১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
মুরগির পালকেই সার!

মুরগির পালক থেকে জৈব সার! ছবি - Google

মুরগির পালকেই সার!

calender icon 2 ১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মূল বিষয়

মুরগির মাংসের ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পালকের বর্জ্যও। সাধারণত সেই পালক ফেলে দেওয়া, পুঁতে রাখা কিংবা পোড়ানো হয়। অথচ গবেষণায় দেখা গেল, ঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করলে মুরগির পালকই হয়ে উঠতে পারে জমির জৈব সার। বাংলাদেশে গবেষকদের এক পরীক্ষায় মুরগির পালককে নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পচিয়ে মাটিতে মেশানো হয়েছিল। তার পর দেখা যায়, পালক-প্রক্রিয়াজাত সার ব্যবহার করা জমিতে শাকজাতীয় সবজির গাছ তুলনায় বেশি লম্বা হয়েছে, বেড়েছে পাতার সংখ্যা এবং গাছের মোট জৈবভরও। অর্থাৎ এত দিন যে বর্জ্যকে সমস্যা বলে ফেলে দেওয়া হত, সেটিই ফিরতে পারে কৃষিজমিতে পুষ্টির উৎস হয়ে।

মুরগির পালক নিয়ে গবেষণা

গবেষণাটি বাংলাদেশের খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের কসাইখানা থেকে মুরগির পালক সংগ্রহ করেন। পালকের বিশেষত্ব হল, এটি মূলত কেরাটিন নামের শক্ত প্রোটিন দিয়ে তৈরি। মুরগির শরীরের ওজনের প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত পালক হতে পারে। সেই পালকে রয়েছে নাইট্রোজেন-সহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। কিন্তু সমস্যা হল, কাঁচা পালকের কেরাটিন অত্যন্ত শক্ত হওয়ায় তা সহজে মাটিতে মিশে ভেঙে যায় না। ফলে সরাসরি জমিতে পালক ছড়িয়ে দিলেই সার হয়ে যাবে, এমন নয়।

গবেষকেরা তাই প্রথমে পালককে নিয়ন্ত্রিত ভাবে পচন বা ‘ডিকম্পোজিশন’-এর মধ্যে দিয়ে নিয়ে যান। বায়বীয় এবং অবায়বীয়- দুই ধরনের পচন প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট সময় অন্তর সেই প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণও করা হয়। এই প্রক্রিয়ার পরে শক্ত, bulky পালক অনেকটাই ভেঙে তুলনামূলক ব্যবহারযোগ্য জৈব উপাদানে পরিণত হয়। গবেষণায় তৈরি হওয়া পালক-ভিত্তিক উপাদানে প্রায় ৩৫.৯ শতাংশ জৈব পদার্থ এবং ৪ শতাংশ মোট নাইট্রোজেন পাওয়া যায়। অর্থাৎ, সঠিক ভাবে প্রক্রিয়াজাত করলে পালক থেকে পাওয়া উপাদান নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ জৈব সারের সম্ভাবনা তৈরি করছে।

তার পর শুরু হয় আসল পরীক্ষা। গবেষকেরা চারটি ভিন্ন মাত্রায় প্রতি হেক্টরে ৪, ৮, ১২ এবং ১৬ টন প্রক্রিয়াজাত পালক মাটিতে প্রয়োগ করেন। তুলনার জন্য রাখা হয় কোনও পালক-সার না দেওয়া মাটিও। সেখানে চাষ করা হয়েছিল Ipomoea aquatica অর্থাৎ জলকলমি বা কাংকং নামে পরিচিত পাতাযুক্ত সবজি। গাছগুলি অঙ্কুরোদ্গমের প্রায় সাত সপ্তাহ পরে সংগ্রহ করে উচ্চতা, পাতার সংখ্যা এবং কাঁচা ও শুকনো ওজনের তুলনা করা হয়।

গবেষণার ফলাফল

আরও পড়ুন
শর্ট ভিডিও ও রিলসে কেন আটকে যায় মস্তিষ্ক?
মহাকাশে চাষ, মহাকাশেই রান্না!
এ বার গাছেই তৈরি হবে মাংসের প্রোটিন

ফলাফলে দেখা গিয়েছে, পালক-প্রক্রিয়াজাত উপাদান দেওয়া জমির গাছগুলির পাতা তুলনামূলক বেশি সবুজ হয়েছে। প্রয়োগের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সেই পার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে প্রতি হেক্টরে ১২ টন বা তার বেশি প্রক্রিয়াজাত পালক ব্যবহার করা হলে গাছের উচ্চতা, পাতার সংখ্যা এবং গাছের ওজন নিয়ন্ত্রণ গোষ্ঠীর তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছিল।

