kolkata air pollution exclusive
১৭ই এপ্রিল, ২০২৬
কলকাতা: তাপমাত্রা নেমে গেলেই শহরের আকাশ ধোঁয়ার আস্তরণে ঢেকে যায়। ভোরে ছাদে দাঁড়ালে দূরের বহুতল মিলিয়ে যায় কুয়াশা-দূষণের মিশেলে। গলায় জ্বালা, চোখে অস্বস্তি, এসব দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়, নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। ভোট এলেই বদলে যায় কথার সুর, বাড়ে প্রতিশ্রুতির ঝড়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই দূষণের বিরুদ্ধে আদৌ কি কোনও দীর্ঘমেয়াদি, কার্যকর পরিকল্পনা আছে?
দূষণের জটিল চক্রে শহর
পরিবেশবিদদের মতে, কলকাতার বায়ুদূষণের উৎস বহুস্তরীয়। শহরের রাস্তায় প্রতিদিন লক্ষাধিক যানবাহনের চলাচল, তার মধ্যে বিপুল সংখ্যক পুরনো ডিজেলচালিত বাস ও ট্রাক দূষণের অন্যতম কারণ। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নির্মাণস্থলের ধুলো, ইটভাটার ধোঁয়া এবং আশপাশের শিল্পাঞ্চলের নির্গমন। ফলে বায়ুর গুণমান সূচক (AQI) প্রায়শই ‘খারাপ’ থেকে ‘অতিমাত্রায় খারাপ’ স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে।
শুধু বায়ু নয়, বহুমাত্রিক চাপ
বায়ুদূষণের পাশাপাশি জল ও শব্দ দূষণও বাড়ছে। গঙ্গায় শিল্পবর্জ্য ও নিকাশি জলের প্রভাব বাড়ছে। অন্যদিকে, শহরের ব্যস্ত মোড়ে শব্দের মাত্রা অনেক সময় নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে পরিবেশের উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
সরকারি পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন
প্রশাসনের দাবি—পুরনো যান তুলে দেওয়া, বৈদ্যুতিক বাস চালু, সবুজায়ন বৃদ্ধি, ‘গ্রিন করিডর’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিতে দূষণ পর্যবেক্ষণের কথাও বলা হচ্ছে। তবে বাস্তবে এখনও কালো ধোঁয়া ছড়ানো যানবাহন ও নিয়ন্ত্রণহীন নির্মাণস্থল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিরোধীদের পাল্টা সুর
বিরোধীদের অভিযোগ, ঘোষণার তুলনায় বাস্তবায়ন কম। তাঁদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সমস্যার সমাধান অসম্ভব। পরিবহণ, শিল্প দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। বিশেষজ্ঞরা অঞ্চলভিত্তিক ‘ক্লিন এয়ার’ নীতির কথাও বলছেন।
ভোটে ‘সবুজ’ প্রতিশ্রুতির ঢেউ
নির্বাচন যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে প্রতিশ্রুতি। ১০০% বৈদ্যুতিক বাস, নতুন সবুজ অঞ্চল, উন্নত দূষণ পরিমাপ প্রযুক্তি—বিভিন্ন দাবি সামনে আসছে। কিন্তু ভোটের পর সেগুলি বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়েই সংশয়।
নাগরিক উদ্যোগ ও গবেষণার ভূমিকা
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। SwitchON Foundation দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে। অন্যদিকে Centre for Science and Environment নিয়মিত গবেষণা ও রিপোর্টের মাধ্যমে দূষণের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছে। এই সংস্থাগুলির তথ্য ও বিশ্লেষণ অনেক সময় প্রশাসনের উপর চাপ তৈরি করে এবং নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
চিকিৎসকদের মতে, দূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু ও বয়স্কদের উপর। হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে এটি শুধু পরিবেশগত নয়, জনস্বাস্থ্যের বড় সঙ্কট।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন
কলকাতার সামনে তাই বড় প্রশ্ন—এই শহর কি আবার স্বচ্ছ বাতাস ফিরে পাবে? না কি ধোঁয়ার আড়ালেই ঢেকে যাবে তার ভবিষ্যৎ? রাজনীতি, প্রশাসন এবং নাগরিক সচেতনতা—এই তিনের সমন্বয়েই হয়তো মিলতে পারে উত্তর। ততদিন পর্যন্ত, শহরবাসীর শ্বাস নেওয়ার লড়াই চলতেই থাকবে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।