অন্নপূর্ণা যোজনা। প্রতীকী ছবি - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস
২৮শে মে, ২০২৬
‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্ম হাতে নিয়েই অনেকের প্রথম প্রতিক্রিয়া— এটা কি সামাজিক প্রকল্পের আবেদনপত্র, না কি গোটা পরিবারের জীবনপঞ্জি? ১১ পাতার দীর্ঘ ফর্মে শুধু নাম-ঠিকানা নয়, আবেদনকারীর পরিবারের আর্থিক অবস্থা, সম্পত্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এমনকি শিশুর টিকাকরণের তথ্য পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। আর তা নিয়েই শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক।
বুধবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র সূচনা করেন। সরকার জানিয়েছে, আগামী ১ জুন থেকে শুরু হবে আবেদন প্রক্রিয়া। অনলাইন এবং অফলাইন— দু’ভাবেই ফর্ম জমা দেওয়া যাবে। তবে প্রকল্প ঘোষণার চেয়ে বেশি চর্চায় এখন সেই আবেদনপত্রই।
ফর্মের প্রথম কয়েক পাতাতেই আবেদনকারীর আধার নম্বর, ডিজিটাল রেশন কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য চাওয়া হয়েছে। শুধু আবেদনকারী নন, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের তথ্যও বাধ্যতামূলক। কে কতটা শিক্ষিত, কী পেশা, বার্ষিক আয় কত, কার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আধারের সঙ্গে সংযুক্ত— সবটাই বিস্তারিত জানাতে হবে।
এতেই শেষ নয়। আবেদনকারীর পরিবার কত জমির মালিক, পাকা বাড়ি আছে কি না, গাড়ি রয়েছে কি না, কেউ আয়কর দেন কি না, জিএসটি নম্বর আছে কি না— সেই তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এমনকি পরিবারের কেউ সরকারি চাকরি করেন কি না বা পেনশন পান কি না, তাও উল্লেখ করতে হবে।
সবচেয়ে বেশি বিস্ময় তৈরি করেছে শিশুদের সম্পর্কিত তথ্যের অংশ। কোন স্কুলে পড়ে, কোন শ্রেণিতে পড়ে, টিকাকরণ সম্পূর্ণ হয়েছে কি না— সেই তথ্যও দিতে হবে আবেদনকারীদের। পাশাপাশি জানতে চাওয়া হয়েছে, পরিবারের কেউ অন্য সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিচ্ছেন কি না বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA)-এর আওতায় আবেদন করেছেন কি না।
সরকারের বক্তব্য, প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করতেই এই বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রশাসনের একাংশের দাবি, অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পে ভুয়ো উপভোক্তার অভিযোগ উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার কঠোর যাচাইয়ের পথে হাঁটছে সরকার। একই সঙ্গে একটি ‘সমন্বিত পারিবারিক ডেটাবেস’ তৈরির ভাবনাও রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়। একটি খাদ্য বা আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের জন্য এত বিস্তৃত ব্যক্তিগত তথ্য আদৌ প্রয়োজন কি? সমাজমাধ্যমে ইতিমধ্যেই বহু মানুষ গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেকের মতে, এই ফর্ম কার্যত সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, আর্থিক অবস্থা এবং সামাজিক পরিচয়ের পূর্ণাঙ্গ নথি সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার সমান।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তথ্য সুরক্ষা আইন কার্যকর হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও সচেতনতার অভাব রয়েছে। ফলে কোন তথ্য কেন নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তা কী ভাবে ব্যবহার হবে, সেই স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই প্রকল্প শুধু জনমুখী কর্মসূচি নয়, ভবিষ্যতের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ডেটা ব্যবস্থাপনারও বড় পরীক্ষা। কারণ, বর্তমানে তথ্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই তথ্য সংগ্রহের দরজা খুলে দিল কি ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ১১ পাতার ফর্ম?
এখন দেখার, সাধারণ মানুষ এই দীর্ঘ আবেদন প্রক্রিয়াকে কতটা স্বাভাবিক ভাবে নেন। কারণ, প্রকল্পের আর্থিক সুবিধার অঙ্কের থেকেও বড় হয়ে উঠেছে আর এক প্রশ্ন— নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের সীমারেখা ঠিক কোথায়?
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
লেখকের বিস্তারিত তথ্য শীঘ্রই যোগ করা হবে।