১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
রাখি বন্ধনের রাজনীতি, বাজার ও সামাজিক আত্মসমীক্ষা

রাখি বন্ধন। ছবি - Google

রাখি বন্ধনের রাজনীতি, বাজার ও সামাজিক আত্মসমীক্ষা

মূল বিষয়

রাখি  বন্ধন ভারতীয় সমাজের অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব। সাধারণ দৃষ্টিতে এটি ভাই ও বোনের মধ্যকার অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং স্নেহের প্রতীক। পৌরাণিক আখ্যান থেকে শুরু করে রানি কর্ণাবতী ও হুমায়ুনের বিতর্কিত আধা-ঐতিহাসিক আখ্যান পর্যন্ত—নানা গল্পে উৎসবটির উৎস খোঁজা হয়। আবার নারীবাদী ও প্রগতিশীল দৃষ্টিকোণ থেকে একে দেখা হয় পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের প্রতিফলন হিসেবে, যেখানে নারীকে দেখানো হয় সুরক্ষাপ্রার্থী ও পরনির্ভরশীল এক নিষ্ক্রিয় চরিত্র হিসেবে। তবে উৎসবটিকে কেবল একটি ‘অনস্বীকার্য মহান সংস্কৃতি’ হিসেবে অন্ধভাবে সমর্থন করা কিংবা স্রেফ ‘পশ্চাৎপদ প্রথা’ বলে পুরোপুরি নাকচ করে দেওয়ার বাইরেও এর পেছনে গভীর আর্থ-সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা রয়েছে, যা খতিয়ে দেখা জরুরি।

ঐতিহাসিক বিস্মৃতি ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ

আমাদের সমাজ একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘ঐতিহাসিক বিস্মৃতি’ বা হিস্টোরিক্যাল অ্যামনেসিয়ায় ভুগছে। কোনো রীতির পেছনের সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট, ব্যুৎপত্তি বা ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা বোঝার চেষ্টা খুব কম মানুষই করেন। একটি প্রথা কেন শুরু হয়েছিল এবং সমসাময়িক যুগে তার উপযোগিতা ফুরিয়ে যাওয়ার পরও তা কেন টিকে থাকে—এই যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন তোলার প্রবণতা সমাজে ক্রমেই কমছে।

রক্ষা বন্ধনের শিকড় স্পষ্টতই পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হলেও, বর্তমান যুগে এর টিকে থাকার মূল কারণ ভিন্ন। আত্মপরিচয় ও ইতিহাসের প্রতি অজ্ঞতা এবং আধুনিক ভারতে তীব্র হতে থাকা উগ্র সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এই অন্ধ চর্চাকে আরও জোরদার করেছে। আজ যেকোনো প্রাচীন রীতির গঠনমূলক সমালোচনা করা মাত্রই তাকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর আক্রমণ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়। ফলে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্তিপূর্ণ ও সমালোচনামূলক বোঝাপড়ার জায়গাটি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

পৌরাণিক শিকড়: দেবতাদের বিশ্বাস ও ভালোবাসার সুরভিত গল্প

রাখি বন্ধনের সূচনা ঠিক কবে বা কার হাত ধরে হয়েছিল, তার কোনো একক ঐতিহাসিক দলিল নেই। এর শুরু রূপকথা ও পৌরাণিক বিশ্বাসের এমন এক গভীরে, যেখানে একটি কাপড়ের টুকরো বা সুতো হয়ে উঠেছিল পরম আশ্রয়ের প্রতীক।

কৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর পবিত্র বন্ধন:

মহাভারতের এক আখ্যানে দেখা যায়, রাজসূয় যজ্ঞের সময় শিশুপাল বধ করতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের আঙুল কেটে রক্তপাত শুরু হয়। উপস্থিত সকলে যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তখন দ্রৌপদী নিজের প্রিয় রেশমি শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে ভালোবেসে কৃষ্ণের আঙুলে বেঁধে দেন। এই নিঃস্বার্থ স্নেহের প্রতিদানে কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে প্রতিশ্রুতি দেন চিরন্তন সুরক্ষার। পরবর্তীতে কৌরব সভায় পাশা খেলার পর যখন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের চেষ্টা হয়, তখন সেই এক টুকরো কাপড়ের ঋণ শোধ করতেই কৃষ্ণ আবির্ভূত হয়েছিলেন পরম রক্ষক হিসেবে।

ইন্দ্র ও শচীর রক্ষাকবচ:

বৈদিক যুগের এক কাহিনিতে অসুরদের সাথে যুদ্ধে দেবরাজ ইন্দ্র যখন পরাজিত হচ্ছিলেন, তখন তাঁর স্ত্রী শচী (ইন্দ্রাণী) ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদপুষ্ট একটি পবিত্র সুতো ইন্দ্রের কব্জিতে বেঁধে দেন। সেই সুতোর শক্তিতেই ইন্দ্র বিজয়ী হন। অর্থাৎ উৎসবটির আদি রূপ ছিল কেবল আত্মরক্ষা ও মঙ্গলের প্রতীক, যা কালক্রমে ভাই-বোনের ভালোবাসার বন্ধনে রূপান্তরিত হয়।

লক্ষ্মী ও রাজা বলির উপাখ্যান:

