১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
শোভাবাজার রাজবাড়ির বড় তরফ বনাম ছোট তরফ

শোভাবাজার রাজবাড়ির দুই তরফের প্রাসাদ। ছবি - AI

শোভাবাজার রাজবাড়ির বড় তরফ বনাম ছোট তরফ

calender icon 2 ২২শে আগস্ট, ২০২৬

মূল বিষয়

ইংরেজ আমলে গড়ে ওঠা কলকাতার নতুন বনেদিয়ানার কথা বললেই সর্বপ্রথম যাদের নাম আসে তাদের অন্যতম হল শোভাবাজার রাজবাড়ি। রবার্ট ক্লাইভের বদান্যতায় দেব'দের শোভাবাজার রাজবাড়ির এই উত্থান। নাহলে যে কী হত দক্ষিণ ভারতে ক্রাইম করে আসার অভিযোগে অভিযুক্ত পরিবারটির!

তবে উত্তর কলকাতার রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিটে পা রাখলেই একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়বে। রাস্তার একপাশে ৩৩ নম্বর ঠিকানায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুবিশাল এক রাজবাড়ি, আর ঠিক উল্টোদিকে ৩৬ নম্বরে রয়েছে আরও একটি প্রাসাদ। দুটোই শোভাবাজার রাজবাড়ি!

একই রাস্তা, একই বংশ, অথচ দুটো আলাদা ঠিকানা কেন? অবশ্যই রাজপরিবার বা জমিদারদের একাধিক বাড়ি থাকতে পারে, কিন্তু রাজবাড়ি বলে তো একটাকেই দাবি করার কথা। শোভাবাজার রাজ পরিবারের এমন অদ্ভুত ব্যতিক্রমী ঘটনার উত্তর খুঁজতে গেলেই পরতে পরতে সন্ধান পাবেন বাবু কালচারের কলকাতার এক অন্যতম মুখরোচক কেচ্ছার। এই কেচ্ছায় মিশে আছে এক প্রবল মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, সম্পত্তির উত্তরাধিকারের লড়াই এবং এক বাবার চরম অসহায়তা।

উত্তরাধিকারের শূন্যতা এবং

পলাশীর যুদ্ধের পর রাজা নবকৃষ্ণ দেব তখন কার্যত প্রভাব প্রতিপত্তির মধ্যগগনে অবস্থান করছেন। সিরাজের কোষাগার লুঠ করে পাওয়া বিপুল ধনসম্পদ, ব্রিটিশদের আনুকূল্য, সমাজে অসীম প্রতিপত্তি সবকিছু তাঁর তখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু এত কিছুর পরেও শোভাবাজার রাজবাড়ির অন্দরমহলে একটা চাপা হাহাকার ছিল। নবকৃষ্ণ দেবের বয়স বাড়ছে, অথচ তাঁর কোনও পুত্রসন্তান নেই। এত বিশাল সাম্রাজ্য, অগাধ সম্পত্তি এসবের উত্তরাধিকারী কে হবে?

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হতাশ হয়ে রাজা এক সিদ্ধান্ত নিলেন। নিজের দাদা রামসুন্দর দেবের ছেলে গোপীমোহনকে তিনি দত্তক নিলেন। শুধু দত্তক নেওয়াই নয়, রীতিমতো রাজকীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গোপীমোহনকে ঘোষণা করা হল শোভাবাজার রাজবাড়ির ভাবী উত্তরাধিকারী। রাজবাড়ির অন্দরমহল যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। ভাবখানা এমন যাক, বংশের একটা গতি তো হল!

নিজের ঔরসজাতের আগমন

কিন্তু সময়ের ঊর্ধ্বে তো কেউ নয়। ফলে হঠাৎই বদলে গেল গোটা পরিস্থিতি। গোপীমোহন যখন শোভাবাজার রাজবাড়ির অলিখিত যুবরাজ হিসেবে একটু একটু করে বড় হচ্ছেন, ঠিক তখনই ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা। নবকৃষ্ণ দেবের নিজের এক পুত্রসন্তানের জন্ম হল! নিজের ঔরসজাত পুত্রসন্তান। নাম রাখা হল রাজকৃষ্ণ দেব।

এতে খুশি হওয়ার বদলে শোভাবাজার রাজবাড়ির আনন্দোৎসবের সুর ছাপিয়ে উচ্চস্বরে বাজতে শুরু করল আশঙ্কার চোরাস্রোত। নবকৃষ্ণের নিজের সন্তানের জন্মের ফলে গোপীমোহনের পায়ের তলার মাটি হঠাৎ করেই যেন সরে গেল। যে ছেলেকে এতকাল ভবিষ্যৎ রাজা হিসেবে সম্মান করা হয়েছে, এখন খাস ঔরসজাত সন্তানের জন্মের পর তার ভবিষ্যৎ কী? সে যুগের কলকাতার বাবু, অভিজাত মহলে এই নিয়ে রীতিমতো ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। সবার চোখ তখন নবকৃষ্ণের দিকে, তিনি এবার কী করবেন?

