kunal-mitra-birthday-30april
৩০শে এপ্রিল, ২০২৬
আজ জন্মদিন
৯০-এর দশক। মধ্যবিত্তের ঘরে সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে। পাড়ার ভেতর থেকে ভেসে আসছে - প্রেশার কুকারের শিস, রান্নাঘরে মশলার ফোড়ন, আর দূরে কোথাও টেলিভিশনের আওয়াজ। বসার ঘরে খবরের কাগজের কভারে ঢাকা কাঠের টেবিল আর তার ওপর রাখা সাদা-কালো টিভি। স্ক্রিন নয়েজ, ফ্লিকার - অতঃপর অ্যান্টেনা ঠিক করতে ছাদে দৌড়। নীচে বসে থাকা একটা পরিবার, একসঙ্গে গল্প দেখার অপেক্ষায়। আর সেই সমস্ত গল্পের ভিতরে অদৃশ্যভাবে ঢুকে পড়তেন - কুণাল মিত্র। দূরদর্শন, কেবল চ্যানেল, টেলিফিল্ম পেরিয়ে ছায়াছবির মধ্যে দিয়ে যিনি হয়ে উঠেছিলেন - একান্ত আপনজন!
পর্দায় এক আপন মানুষ
৩০শে এপ্রিল, ১৯৬৫ সাল, কলকাতায় জন্ম বাসব মিত্র-এর। পরবর্তীকালে যিনি DD Bangla-য় সম্প্রচারিত 'এবার জমবে মজা' ধারাবাহিকের মধ্যে দিয়ে ‘কুণাল মিত্র’ নামে ঢুকে পড়লেন গৃহস্থের অন্দরমহলে। কুণাল’কে আলাদা করে ‘নায়ক’ বলা কঠিন। না, তিনি আলোয় মোড়া কোনো তারকা নন। বরং সেই মানুষ, যাকে দেখে মনে হতো - “এ তো আমাদেরই নিজের কেউ”! কখনো বাড়ির বড় ছেলে, অথবা এক দায়িত্ববান স্বামী, কখনও বা দ্বিধাগ্রস্ত একাকী মানুষ - বাংলা টেলিভিশনের একাধিক ধারাবাহিকে এমনই ছিলো তাঁর উপস্থিতি। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো যেন মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি, যেখানে জীবন জুড়ে খেলা করে –’ছোট দুঃখ, ছোট সুখ, ছোট ছোট হাসিমুখ’!
গল্পের ভেতর বেঁচে থাকা
সেই সময়ে ধারাবাহিকগুলো সেই অর্থে ‘ডেইলি সোপ’ হয়ে ওঠেনি। সাংসারিক কুটকচালি, মুহূর্তে মুহূর্তে আলোর ঝলকানি কিংবা সাউন্ড এফেক্টের তীব্র ব্যবহার ছাড়াই গল্প এগোত ধীর গতিতে। সময় নিয়ে গড়ে উঠতো চরিত্রগুলো। কুণাল ছিলেন ঠিক সেই ছন্দেরই অভিনেতা। মঞ্চের দক্ষ অভিনেতা কুণাল চোখ ও শরীরী ভাষায় সংলাপ মধ্যবর্তী নীরবতায় কথা বলতে জানতেন।
রবিবারের অলস বিকেলে অথবা শুক্রবার রাতে টেলিফিল্ম দেখার যে আবেগ ছিলো - কুণাল সেই স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অল্প সময়ের সেই কাহিনী গুলোয় তাঁর অভিনীত চরিত্রের মধ্যে দিয়ে একটা আস্ত জীবন ছুঁয়ে যাওয়ার পরিসর ছিলো। যেন এক অদ্ভুত নরম বিষণ্ণতা - শেষ হওয়ার পরেও হৃদয়ের নরম কুঠুরিতে যা চিরতরে থেকে যায়। প্রায় ৩০০-এর বেশি ধারাবাহিক ও টেলিভিশন শো- এ তাঁর অভিনয় এই অনুভুতির-ই সাক্ষ্য বহন করে।
বড় পর্দার ক্ষণিক স্পর্শ
‘যুগান্ত’, ‘বিবর’, ‘সম্প্রদান’, ‘আলো’, ‘লাল রঙের দুনিয়া’, ‘ছ-এ ছুটি’ -এর মতো একাধিক বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয়ের ‘আন্ডারস্টেটেড’ স্টাইল ও সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি তাঁকে করে তুলেছিল আর সকলের থেকে আলাদা। চরিত্র ছোট হোক কিংবা বড় - প্রতিটি উপস্থিতিতেই ছিল তাঁর ব্যক্তিগত স্বাক্ষর। বাঙালির চির পরিচিত আবেগি হৃদয়ে তিনি ঝরে পড়তেন - ‘শ্রাবণের ধারার মতো’!
থমকে যাওয়া সময় ও ব্যক্তিগত শোক
কমেডি থেকে ট্র্যাজেডি - সমস্ত ক্ষেত্রেই কুণালের ছিলো অবাধ যাতায়াত। কিন্তু কুণালের জীবন যেন এক অসমাপ্ত চিত্রনাট্য। ২১শে জানুয়ারি, ২০০৯ সাল, ইন্দ্রপুরী স্টুডিও-য় ‘উৎসবের রাত্রি’ ধারাবাহিকে অভিনয় চলাকালীন পরিচালক ‘কাট’ বলার আগেই তাঁর এই জীবনের অভিনয় থমকে যায়। বাংলা বিনোদন জগৎ থেকে হারিয়ে গেলো এক সম্ভাবনাময় শিল্পী আর বাঙালি দর্শক হারালো তাদের পরিবারের একজন প্রিয় সদস্যকে। যেখানে আরও অনেক গল্প, আরও অনেক চরিত্র বাকী রয়ে গেলো।
যেসব গল্প শেষ হয় না
আমাদের কাছে কুণাল শুধুমাত্র একজন অভিনেতা নন, যেন নিজের ভুলে যাওয়া একটা সময়ের ভালোবাসার সঙ্গী - এক প্রিয়জন। জীবনের এই অসমাপ্ত গল্পে কুণাল আছেন - ঠিক সেই আগের মতোই। হয়তো একটু চুপচাপ, একটু গভীর আর একটু নিজের মতো, নিঃশব্দে…
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
জন্ম মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে। সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা। সময় কাটে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায়। বর্তমানে লেখালিখি, ডিজিটাল কন্টেন্ট এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে কর্মব্যস্ত।