পাতালে রাজা বলির ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে ভগবান বিষ্ণু যখন সেখানে দ্বারপাল হিসেবে অবস্থান করছিলেন, তখন দেবী লক্ষ্মী এক সাধারণ নারীর বেশে বলিকে রাখি পরিয়ে ভাই হিসেবে বরণ করেন। উপহার হিসেবে তিনি বৈকুণ্ঠে বিষ্ণুর প্রত্যাবর্তন চান। বলিও বোনের এই প্রার্থনা ফেরাতে পারেননি।

ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে রাখির বৈচিত্র্যময় রূপ

আরও পড়ুন
বিশ্বসুন্দরীর লড়াইয়ে ১৯ বছরের আইনের ছাত্রী
 চিনির দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে কি তবে ইথানল নীতি?
৩৪০০ চুমু, ৫৫০০ জরিমানা!

ভারতবর্ষের বৈচিত্র্য রক্ষা বন্ধন উৎসবের আচার-অনুষ্ঠানেও স্পষ্ট ফুটে ওঠে:

দক্ষিণ ভারতে বৈদিক আচার: কর্ণাটকে এই দিনটি "অবনি অবিত্তম" হিসেবে পালিত হয়, যেখানে বৈদিক প্রথা মেনে উপবীত বা পৈতে পরিবর্তন করা হয় এবং বোনেরা ভক্তিভরে ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করে রাখি বাঁধেন।

তেলেগু ঐতিহ্য: অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় এটি 'রাখি পূর্ণিমা' নামে পরিচিত। সেখানে বোনেরা ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় আরতি করেন এবং ‘অরিসেলু’র মতো ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি দিয়ে সাজিয়ে তোলেন উৎসবের থালা।

সামাজিক ও ধর্মীয় ঐক্য: জৈন ও শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যেও রাখি বাঁধার প্রথা প্রচলিত। জৈনরা আধ্যাত্মিক সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে পুরোহিতদের হাতে সুতো পরিয়ে দেন, আর শিখরা এটিকে ব্যবহার করেন সমাজের পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে।

পুঁজিবাদের আগ্রাসন: অনুভূতির পণ্যায়ন

বর্তমান সময়ে আমরা এমন এক ভোগবাদী পুঁজিবাদী সমাজে বাস করছি, যেখানে প্রতিটি মানবিক সম্পর্ক ও আচার-অনুষ্ঠানকে পণ্যে রূপান্তর করা হয়েছে। ভাই-বোনের মধ্যকার অমূল্য মানসিক বন্ধনটিকে বাজার এখন রূপান্তরিত করেছে একটি দৃশ্যমান বাণিজ্যিক লেনদেনে।

চকোলেট বক্স ও গিফট হ্যাম্পার:

উৎসবের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের যে আগ্রাসন চলে, তা ব্যক্তিকে এই পণ্যগুলো কিনতে একপ্রকার বাধ্য করে। ভালোবাসা প্রমাণের মাপকাঠি হয়ে ওঠে বাজারের উপহারসামগ্রী।

মুনাফার রাজনীতি:

উৎসবটি আজ সাধারণ মানুষের আবেগের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে বহুজাতিক কর্পোরেট ও পুঁজিবাদী শক্তির মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে।

বিচ্ছিন্ন আধুনিকতা ও উৎসবের ‘মনস্তত্ত্ব’

পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামোর প্রসারের সাথে সাথে যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট ছোট  পরিবারে পরিণত হয়েছে এবং বহু মানুষ এখন যাযাবর বা বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করছেন। নিজের শিকড় থেকে ছিটকে পড়ার এই অনুভূতির মাঝে উৎসবগুলো কাজ করে এক ধরনের সাময়িক ‘সাংস্কৃতিক আঠা’ হিসেবে। মানুষ নিজের অজান্তেই এই ভোগবাদী ব্যবস্থার অংশীদার ও শিকার হয়ে ওঠে। এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি ভুলতেই রক্ষা বন্ধনের মতো উৎসবগুলো সাময়িক সান্ত্বনার বা ‘কোপিং মেকানিজম’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

প্রাচীন প্রথার আধুনিক রূপান্তর ও আত্মসমীক্ষার পথ

কোনো ঐতিহ্য এক দিনে তৈরি হয় না, আবার এক দিনে তা মুছে ফেলাও সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতি প্রাচীন ও সমস্যাজনক প্রথাগুলোকে চকচকে প্যাকেজিংয়ে নতুন প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করে, যারা এর পেছনের জটিল ঐতিহাসিক রাজনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনবগত। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি আচার বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নতুন নতুন মোড়কে তার অস্তিত্ব টিকে থাকবে।

রক্ষা বন্ধনের সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে হলে কেবল তাত্ত্বিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। উৎসবের পেছনের পিতৃতান্ত্রিক বীজ যেমন চেনা প্রয়োজন, তেমনই এর বর্তমান বাণিজ্যিক রূপ ও সামাজিক ভোগব্যবহারকেও সমানভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো দরকার। কেবল তখনই একটি প্রথার বাহ্যিক রূপ এবং অন্তর্নিহিত বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ বোঝাপড়া তৈরি সম্ভব হবে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য