

আরজি কর-এক অসমাপ্ত লড়াইয়ের উত্তরাধিকার। গ্রাফিক্স - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
৬ই জুলাই, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
কিছু ঘটনা শুধুমাত্র সংবাদ শিরোনামে সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। ২০২৪ সালের ৯ অগস্টের সেই সকাল থেকে শুরু হওয়া প্রশ্ন, ক্ষোভ, আন্দোলন এবং বিচারপ্রক্রিয়া আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। আদালতের রায় হয়েছে, তদন্ত হয়েছে, প্রশাসনিক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সত্যের শেষ সীমা কোথায়— সেই প্রশ্ন এখনও বাতাসে ভাসছে। ধারাবাহিকের শেষ পর্বে ফিরে দেখা যাক এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাকে নাড়িয়ে দেওয়া সেই ঘটনার উত্তরাধিকার।
প্রথম দিন ঘটনাটি ছিল একটি হাসপাতালের ভিতরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অপরাধের খবর। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা হয়ে ওঠে গোটা বাংলার বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক প্রতীক। এক তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যু শুধুমাত্র তাঁর পরিবারের ব্যক্তিগত শোক হয়ে থাকেনি। সেই মৃত্যু হাজার হাজার মানুষের কাছে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল। আর সেখানেই আরজি কর অন্য সব মামলার থেকে আলাদা হয়ে যায়।
শিয়ালদহ আদালত সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। আইনের চোখে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু নিহত চিকিৎসকের পরিবার বারবার জানিয়ে দিয়েছে, তাঁদের প্রশ্নের সব উত্তর এখনও মেলেনি। তাঁদের বক্তব্য— একজনের শাস্তি হয়েছে, কিন্তু গোটা ঘটনার প্রতিটি স্তর কি সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়েছে? এই প্রশ্নই মামলাটিকে জীবন্ত রেখেছে।
কলকাতা হাইকোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ দেখিয়েছে, বিচারব্যবস্থাও এখনও এই মামলাকে সম্পূর্ণ বন্ধ অধ্যায় হিসেবে দেখছে না। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ টাইমলাইন তৈরির নির্দেশ, তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন এবং ঘটনার প্রতিটি ধাপ নতুন করে খতিয়ে দেখার নির্দেশ— সবই প্রমাণ করে, অনুসন্ধানের দরজা এখনও খোলা রয়েছে। বিচারপতিরা স্পষ্ট করেছেন, শুধু অপরাধ নয়, তার আগে এবং পরে যা যা ঘটেছে, সেগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আরজি কর-কাণ্ড আবার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। নতুন সরকারের তরফে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, তদন্তের কিছু দিক পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। ঘটনার সময়কার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ফোন কলের রেকর্ড, বিভিন্ন আধিকারিকের ভূমিকা— সব কিছু খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়। ফলে আরজি কর আবার রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে জায়গা করে নেয়।
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় সামাজিক অভিঘাত সম্ভবত ‘রাত দখল’ আন্দোলন। বাংলার সাম্প্রতিক ইতিহাসে খুব কম আন্দোলন এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষের অংশগ্রহণ দেখেছে। হাজার হাজার নারী রাতের শহরে নেমে প্রশ্ন তুলেছিলেন— নিরাপত্তা কি শুধুই দিনের আলোয় সীমাবদ্ধ? সেই আন্দোলন প্রমাণ করেছিল, কোনও রাজনৈতিক দলের ডাক ছাড়াও নাগরিক সমাজ সংগঠিত হতে পারে। আরজি করের উত্তরাধিকার হিসেবে এই আন্দোলনের কথা বহুদিন মনে রাখা হবে।
এই ঘটনার আগে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন সাধারণত স্বাস্থ্য পরিষেবার দাবি বা কর্মপরিবেশের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আরজি কর দেখিয়েছে, চিকিৎসক সমাজও বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নে নেতৃত্ব দিতে পারে। স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং জবাবদিহির দাবিতে যে আন্দোলন তৈরি হয়েছিল, তা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আরজি কর-কাণ্ড প্রশাসনের কাছেও একটি বড় শিক্ষা। কোনও ঘটনার তদন্তে প্রথম কয়েক ঘণ্টার গুরুত্ব কতটা, তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা কেন জরুরি, এবং মানুষের আস্থা হারালে পরিস্থিতি কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে— এই ঘটনাই তার উদাহরণ। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতিটি পদক্ষেপ যে জনবিশ্বাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেটিও এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
সমস্ত রাজনৈতিক বিতর্ক, আদালতের শুনানি এবং জনআন্দোলনের মাঝখানে একটি পরিবারকে কখনও ভুলে যাওয়া যায় না। এক বাবা ও এক মা, যাঁরা তাঁদের একমাত্র মেয়েকে হারিয়েছেন। তাঁদের কাছে আরজি কর কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নয়, কোনও আন্দোলনের স্লোগান নয়, কোনও আদালতের মামলা নয়। এটি তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষত। আর সেই ক্ষত থেকেই তাঁরা আজও একই দাবি করে চলেছেন, “পুরো সত্য জানতে চাই।” আর যে সত্য উদঘাটনে সন্তানহারা মা রাজনীতির আঙিনায় পা রাখতেও দ্বিধা করেননি। জনতার ভোটে জিতে তিনি এখন পানিহাটির বিধায়ক।
গত দু'বছরে আরজি কর-কাণ্ড অনেক কিছু দেখিয়েছে। একদিকে প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ, অন্যদিকে নাগরিক প্রতিবাদ। একদিকে আদালতের হস্তক্ষেপ, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংঘাত। একদিকে বিচারপ্রক্রিয়া, অন্যদিকে মানুষের আবেগ। সব মিলিয়ে আরজি কর যেন বাংলার একটি সময়ের আয়না হয়ে উঠেছে। যেখানে সমাজ নিজের মুখটাকেই নতুন করে দেখেছে।
ধারাবাহিকের শুরু হয়েছিল একটি প্রশ্ন দিয়ে। এক তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুর পর কীভাবে একটি ঘটনা গোটা বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নাড়িয়ে দিল? সেই প্রশ্নের অনেক উত্তর মিলেছে। কিন্তু সব উত্তর নয়।
হয়তো আদালতের নথিতে একটি মামলা শেষ হবে। হয়তো তদন্তের ফাইল একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। হয়তো রাজনৈতিক বিতর্কও একসময় থেমে যাবে। তবু ইতিহাসে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। আরজি করের ক্ষেত্রেও হয়তো সেই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় সত্যের শেষ সীমা কোথায়? হয়তো সময়ই দেবে তার সদুত্তর!
(শেষ)
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
