

কলকাতার একেবারে প্রথম ট্রাম। ছবি - Google
২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
শহরের চরিত্র বদলায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় তার রূপ, রস আর গন্ধ। একসময়ের ঘোড়ার খুরের শব্দ আর গ্যাসবাতির আলোয় মোড়া কলকাতা আজ মেট্রোরেল আর ফ্লাইওভারের জালে বাঁচার পথ খুঁজে নিয়েছে। আধুনিকতার এই চূড়ান্ত অহঙ্কারের যুগে গতির কাছে হার মেনেছে আবেগ। কিন্তু আজও শহরের দু-একটি রাস্তায় কান পাতলে ক্ষীণ শোনা যায় সেই চেনা 'টিং টিং' শব্দ। কলকাতার বুক চিরে ধীর লয়ে বয়ে চলা ট্রাম নিছক কোনও যানবাহন নয়, এটি এক জীবন্ত ইতিহাস।
সময়টা ১৮৭৩ সাল। কলকাতা তখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হওয়ায় লাফিয়ে বাড়ছে জনসংখ্যা। বন্দর এলাকা থেকে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে মালপত্র ও সাধারণ মানুষ পৌঁছনোর জন্য একটা সস্তা ও ভরসাযোগ্য গণপরিবহন খুব দরকার হয়ে পড়েছিল। সেই ভাবনা থেকেই ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি শিয়ালদহ থেকে আরমেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত মাত্র ২.৪ কিলোমিটারের পথে প্রথম দৌড়ল ট্রাম।
তবে এই ট্রাম বিদ্যুতে চলত না, এমনকি বাষ্পেও নয়। লোহার লাইনের উপর দিয়ে কাঠের খাঁচাসদৃশ কামরাগুলো টেনে নিয়ে চলত ঘোড়া! তবে এই পথ চলা দ্রুত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাত্রীর অভাবে সেই বছরই ঘোড়ায় টানা ট্রাম বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু ব্রিটিশরা হাল ছাড়ার পাত্র ছিল না। ১৮৮০ সালে লন্ডনে নথিভুক্ত হল 'ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি' (CTC)। ১৮৮২ সালে কলকাতার বুকে নামল বাষ্পচালিত ইঞ্জিন। ধোঁয়া উড়িয়ে, হাঁসফাঁস করতে করতে কলকাতার রাস্তায় ছুটল ট্রাম। শহরের মানুষের কাছে সে এক পরম বিস্ময়!
আসল বিপ্লব ঘটল ১৯০২ সালের ২৭ মার্চ। এসপ্ল্যানেড থেকে খিদিরপুর পর্যন্ত ছুটল এশিয়ার প্রথম বিদ্যুৎচালিত ট্রাম। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শ্যামবাজার থেকে বালিগঞ্জ, টালিগঞ্জ থেকে হাওড়া, সর্বত্র যেন একটা জালের মতো শহরটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল ট্রামলাইন।
সেই যুগে ট্রামে দুটো ক্লাস ছিল। ফার্স্ট ক্লাসের গদি-আঁটা সিট, মাথার ওপর ফ্যান। যা ছিল মূলত ইংরেজ সাহেব আর কলকাতার ধনী বাঙালি বাবুদের জন্য। আর কাঠের সিটের সেকেন্ড ক্লাস ছিল সাধারণ খেটে-খাওয়া বাঙালির গন্তব্যে পৌঁছনোর মাধ্যম।
কলকাতার ট্রামের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলন ও প্রতিরোধের কাহিনী। ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ মালিকানাধীন ট্রাম কোম্পানি (CTC) সেকেন্ড ক্লাসের ভাড়া ১ পয়সা বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর প্রতিবাদে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্যান্য বামপন্থী দলগুলো তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। ইতিহাসে যা 'ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধি প্রতিরোধ আন্দোলন' নামে পরিচিত। মাসের পর মাস ট্রাম চলাচল বন্ধ থাকে, বহু ট্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পাল্টা পুলিশের গুলিতে বেশ কিছু আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়।
শুধু আন্দোলন নয়, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনের মর্মান্তিক পরিণতি ঘটেছিল এই ট্রামের কারণেই। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর দেশপ্রিয় পার্কের কাছে রাস্তা পার হওয়ার সময় অন্যমনস্ক কবি ট্রামের ক্যাচারে আটকে যান। মারাত্মক আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন।কদিন পর ২২ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। কলকাতার ট্রামের ইতিহাসে এ এক তীব্র বিষাদময় অধ্যায়।
শহরের বাসিন্দা ও পথচারীদের ধুলোর হাত থেকে রক্ষা করতে জল-ছেটানো 'ওয়াটারিং ট্রাম' এক সময় চালু ছিল। সেইসঙ্গে চিঠি বিলির জন্য ব্রিটিশ আমলে 'পোস্টাল ট্রাম'-এর প্রচলনও ছিল। যদিও এগুলো আজকের প্রজন্মের কাছে রূপকথার মতো মনে হতে পারে।
সময় বড়ই নিষ্ঠুর। সত্তর ও আশির দশক থেকে শহরের চরিত্র বদলাতে শুরু করে। জনসংখ্যা বাড়ল, বাড়ল ব্যক্তিগত গাড়ির দাপট। মেট্রো রেলের নির্মাণকাজ শুরু হলে শহরের বহু রাস্তা দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ হয়ে থাকে। ঠিক সেই সময় থেকেই ট্রামের কপালে জুটতে লাগল 'যানজটের কারণ'-এর তকমা।
গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে একটু একটু করে কোণঠাসা হতে শুরু করল এই প্রাচীন যান। নব্বইয়ের দশকে হাওড়া ব্রিজের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য সেখান থেকেও চিরতরে বিদায় নেয় ট্রাম। পিচের চাদরে ঢেকে দেওয়া হয় শহরের বহু ট্রাম লাইন।
আজ কলকাতার ট্রাম আক্ষরিক অর্থেই খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে- হয়তো এটাও একটু বেশি আশাবাদের কথা হয়ে গেল! রোজকার যাতায়াতের মাধ্যম থেকে সে আজ নিছকই হেরিটেজ হয়ে কোনরকমে 'আমি ছিলাম' সূচক অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। এসি ট্রাম, চলন্ত আর্ট গ্যালারি, এমনকি লাইব্রেরি ট্রাম চালু করে তাকে বাঁচিয়ে রাখার এক মরিয়া চেষ্টা চলছে।
আইসিইউ-তে ঢুকে যাওয়া রোগীর এই মরিয়া প্রচেষ্টা কতদিন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে, সেটাই এখন দেখার।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
