বাংলার মাছ। ছবি- দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস
২৬শে মে, ২০২৬
বাঙালির পরিচয়ের সঙ্গে যদি কোনও খাদ্যের নাম সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে মাছ। রবীন্দ্রনাথের লেখনী থেকে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা— সর্বত্র মাছ কেবল খাদ্য নয়, এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। কিন্তু সেই মাছের বাজারই এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। গড়িয়াহাট, মানিকতলা, কলেজ স্ট্রিট বা শিলিগুড়ির হাকিমপাড়ার ভোরের বাজারে এখনও দর কষাকষির আওয়াজ শোনা যায় বটে, কিন্তু সেই বাজারের ভিতরে ঢুকে পড়েছে কর্পোরেট সরবরাহ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক কূটনীতির জটিল বাস্তবতা।
আজ পশ্চিমবঙ্গের মাছের বাজার আর শুধুই স্থানীয় অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি এখন কৃষি-অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভোট রাজনীতিরও অংশ।

বাংলার মাছের বাজারে ইলিশের গুরুত্ব আলাদা। বর্ষা নামার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার বাজারে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তা অনেকাংশে পুজোর কেনাকাটার আবেগের সঙ্গে তুলনীয়। মাছ ব্যবসায়ীদের মতে, “ইলিশের বাজার ভালো থাকলে গোটা মাছের বাজার চাঙ্গা থাকে।”
কিন্তু গত এক দশকে ইলিশের অর্থনীতি বদলে গিয়েছে নাটকীয়ভাবে। আগে কলকাতার বাজার মূলত নির্ভর করত বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের উপর। এখন সেই জায়গায় ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছে গুজরাত উপকূল, মায়ানমার ও আরব সাগরঘেঁষা অঞ্চলের ইলিশ। অনেক ক্ষেত্রেই 'বাংলাদেশি ইলিশ' নামে বিক্রি হলেও বাস্তবে মাছের উৎস অন্যত্র, এমন অভিযোগও বাজারে রয়েছে।
এর পিছনে রয়েছে দুই প্রধান কারণ— সীমিত সরবরাহ এবং কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা। দুর্গাপুজোর আগে বাংলাদেশ সরকার ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিলেও বাস্তবে বহু বছর ঘোষিত কোটার তুলনায় কম মাছ পশ্চিমবঙ্গে এসেছে। ফলে বাজারে দাম পৌঁছেছে কেজি প্রতি ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকায়।
ফলে ইলিশ এখন মধ্যবিত্তের প্রতিদিনের খাবার নয়, বরং উৎসব-নির্ভর “প্রিমিয়াম আবেগ”। অনেক পরিবারে এখন আর কেজি ধরে ইলিশ কেনা হয় না; বরং টুকরো বা ভাগে কিনে ‘রেওয়াজ’ বজায় রাখা হয়।

একসময় পশ্চিমবঙ্গের মাছের বাজারের প্রাণ ছিল নদী ও জলাভূমি। গঙ্গা, রূপনারায়ণ, তিস্তা, মহানন্দা কিংবা সুন্দরবনের খাঁড়ি অঞ্চল থেকে আসত দেশি মাছ। এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীদূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা, জলাভূমি ভরাট, নাব্যতা কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। বিশেষত দেশি ছোট মাছ— পাবদা, পারশে, ট্যাংরা, খলসে, মৌরলা— আগের তুলনায় অনেক কম দেখা যাচ্ছে বাজারে।
তার বদলে বাজার দখল করছে অ্যাকুয়াকালচার বা মাছচাষ। পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য উৎপাদক রাজ্য হলেও উৎপাদনের বড় অংশই এখন পুকুর-ভিত্তিক চাষের উপর নির্ভরশীল। রুই, কাতলা, মৃগেল থেকে পাঙ্গাস, তেলাপিয়া— অধিকাংশ মাছই এখন “ফার্ম ফিশ”।
এই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক দিক স্পষ্ট। চাষের মাছ দ্রুত উৎপাদন করা যায়, দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং শহুরে চাহিদা মেটানো সহজ হয়। কিন্তু স্বাদের প্রশ্নে আপত্তি তুলছেন বহু ক্রেতা। “আগের নদীর রুইয়ের গন্ধ আর নেই”— এই অভিযোগ এখন প্রায় প্রতিটি বাজারে শোনা যায়।
