incontinence বলা হয়।
কারণ একাধিক। বয়স বাড়ার সঙ্গে মূত্রনালির পেশি দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে, তবে শুধু বয়সকেই দায়ী করা ঠিক নয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা, প্রসব এবং মেনোপজের পরের পরিবর্তন ভূমিকা রাখতে পারে। অতিরিক্ত ওজন, কোষ্ঠকাঠিন্য, বার বার UTI, Diabetes, Overactive Bladder এবং পেলভিক অঞ্চলের অস্ত্রোপচারও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে Enlarged Prostate একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। আবার Stroke, Parkinson's Disease, Multiple Sclerosis, মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডের আঘাতের মতো স্নায়বিক সমস্যার কারণেও মূত্র নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিনের কাশি, ধূমপান এবং অতিরিক্ত caffeine বা alcohol গ্রহণও কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়াতে পারে।
সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হল অনিচ্ছাকৃত ভাবে প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়া। এর সঙ্গে কাশি বা হাঁচির সময় প্রস্রাব পড়া, হঠাৎ তীব্র প্রস্রাবের বেগ, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, রাতে বার বার টয়লেটে ওঠা, টয়লেটে পৌঁছনোর আগেই প্রস্রাব হয়ে যাওয়া কিংবা প্রস্রাব করার পরও মূত্রথলি পুরো খালি হয়নি বলে মনে হওয়া দেখা যেতে পারে।
তবে প্রস্রাবে জ্বালা বা ব্যথা, জ্বর, প্রস্রাবে রক্ত, কোমর বা তলপেটে ব্যথা থাকলে বিষয়টি শুধু Incontinence ধরে নেওয়া ঠিক নয়। UTI বা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যার কারণেও এই ধরনের উপসর্গ হতে পারে। প্রস্রাব একেবারেই বেরোচ্ছে না বা মূত্রথলি খালি করা যাচ্ছে না, এমন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
কখন প্রস্রাব বেরিয়ে যায়, কত বার হয়, কাশি-হাঁচির সময় হয় কি না, হঠাৎ বেগ আসে কি না, রাতে কত বার উঠতে হয়, কী কী ওষুধ চলছে এবং কতটা caffeine বা alcohol গ্রহণ করা হয়, ইত্যাদি। প্রয়োজনে শারীরিক পরীক্ষা করা হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে Urine Routine Examination বা Urine Culture করা হয়, বিশেষ করে সংক্রমণের সন্দেহ থাকলে। Blood Sugar, প্রয়োজন অনুযায়ী Kidney Function Test, মহিলাদের ক্ষেত্রে Pelvic Examination এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে Prostate Examination করা হতে পারে।
কোনও কোনও রোগীর জন্য Bladder Diary খুব কার্যকর। কয়েক দিন ধরে কখন কতটা তরল পান করছেন, কখন প্রস্রাব করছেন এবং কখন Leakage হচ্ছে—তা লিখে রাখলে সমস্যার ধরন বুঝতে চিকিৎসকের সুবিধা হয়।
প্রয়োজনে Ultrasound করে প্রস্রাব করার পর মূত্রথলিতে কতটা urine থেকে যাচ্ছে, অর্থাৎ Post-void Residual দেখা হতে পারে। বিশেষ পরিস্থিতিতে Urodynamic Study বা Cystoscopy-এর মতো পরীক্ষাও করা হয়।
চিকিৎসা নির্ভর করে Incontinence-এর ধরন এবং মূল কারণের উপর। প্রথম ধাপে অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই Lifestyle পরিবর্তন, Pelvic Floor Muscle Training এবং Bladder Training-এর মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
অতিরিক্ত caffeine, যেমন চা-কফি, এবং alcohol কমানো কিছু রোগীর ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। অতিরিক্ত ওজন থাকলে ওজন কমানো, কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসা এবং ধূমপান বন্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সমস্যা কমানোর জন্য নিজের ইচ্ছায় জল একেবারে কমিয়ে দেওয়া ঠিক নয়, শরীরে পর্যাপ্ত জল প্রয়োজন।
Pelvic Floor Muscle Training বা Kegel Exercise বিশেষ করে পেলভিক ফ্লোরের পেশি শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। এই পেশিগুলি মূত্রথলি ও আশপাশের অঙ্গকে সমর্থন করে এবং প্রস্রাব ধরে রাখতে ভূমিকা নেয়। নিয়মিত সঠিক ভাবে করলে প্রস্রাব চুইয়ে পড়ার সমস্যা কমতে পারে। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এই ব্যায়াম উপকারী হতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, প্রস্রাব করার সময় বার বার মাঝপথে urine flow বন্ধ করে Kegel Exercise করা উচিত নয়। এতে মূত্রথলি সম্পূর্ণ খালি না হওয়ার সমস্যা তৈরি হতে পারে। সঠিক পেশি কী ভাবে সংকুচিত করতে হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে Pelvic Floor Physiotherapist বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভাল।
বিশেষ করে Urge Incontinence-এর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় অন্তর টয়লেট ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি করা এবং ধীরে ধীরে দুইবার প্রস্রাবের মধ্যবর্তী সময় বাড়ানোর মাধ্যমে Bladder Training করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়।
Lifestyle পরিবর্তন, ব্যায়াম বা Bladder Training যথেষ্ট না হলে চিকিৎসক রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী ওষুধ দিতে পারেন। Urge Incontinence-এর ক্ষেত্রে Antimuscarinic এবং Beta-3 Agonist ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে Botox injection, বিশেষ medical device বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। Overflow Incontinence-এর পিছনে যদি কোনও বাধা থাকে, সেই কারণের চিকিৎসা করতে হয়।
তাই বার বার প্রস্রাব চুইয়ে পড়ছে বলে লজ্জায় বিষয়টি চেপে রাখা ঠিক নয়। আবার নিজে থেকে ওষুধ শুরু করাও উচিত নয়। কোন ধরনের Incontinence, কেন হচ্ছে এবং অন্য কোনও রোগ এর পিছনে রয়েছে কি না- এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেই চিকিৎসা শুরু করা দরকার। কারণ সঠিক কারণ জানা গেলে বহু ক্ষেত্রেই এই অস্বস্তিকর সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতায় জন্ম। উত্তর কলকাতার হোলি চাইল্ড ইনস্টিটিউট, বিডন স্ট্রীট স্কুলে প্রাথমিক পাঠ। এরপর ডাক্তারির পড়াশোনায় প্রবেশ। যাদবপুরে কে. পি. সি মেডিক্যাল কলেজ থেকে MBBS, তারপর পি. জি হাসপাতাল থেকে MD শেষ হতে হতে পেরিয়েছে অনেক গুলো বছর। লেখার ইচ্ছে ছোটবেলা থেকে। ভ্রমণ ভালোবাসেন। পেশা আর লেখা দুটোই উজ্জীবিত রাখে তাঁকে।