কেন এমন হল? এর পিছনে রয়েছে নাইট্রোজেনের ভূমিকা। গাছের পাতার বৃদ্ধি এবং সবুজ অংশ তৈরিতে নাইট্রোজেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচা পালকে নাইট্রোজেন থাকলেও কেরাটিনের শক্ত গঠনের কারণে সেটি সহজে উদ্ভিদের নাগালে আসে না। নিয়ন্ত্রিত পচন সেই জটিল জৈব উপাদানকে ভেঙে পুষ্টিগুলিকে তুলনামূলক ভাবে সহজলভ্য করে। ফলে মাটিতে মেশানোর পরে গাছ সেই পুষ্টির কিছুটা ব্যবহার করতে পারে।

তবে গবেষকেরা একই সঙ্গে সতর্কও করেছেন। কাঁচা মুরগির পালক সরাসরি জমিতে ছড়িয়ে দিলেই একই ফল পাওয়া যাবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। গবেষণাটি নির্দিষ্ট মাটি, নির্দিষ্ট সবজি এবং নিয়ন্ত্রিত প্রয়োগমাত্রায় করা হয়েছে। বড় আকারে ব্যবহার করতে গেলে পালক সংগ্রহ, পরিষ্কার করা, জীবাণুমুক্তকরণ, সঠিক ভাবে পচানো এবং তৈরি সারটির গুণমান পরীক্ষা- প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশের উপকার

শুধু ফসলের বৃদ্ধি নয়, পরিবেশের দিক থেকেও এই পদ্ধতির গুরুত্ব রয়েছে। পোলট্রি শিল্প থেকে বিপুল পরিমাণ পালক বর্জ্য তৈরি হয়। তা পোড়ালে দূষণ এবং নির্গমনের সমস্যা হতে পারে, আবার মাটির নীচে পুঁতে ফেললেও জমি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপর চাপ পড়ে। সেই বর্জ্যকে যদি নিয়ন্ত্রিত ভাবে পচিয়ে কৃষিজমিতে ফিরিয়ে দেওয়া যায়, তা হলে একই সঙ্গে বর্জ্য কমবে এবং মাটিতে জৈব পুষ্টিও ফিরবে।

এই ধারণা একেবারে নতুনও নয়। আগের গবেষণাগুলিতেও প্রক্রিয়াজাত পালক-সার ব্যবহার করে বিভিন্ন ফসলের বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত মিলেছে। একটি গবেষণায় পালক-ভিত্তিক কম্পোস্ট ব্যবহারে গাছের তাজা ওজন বাড়ার কথা পাওয়া গিয়েছিল; আবার অন্য পরীক্ষায় বেগুন গাছের উচ্চতা, পাতার এলাকা, জৈবভর এবং ক্লোরোফিলের পরিমাণেও উন্নতির কথা রিপোর্ট করা হয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রেই মূল শর্ত, পালককে উপযুক্ত ভাবে প্রক্রিয়াজাত করা। অর্থাৎ, মুরগির পালককে আর শুধু আবর্জনা হিসেবে দেখার দিন হয়তো বদলাতে পারে। মাংসের জন্য ব্যবহৃত মুরগির শরীর থেকে বেরিয়ে আসা যে অংশ এত দিন বর্জ্য হয়ে পড়ে থাকত, সেটিই প্রক্রিয়াজাত হয়ে ফের জমিতে ফিরতে পারে। পোলট্রি শিল্প থেকে কৃষিজমি— বর্জ্য থেকে পুষ্টিতে এমন একটি পুনর্ব্যবহার চক্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন গবেষকেরা।

তবে পরীক্ষাগারের সাফল্যকে সরাসরি মাঠের ফলন বলে ধরে নেওয়ারও উপায় নেই। বড় জমিতে, বিভিন্ন মাটিতে এবং বিভিন্ন ফসলে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা, খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্পস্তরে পালক সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের পরিকাঠামোও তৈরি করতে হবে।

আজ যে পালক মুরগির দোকানের পিছনে ফেলে দেওয়া হয়, কাল সেটিই হয়তো কৃষকের জমিতে পুষ্টির উৎস। বর্জ্য কমিয়ে মাটিতে পুষ্টি ফেরানোর এই সম্ভাবনাই গবেষণাটির সবচেয়ে বড় বার্তা-  আবর্জনারও মূল্য আছে, শুধু তাকে নতুন করে কাজে লাগানোর পথটি খুঁজে নিতে হয়।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
সৌমালী চক্রবর্তী
সৌমালী চক্রবর্তী

2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য