১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বাবুয়ানির হাত ধরে বদলে যায় বাঙালির হেঁশেল

ছবি - AI

বাবুয়ানির হাত ধরে বদলে যায় বাঙালির হেঁশেল

calender icon 2 ১৮ই আগস্ট, ২০২৬

মূল বিষয়

সময়টা উনিশ শতক। সন্ধে নামলেই কলকাতার রাজপথে ঘোড়ার খুরের ঠকঠক শব্দ। গ্যাসলাইটের আলোয় মায়াবী হয়ে ওঠা শহরের বুকে তখন দাপিয়ে, বলা ভালো ছড়িয়ে উড়িয়ে বেড়াচ্ছে এক নতুন শ্রেণি। তাঁরা হলেন কলকাতার 'বাবু'।

হুগলি নদীর স্রোত বেয়ে তখন কেবল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যতরীই আসছিল না; তার সঙ্গে ভেসে আসছিল এক নতুন সংস্কৃতির উন্মাদনা, হাতছানি। ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্যবসা ও তাদের তোষামোদি করে রাতারাতি ফুলেফেঁপে ওঠে একদল নব্য ধনী বাঙালি। তারা তৎকালীন সমাজ বা অর্থনীতিকেই কেবল নিয়ন্ত্রণ করেননি, কলকাতার খাদ্যাভ্যাসেও এই বাবুরা এনেছিল যুগান্তকরী পরিবর্তন। যার সুবাস আজও আমাদের পাড়ার মোড়ের চপের দোকান থেকে শুরু করে নামী রেস্তোরাঁর মেনু কার্ডে ম-ম করে।

কাঁচা টাকা, সাহেবের তোষামোদ এবং সংস্কৃতির সংঘাত

বাবু কালচারের হাত ধরে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে যে বিপুল পরিবর্তন এল, তার নেপথ্যে ছিল মূলত দুটি কারণ- অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' বাংলার আর্থ-সামাজিক কাঠামোকে আমূল বদলে দেয়। এর ফলে জন্ম নেয় এক নতুন উমেদার শ্রেণি। অনেকে এদের জমিদার বলে থাকেন, তবে তার থেকে এদের বৈশিষ্ট্যে বেশ কিছু পার্থক্য ছিল। এরা অনেকেই ব্রিটিশদের থেকে পাওয়া গ্রামের জমিদারি নায়েব-গোমস্তার হাতে ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় এসে পাকাপাকিভাবে বসবাস করতেন। বলা ভালো মোচ্ছবে মেতে থাকতেন।

পাশাপাশি বেনিয়ান, মুৎসুদ্দি বা দেওয়ান হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করে অনেকেই তখন রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে ওঠেন। হাতে কাঁচা টাকা, কিন্তু আভিজাত্যের বনেদিয়ানা তখনও সেভাবে তৈরি হয়নি। ফলে নিজেদের প্রতিপত্তি জাহির করার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়াল লাগামহীন দেখনদারি। আর তার সূত্র ধরেই অশ্লীল অর্থের অপচয়।

সাংস্কৃতিক দিক থেকে এই সময়টা ছিল এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের। বাবুরা ইংরেজদের সঙ্গে ওঠাবসা করছেন, তাদের আদবকায়দা নকল করছেন, অথচ ভেতরে ভেতরে হিন্দুয়ানির জাত যাওয়ার ভয়ও তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এই দ্বিমুখী মানসিকতার সরাসরি প্রভাব পড়ল তাদের হেঁশেলে।

বাবুদের অন্দরমহল বনাম বাগানবাড়ির টানাপোড়েনে খাদ্যাভ্যাসের নতুন সমীকরণ

বাবু কালচারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল অন্দরমহল আর বাহির মহলের সম্পূর্ণ আলাদা দুটো ভিন্ন রূপ। অন্দরমহলের রান্নাঘরে সাবেকি হিন্দু রীতিনীতিতেই সবকিছু হত। এখানে বাবুরা বেজায় রক্ষণশীল। সেখানে পেঁয়াজ-রসুনের প্রবেশ নিষেধ। বাড়ির বিধবা পিসি-ঠাকুমারা কলাইয়ের ডাল, শুক্তো, ছ্যাঁচড়া আর ঘি-ভাত রেঁধে খেতেন। স্ত্রীদের অন্তঃপুরেই রাখা হত।

কিন্তু শহরের উপকণ্ঠে বাবুদের যে বাগানবাড়িগুলো তৈরি হয়েছিল, সেখানে সন্ধে নামলেই ফুটে উঠত অন্য ছবি। ব্রিটিশ সাহেব ও তাদের কর্মচারীরা আসতেন, বাঈজি নাচ হত। সেই আড্ডায় তো আর ছ্যাঁচড়া বা ধোঁকার ডালনা মানায় না! তাই বাবুরা নিয়োগ করলেন মুসলমান 'বাবুর্চি' এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বা পর্তুগিজ 'কুক'। তার হাত ধরেই জন্ম নিতে শুরু করল একের পর এক অতুলনীয় ফিউশন পদ।