আরও পড়ুন
মাছ কেনার অপমানের জ্বালা ভুলতে তৈরি হয় ছাতুবাবুর বাজার!
গরুদের জল খাওয়ার জন্য ধর্মতলায় দিঘি খনন!
মুঘলদের পরোক্ষ অবদানে শুরু প্রথম দুর্গাপুজোর!

বড় তরফ বনাম ছোট তরফ

নবকৃষ্ণ দেব জানতেন, তাঁর অবর্তমানে এই সুবিশাল সম্পত্তি নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম অনিবার্য। তাই অত্যন্ত সুকৌশলে এবং বলতে গেলে কিছুটা বাধ্য হয়েই তিনি তাঁর জীবদ্দশায় সম্পত্তির চূড়ান্ত বাঁটোয়ারা করে ফেলেন।

পৈতৃক ভিটে এবং আদি যে রাজবাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল (৩৩ নম্বর রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিট), সেটি তিনি তুলে দেন দত্তক পুত্র গোপীমোহনের হাতে। এটিই ইতিহাসে পরিচিত হয় 'বড় তরফ' বা বড় রাজবাড়ি নামে। অন্যদিকে, নিজের ঔরসজাত সন্তান রাজকৃষ্ণের প্রতি স্নেহের কোনো খামতি তিনি রাখেননি। রাস্তার ঠিক উল্টোদিকে (৩৬ নম্বরে) রাজকৃষ্ণের জন্য তিনি গড়ে তোলেন আরও এক বিশাল প্রাসাদ। এই প্রাসাদের নাম হয় 'ছোট তরফ'।

সম্পত্তি ভাগ হল ঠিকই, কিন্তু মনের ভাগ কি অত সহজে মেটে? না, শোভাবাজার রাজবাড়িতেও সেটা মেটেনি।

রেষারেষি, আভিজাত্য এবং দুটি ভিন্ন ধারা

নবকৃষ্ণ দেবের মৃত্যুর পর বড় তরফ এবং ছোট তরফের মধ্যে একটা অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি হয়ে যায়। প্রকাশ্যে কোনও খুনোখুনি বা দাঙ্গাহাঙ্গামা হয়ত হয়নি, কিন্তু রেষারেষিটা ছিল অন্য মাত্রার। কে কতটা বনেদি, কার দুর্গাপুজোয় কত বেশি জাঁকজমক, কার বাড়িতে বেশি সাহেব-সুবো আসে এসব নিয়ে শুরু হল এক অদ্ভুত স্নায়ুযুদ্ধ।

বড় তরফ বা গোপীমোহন দেবের ধারাটি পরবর্তীকালে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছায়, যার অন্যতম কারণ ছিলেন গোপীমোহনের সুযোগ্য পুত্র রাজা রাধাকান্ত দেব। তিনি ছিলেন সেই যুগের অবিসংবাদিত হিন্দু সমাজের নেতা। তিনি একদিকে যেমন 'ধর্মসভা' প্রতিষ্ঠা করে কট্টর হিন্দুয়ানি এবং সতীদাহ প্রথার মতো রক্ষণশীল বিষয়গুলোকে সমর্থন করেছিলেন, অন্যদিকে আবার নারী শিক্ষা এবং হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি দেশ ছাড়িয়ে ইউরোপেও পৌঁছেছিল। শোভাবাজার রাজবাড়ির বড় তরফ নিজেদের এই আভিজাত্য এবং পাণ্ডিত্যের গরিমায় সবসময় একটা আলাদা গাম্ভীর্য বজায় রেখে চলত।

অন্যদিকে ছোট তরফ, অর্থাৎ রাজকৃষ্ণ দেবের বংশধরেরাও পিছিয়ে ছিলেন না। নিজেদের আভিজাত্য প্রদর্শনে তারা বড় তরফকে রীতিমতো টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। ছোট তরফের দুর্গাপুজো এবং বাবু কালচারের জাঁকজমক সেকালের কলকাতাকে তাক লাগিয়ে দিত। বাইজি নাচ, শানদার মেহফিল আর দেদার খরচে ছোট তরফ নিজেদের একটা আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিল।

পাশাপাশি, তবু কত দূরে!

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শোভাবাজার রাজবাড়ির দুই তরফের সদস্যদের মধ্যে সরাসরি কোনও শত্রুতা হয়ত থাকেনি, কিন্তু একটা দূরত্ব বরাবরই বজায় ছিল। আশ্চর্যের বিষয় হল, রাস্তার এপার আর ওপারে দুই রাজবাড়িতে আজও একই সঙ্গে দুর্গাপুজো হয়। বড় তরফের ঠাকুরদালান আর ছোট তরফের ঠাকুরদালানের মধ্যে একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা আজও কলকাতার বনেদি পুজোর এক অন্যতম আকর্ষণ। রীতিনীতি প্রায় এক হলেও, দুই বাড়ির পুজোর মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়ে গেছে।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে শোভাবাজার রাজবাড়ির এই দুই তরফের ইতিহাস শুধু একটা অভিজাত পারিবারিক বিবাদের গল্প নয়। এটি আসলে আঠারো ও উনিশ শতকের কলকাতার সমাজচিত্রের এক নিখুঁত দর্পণ।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য