কারণ দ্রুত উৎপাদনের চাপে মাছচাষেও এখন উচ্চ-প্রোটিন ফিড, রাসায়নিক নির্ভর খাদ্য এবং নিবিড় বাণিজ্যিক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে মাছের স্বাদ, গঠন এবং পুষ্টিগুণ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গের মাছের ব্যবসা ছিল অসংগঠিত। আড়তদার, স্থানীয় পাইকার, মৎস্যজীবী ও খুচরো বিক্রেতাদের সম্পর্কের উপর দাঁড়িয়ে ছিল এই অর্থনীতি। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেখানে ঢুকে পড়েছে অ্যাপ-ভিত্তিক ডেলিভারি, ব্র্যান্ডেড মাছ এবং কোল্ড-চেইন সরবরাহ ব্যবস্থা।
কলকাতা ও শহরতলিতে এখন 'কাট-টু-অর্ডার', 'হাইজিনিক ফিশ', 'ভ্যাকুয়াম প্যাকড সি-ফুড'— এই বাজার দ্রুত বাড়ছে। শহুরে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা সময় বাঁচাতে অনলাইন মাছ কেনার দিকে ঝুঁকছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সচেতনতা বাড়ার ফলে এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এখন মাছের উৎস, ওজন, কাটিং স্টাইল— সবই নির্দিষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু এই কর্পোরেট প্রবেশে সবচেয়ে বড় চাপে পড়ছেন ছোট মাছ বিক্রেতারা। কারণ ঐতিহ্যগত বাজারের মূল শক্তি ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও বিশ্বাস। সেই জায়গা ধীরে ধীরে নিচ্ছে প্রযুক্তি ও লজিস্টিকস।
পশ্চিমবঙ্গের মাছের বাজারে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে রপ্তানিমুখী ব্যবসায়। বিশেষত ভেটকি ও বাগদা চিংড়ির বড় অংশ এখন আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উৎপাদিত হয়।
ফলে স্থানীয় বাজারে ভালো মানের সামুদ্রিক মাছের দামও বেড়েছে। অনেক সময় রপ্তানিযোগ্য মাছ স্থানীয় বাজারে কম পৌঁছনোয় সাধারণ ক্রেতাকে বেশি দাম দিতে হচ্ছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরের বহু অঞ্চলে এখন চিংড়ি চাষই প্রধান অর্থনৈতিক কার্যকলাপ। কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়ছে নোনা জলের বিস্তার ও কৃষিজমির ক্ষতির অভিযোগও। অর্থাৎ মাছের অর্থনীতি এখন পরিবেশ ও কৃষির সঙ্গেও সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে।
একসময় আলু-পেঁয়াজের দাম বাড়লে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হত। এখন মাছের ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে। ইলিশের দাম বাড়লেই প্রশাসনিক নজরদারি, বাজার অভিযান এবং মজুতদারি বিরোধী পদক্ষেপ শুরু হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানি এখন কার্যত 'কূটনৈতিক বার্তা'র অংশ। দুর্গাপুজোর আগে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলার ভোট রাজনীতিতেও মাছ এখন এক ধরনের “সফট কালচারাল ইস্যু”। কারণ মাছের সঙ্গে আবেগ জড়িত, আর আবেগের সঙ্গে রাজনীতির দূরত্ব খুব কম।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল— আগামী দশকে পশ্চিমবঙ্গের মাছের বাজারের চরিত্র কী হবে? একদিকে ঐতিহ্যবাহী বাজার, অন্যদিকে অ্যাপ-নির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থা। একদিকে নদীর মাছের স্মৃতি, অন্যদিকে চাষের মাছের বাস্তবতা।
তবু এখনও গড়িয়াহাট বা শ্যামবাজারের মাছের বাজারে দাঁড়ালে বোঝা যায়, বাঙালির কাছে মাছ কেনা শুধুই কেনাকাটা নয়। সেটা দর কষাকষি, মাছের চোখ দেখে তাজা বোঝা, বিক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, আর বাড়ি ফিরে “আজ দারুণ মাছ পেয়েছি”— এই সামাজিক অভিজ্ঞতার অংশ।
হয়তো সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের মাছের বাজার এখনও কেবল অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়। এটি আসলে বাঙালির সংস্কৃতি, স্মৃতি এবং পরিবর্তিত সমাজবাস্তবতার সবচেয়ে জীবন্ত আয়না।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
লেখকের বিস্তারিত তথ্য শীঘ্রই যোগ করা হবে।