

হোলি রোজারি ক্যাথেড্রাল। ছবি - Google
১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
যানজট, ধুলো আর হর্নের কানফাটানো আওয়াজ। মালবাহী ঠেলাগাড়ির ভিড় ঠেলে ফুটপাত দিয়ে হাঁটাই দায়- এটাই আজকের ব্র্যাবোর্ন রোডের চেনা ছবি। কিন্তু জানেন কি এই ব্র্যাবোর্ন রোডেই গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রাচীন পেল্লায় সব ইমারত। তার অনেকগুলোই আজ জীর্ণ, গা থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা।
শহর কলকাতার এই অতি ব্যস্ত রাস্তার বুকের উপরই দাঁড়িয়ে আছে অন্যতম প্রাচীন এক ইমারত, যার পবিত্র বেদীর ঠিক নিচে আজও ঘুমিয়ে আছে অন্ধকার জগতের এক রোমহর্ষক ইতিহাস।
অন্ধকার সেই ইতিহাসের পথে পাড়ি জমানোর আগে এই রাস্তার নামের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। এখনকার এই ব্যস্ত বাণিজ্যিক রাস্তার নাম একসময় ছিল 'মুরগিহাটা'। নামটা শুনলেই কেমন যেন একটা গ্রাম্য বাজারের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আসল ব্যাপারটা তেমনই ছিল।
আঠারো শতকের একেবারে গোড়ার দিকে, কলকাতা যখন একটু একটু করে শহর হয়ে উঠছে, তখন এই এলাকাটি ছিল হাঁস-মুরগির সবচেয়ে বড় বাজার। দেশি-বিদেশি বণিক আর নাবিকদের আনাগোনায় দিনরাত গমগম করত জায়গাটা। মূলত পর্তুগিজরাই এই এলাকায় প্রথম পাকাপাকিভাবে ব্যবসার ডেরা বানাতে শুরু করে।
এরপর গঙ্গা দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে। ১৯৩০-এর দশকে বাংলার তৎকালীন গভর্নর লর্ড ব্র্যাবোর্নের (Lord Brabourne) সম্মানার্থে এই রাস্তার নাম বদলে রাখা হয় 'ব্র্যাবোর্ন রোড'। সরকারি নথিতে নাম বদলালেও, পুরোনো কলকাতার বাসিন্দাদের মুখে মুখে মুরগিহাটা নামটাই দীর্ঘদিন টিকে ছিল।
এই মুরগিহাটা বা আজকের ব্র্যাবোর্ন রোডেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে 'হোলি রোজারি ক্যাথেড্রাল'। স্থানীয়দের কাছে অবশ্য এটি পর্তুগিজ চার্চ নামেই বেশি পরিচিত। প্রশ্ন উঠতে পারে, এত জায়গা থাকতে পর্তুগিজরা ঠিক এখানেই কেন চার্চ তৈরি করে?
