কলকাতা: ভোটে পরাজয়ের ধাক্কার পরেই বলেছিলেন, তিনি এখন “মুক্ত বিহঙ্গ”। আর সেই মন্তব্যের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূমিকায় দেখা গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বৃহস্পতিবার সকালে কালো কোট, সাদা ব্যান্ড পরে আইনজীবীর সাজে কলকাতা হাইকোর্টে হাজির হলেন তিনি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এই উপস্থিতি ঘিরে মুহূর্তের মধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে আদালত চত্বর থেকে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে।
সূত্রের খবর, রাজ্যের ভোট-পরবর্তী হিংসা সংক্রান্ত মামলার শুনানিকে ঘিরেই হাইকোর্টে যান মমতা। প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের ডিভিশন বেঞ্চে ওই মামলার শুনানি হওয়ার কথা ছিল। তৃণমূলের তরফে দায়ের হওয়া মামলায় বিজেপির বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও অশান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে।
হাইকোর্টে ঢোকার সময় মমতার সঙ্গে ছিলেন তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর ছেলে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের আইনজীবী বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়। আদালত চত্বরে মমতার এই নতুন অবতার দেখে অনেকেই থমকে দাঁড়ান। রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন আইনজীবীর ভূমিকায় তাঁকে দেখা যাওয়ায় নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে।
প্রসঙ্গত, নির্বাচনে ভরাডুবির পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে এবার তিনি সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি বিরোধী আন্দোলনে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবেন। সেই সময়ই তিনি নিজেকে “মুক্ত বিহঙ্গ” বলে উল্লেখ করেছিলেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সেই মন্তব্য শুধুমাত্র আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং নতুন রাজনৈতিক কৌশলেরও ইঙ্গিত ছিল। আর হাইকোর্টে তাঁর এই উপস্থিতি সেই ধারণাকেই আরও জোরালো করছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, মমতা বুঝিয়ে দিতে চাইছেন যে বিরোধী রাজনীতির লড়াই এখন শুধু রাস্তায় সভা-মিছিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সাংবিধানিক ও আইনি লড়াইকেও সমান গুরুত্ব দিতে চলেছে তৃণমূল। বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণের পাশাপাশি আদালতের ভিতরেও চাপ বাড়ানোর কৌশল নিতে পারেন তিনি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আইন পেশার সঙ্গে মমতার সম্পর্ক নতুন নয়। ১৯৮২ সালে যোগেশচন্দ্র চৌধুরী ল’ কলেজ থেকে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে একাধিকবার আদালতে আইনজীবীর ভূমিকায়ও দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এমনকি কংগ্রেসের যুব সংগঠনের আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হওয়া কর্মীদের জামিনের জন্য আদালতে সওয়াল করেছিলেন বলেও পুরনো রাজনৈতিক সহকর্মীরা দাবি করেছেন।
তবে এ দিনের ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বেড়েছে অন্য একটি কারণে। ভোটে হারের পর অনেকেই মনে করেছিলেন মমতা হয়তো কিছুটা আড়ালে চলে যাবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ঠিক উল্টো ছবি। কখনও বিজেপি বিরোধী সর্বভারতীয় ঐক্যের ডাক, কখনও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সরব হওয়া, আবার কখনও সরাসরি আদালতে উপস্থিতি— সব মিলিয়ে তিনি যে দ্রুত বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, তা স্পষ্ট বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
মাঠে-ময়দানের আন্দোলনের পাশাপাশি এজলাসের ভেতরেও যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছেন, বৃহস্পতিবারের কলকাতা হাইকোর্টের ঘটনায় সেই ইঙ্গিতই মিলছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।



