

ওল্ড মঙ্ক প্রেমীদের মন খারাপ। ছবি - Google
৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ধরা যাক, আপনি পাড়ার চায়ের দোকানে গিয়ে আয়েশ করে এক কাপ এলাচ চায়ের অর্ডার দিলেন। গরম জলে সামান্য সুগন্ধী মিশিয়ে আপনার হাতে বাড়িয়ে দেওয়া হল এক কাপ পানীয়। আপনি চা ভেবে খেলেন ঠিকই, কিন্তু পরে জানতে পারলেন—তাতে না ছিল এক দানা চা-পাতা, না দুধ, না চিনি। কেমন লাগবে তখন?
ঠিক এমন এক ঘোরলাগা ধাক্কা খাচ্ছেন দেশের লাখ লাখ সুরাপ্রেমী। বছরের পর বছর ধরে শীতের রাতের সঙ্গী, কলেজজীবনের নস্টালজিয়া আর দুঃখ ভোলার বিশ্বস্ত দোসর হিসেবে যে 'ওল্ড মঙ্ক'-কে মানুষ আঁকড়ে ধরেছিল, সরকারি নিয়ামক সংস্থা নাকি বলছে—সেটি আদৌ কোনো রামই নয়!
ঘটনার সূত্রপাত বোম্বে হাইকোর্টে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (FSSAI)-এর একটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। নিয়ামক সংস্থা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ওল্ড মঙ্ককে কোনোভাবেই আর 'রাম' হিসেবে বাজারজাত করা যাবে না। তাদের আপত্তি কেবল বোতলের গায়ে লেখা ‘৭ ইয়ার্স ওল্ড ব্লেন্ডেড’ বা বয়সের দাবিতে নয়; আসল আপত্তি পানীয়টির অস্তিত্ব নিয়ে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যেভাবে কোনো আসলি রাম বা হুইস্কিতে কৃত্রিম স্বাদ বা ফ্লেভার যোগ করার নিয়ম নেই, সেখানে ওল্ড মঙ্কের উপাদান নাকি সেই ধোপে টিকছে না। ফলে সরকারি নথিতে এটিকে সর্বোচ্চ 'রাম-ফ্লেভারড স্পিরিট' বলা যেতে পারে, খাঁটি রাম নয়। মহারাষ্ট্রে ইতিমধ্যেই থমকে গেছে বিক্রি, আর সমাজমাধ্যমে অনুরাগীরা ক্ষোভে-বিস্ময়ে লিখছেন—"তবে কি এতগুলো বছর আমরা মিথ্যের মধ্যে বেঁচে ছিলাম?"
আমরা যা খাচ্ছি, তার ভেতরটা ঠিক কী দিয়ে তৈরি? বিশ্বজুড়ে রাম তৈরি হয় আখের খাঁটি রস বা গুড় সরাসরি সন্ধান (fermentation) করে কাঠের পিপেতে বছরের পর বছর রেখে। স্কচ বা ভালো হুইস্কি তৈরি হয় বার্লি বা দানাদার শস্য থেকে। কিন্তু ভারতের সিংহভাগ সস্তা বা মাঝারি দামের বিলিতি মদ—যাকে পরিভাষায় 'IMFL' বলা হয়—তার তৈরি হওয়ার গল্পটা একেবারেই আলাদা।
এখানে ব্যবহৃত হয় চিনি কারখানার উচ্ছিষ্ট ‘মোলাসেস’ থেকে পাওয়া অতি-পরিশোধিত ইথানল বা এক্সট্রা নিউট্রাল অ্যালকোহল (ENA)। মজার বিষয় হল, এটি রাসায়নিকভাবে সেই একই উপাদান, যা জ্বালানি হিসেবে পেট্রোলের সঙ্গে মেশানো হয়! এই ৯৬ শতাংশ ঝাঁঝালো অ্যালকোহলে পানি মিশিয়ে তাকে ৪২.৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। তারপর প্রয়োজনমতো তাতে একটু ক্যারামেল রঙ আর রামের সিন্থেটিক গন্ধ ঢাললেই নিমেষে তৈরি হয়ে যায় কাচের বোতলে ভরা 'রাম'। অর্থাৎ, কারিগরির দীর্ঘ প্রতীক্ষা নয়, নিমেষেই রসায়ন দিয়ে তৈরি হয় এই স্বাদ।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে বোঝা যায়, স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতে কোটি কোটি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়াই ছিল প্রথম লক্ষ্য; মদ তৈরির জন্য খাদ্যশস্য নষ্ট করার বিলাসিতা দেশের ছিল না। তাই কম খরচে চিনিকলের বর্জ্য মোলাসেস দিয়ে তৈরি হতে শুরু করে এমন সুরা, যা মূলত ‘দেশি মদ’-এরই এক পরিশোধিত ও গন্ধযুক্ত রূপ। বিদেশি মদের নাগাল না পাওয়া মধ্যবিত্তের জন্য এই ব্যবস্থা চলতে চলতে এক বিশাল শিল্পে রূপ নেয়। আজ ভারত বিশ্বে স্কচ আমদানির শীর্ষে থাকলেও দেশের সিংহভাগ বাজার আজও এই কৃত্রিম ফ্লেভার দেওয়া পানীয়ের দখলে।
এই আইনি লড়াই কি ওল্ড মঙ্কের ভক্তদের দূরে সরিয়ে দিতে পারবে? সেই উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে এক অদ্ভুত বাস্তব। দিল্লির প্রেস ক্লাব থেকে শুরু করে মুম্বাইয়ের কোনো সাধারণ পানশালা—নিয়মিত সুরারসিকদের প্রতিক্রিয়া বেশ সরল। দুই দশক ধরে ওল্ড মঙ্ক খাওয়া বহু মানুষের কথা, "ওটা আসলি রাম কি কৃত্রিম অ্যালকোহল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি ওল্ড মঙ্ক খাই কারণ ওটার নাম ওল্ড মঙ্ক, কোনো তাত্ত্বিক রামের সংজ্ঞার জন্য নয়।"
তবে রসিকদের মন যতই আবেগে ভাসুক, নিয়মের কড়াকড়ি এড়ানো সহজ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে যেমন আঙুরের রস ছাড়া তৈরি ভারতীয় ব্র্যান্ডির জন্য ‘ইন্ডিয়ান ব্র্যান্ডি’ নামে আলাদা মান তৈরি করা হয়েছিল, এবারও হয়তো ‘ইন্ডিয়ান রাম’ বা ‘ইন্ডিয়ান হুইস্কি’ নামে মধ্যপন্থা খুঁজতে হবে। তবে নিয়মের বেড়াজালে নাম যা-ই হোক না কেন, শীতের রাতে চেনা চারকোনা বোতল, লালচে রঙ আর পুরনো স্মৃতির গন্ধ মেখে ওল্ড মঙ্ক যে কোটি হৃদয়ে এক নিজস্ব ‘অনুভূতি’ হয়েই থাকবে—তা বলাই বাহুল্য।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