১৬৯০ সালে জব চার্নক আসার বহু আগেই হুগলি নদীর স্রোত বেয়ে বাংলায় ঢুকে পড়েছিল পর্তুগিজ বণিক আর জলদস্যুরা। তাদের ব্যবসার মূল কেন্দ্র ছিল হুগলি (ব্যান্ডেল), কিন্তু সুতানুটি ও গোবিন্দপুরের ব্যবসায়ী এলাকাতেও তাদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তৎকালীন মুরগিহাটা এলাকায় পর্তুগিজদের একটা ছোটখাটো জনবসতি গড়ে ওঠে। তাদের প্রার্থনার জন্যই ১৬৯০ সাল নাগাদ অগাস্টিনিয়ান পাদ্রিরা ঠিক এখানেই একটি ছোট কাঠের চ্যাপেল তৈরি করেন।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন কলকাতায় জাঁকিয়ে বসেছে, তখন পর্তুগিজদের প্রতিপত্তি অনেকটাই পড়তির দিকে। তবে তাদের হাতে প্রচুর অর্থ ছিল। ১৭৯৯ সালে জোসেফ ব্যারেটো এবং তাঁর ভাই লুইস ব্যারেটোর মতো কয়েকজন অত্যন্ত ধনী পর্তুগিজ বণিকের বিপুল আর্থিক সাহায্যে পুরনো কাঠের চ্যাপেল ভেঙে বর্তমানের এই বিশাল গথিক ও নিও-ক্ল্যাসিকাল রীতির ইমারতটি গড়ে ওঠে। বিশাল খিলান, রঙিন কাঁচের জানালা আর উঁচু চূড়া- সব মিলিয়ে স্থাপত্যের এক অসাধারণ নিদর্শন এই চার্চ।
বাইরে থেকে দেখলে এটি আর পাঁচটা সুন্দর গির্জার মতোই শান্ত, পবিত্র। কিন্তু এর প্রার্থনা বেদীর ঠিক নিচে লুকিয়ে আছে এক হাড় হিম করা গুপ্ত ইতিহাস। চার্চের গর্ভগৃহে বা বেদীর নিচে রয়েছে একটি অন্ধকার সমাধিকক্ষ বা ক্রিপ্ট (Crypt)। এখানেই শায়িত আছেন আঠারো শতকের পর্তুগিজ বণিক এবং কলকাতার প্রথম দিককার ইউরোপীয় অভিজাতরা।
তবে আসল রহস্য অন্য জায়গায়। জনশ্রুতি বলে, এই সমাধিকক্ষ আর চার্চের নিচের সুড়ঙ্গগুলোর সঙ্গে পর্তুগিজ 'হার্মাদ' বা জলদস্যুদের সরাসরি যোগসাজশ ছিল। একসময় কলকাতা ও হুগলি নদী সংলগ্ন এলাকায় এই হার্মাদদের মারাত্মক আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার আর লুঠপাটের জন্য তারা কুখ্যাত ছিল। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে এবং লোকমুখে প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, লুটপাট করা বিপুল ধনসম্পদ লুকিয়ে রাখা এবং রাতের অন্ধকারে চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে চার্চের তলার এই অন্ধকার সুড়ঙ্গগুলোকে তারা ব্যবহার করত।
চার্চের এই সুড়ঙ্গপথ নাকি সোজা গিয়ে মিশেছিল হুগলি নদীর সঙ্গে, যাতে বিপদের সময় নদীপথে সহজেই পালিয়ে যাওয়া যায়। আধ্যাত্মিক আবরণের ঠিক নিচে এমন এক অন্ধকার অপরাধ জগতের সহাবস্থান আজও রীতিমতো শিহরণ জাগায়। বর্তমানে এই ক্রিপ্টে সাধারণের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কালের নিয়মে সুড়ঙ্গপথের বেশিরভাগটাই বুজে গিয়েছে বা বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শুধু এই চার্চই নয়, উত্তর কলকাতার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা এমন বিস্মৃত ইতিহাসের শেষ নেই। এই শহরের বুকে ছড়িয়ে আছে আরও অনেক ইমারত, যাদের বাইরের চাকচিক্যের আড়ালে চাপা পড়ে আছে অন্ধকার আর রহস্যের আখ্যান। আহিরিটোলার পুতুলবাড়ির কার্নিশে থাকা পুতুলগুলো যেমন আজও পাহারা দেয় বাবুদের লালসার শিকার হওয়া অগণিত নারীর কান্নাকে। বাগবাজারের বসু বাটীর গোপন প্রকোষ্ঠগুলো আজও বুকে ধরে রেখেছে ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবীদের রোমাঞ্চকর লুকোচুরির স্মৃতি। আবার, শোভাবাজার রাজবাড়ির ছোট তরফের সেই দালান, যেখানে বসে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের পতনের গুপ্ত ছক কষা হয়েছিল, আজও তা দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে।
কলকাতার এই কলোনিয়াল ইমারতগুলো নিছকই ইট-কাঠ-পাথর নয়; এগুলো এক একটা সময়ের জীবন্ত দলিল, যাদের ধুলোমাখা দেওয়ালে কান পাতলে আজও শোনা যায় ফেলে আসা সময়ের ফিসফাস।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