সাহেবদের রসনা তৃপ্তি করে 'জাত' বাচানোর সংগ্রাম

বাবু কালচারের ইতিহাসে শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো এবং সাহেব আপ্যায়নের ঘটনা রীতিমতো মার্কামারা ব্যাপার হয়ে আছে। রবার্ট ক্লাইভ থেকে শুরু করে লর্ড হেস্টিংস, একের পর এক বড়লাট এসেছেন শোভাবাজার রাজবাড়ির এই পুজোয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, সাহেবদের জন্য বিশাল ভোজের আয়োজন হলেও, তাঁদের বাড়ির ভেতরের মূল দালানে বা ঠাকুরদালানের কাছাকাছি খেতে দেওয়া হত না।

আরও পড়ুন
পর্তুগিজদের হাত ধরে বাংলার রান্নাঘরে কাঁচালঙ্কার প্রবেশ!
অটোমান সুলতানের প্রিয় পদ চেটেপুটে খাচ্ছে বাঙালি!
ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে জন্ম নেয় কলকাতার ইহুদিদের এই লোভনীয় পদ!

শোভাবাজার রাজবাড়ির অন্দরমহলের হেঁশেল থাকত সম্পূর্ণ আলাদা। সাহেবদের জন্য বাড়ির বাইরে আলাদা তাঁবু খাটিয়ে বা খাস কামরায় টেবিল-চেয়ার পেতে খাওয়ানো হত। আরও মজার ব্যাপার হল, সাহেবদের জন্য খাবার আসত সেকালের বিখ্যাত স্পেন্সার্স বা উইলসন হোটেল থেকে! কখনও আবার স্পেশাল পর্তুগিজ শেফ ভাড়া করে আনা হত রোস্ট, পুডিং আর প্যাটিস বানানোর জন্য। জাত বাঁচিয়ে, অথচ সাহেবদের তুষ্ট করে বাবুয়ানির এ এক অভাবনীয় নিদর্শন ছিল।

এক্ষেত্রে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির কোথাও উল্লেখ করতে হবে। যদিও রবি ঠাকুরের পরিবার ঠিক প্রথাগত 'বাবু' বলতে যা বোঝায় তা ছিল না, কিন্তু ওনারাও ব্রিটিশদের সঙ্গে সখ্যতা রেখে নিজেদের জমিদারি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চালাতেন। কলকাতার খাদ্য সংস্কৃতিতে ঠাকুরদের অবদান অনস্বীকার্য। পিরালি ব্রাহ্মণ হওয়ার কারণে তাঁদের সামাজিক ছুঁৎমার্গ কিছুটা কম ছিল। ফলে প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর মতো মানুষের হাত ধরে দেশি এবং বিদেশি রান্নার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল ঠাকুরবাড়ির হেঁশেলে। সে সব পদ আজও বাঙালির জিভে জল এনে দেয়।

বাবুদের পাতে নতুন যা যা এল

এই বাবু কালচারের হাত ধরেই কলকাতার বুকে বেশ কিছু নতুন পদের জন্ম হয়, যা আক্ষরিক অর্থেই 'কলোনিয়াল হ্যাংওভার' এবং 'দেশি মশলার' এক তুফানি যুগলবন্দি।

চপ-কাটলেটের আবির্ভাব:

ব্রিটিশদের 'Cutlet' (মাংসের টুকরো) বাবুদের হেঁশেলে ঢুকে হয়ে গেল কিমার পুর ভরা, বিস্কুটের গুঁড়ো মাখানো, ডুবো তেলে ভাজা এক খাস্তা পদ। ফরাসি বা পর্তুগিজদের ক্রকেট (Croquette) থেকে জন্ম নিল বাঙালির সাধের 'চপ'।

কবিরাজি:

ব্রিটিশদের 'Coverage Cutlet' (ডিমের প্রলেপ দেওয়া) বাবুদের জিভের উচ্চারণে অপভ্রংশ হয়ে হলে গেল 'কবিরাজি'। বাকিটা সত্যিই ইতিহাস।

মোগলাই পরোটা:

নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ যখন মেটিয়াবুরুজে এলেন, তাঁর বাবুর্চিদের হাত ধরে কলকাতাতেও মোগলাই খানার চল শুরু হয়। বাবুরা সেই স্বাদ গ্রহণ করেছিল ঠিকই, কিন্তু তাকে নিজেদের মতো করে একটু বদলেও নেয়। ডিম আর কিমা ভরা মোগলাই পরোটা হয়ে ওঠে বাবুদের সান্ধ্যকালীন আড্ডার অন্যতম আকর্ষণ।

মিষ্টির বিপ্লব:

বাবুদের দেখনদারির আরেকটা বড় জায়গা ছিল মিষ্টি। ছানার ব্যবহার আগে নিষিদ্ধ হলেও, পর্তুগিজদের প্রভাবে বাবুরা ছানার মিষ্টি গ্রহণ করে। বাবুদের মনোরঞ্জনের জন্যই নবীনচন্দ্র দাস আবিষ্কার করেছিলেন 'রসগোল্লা', আর লর্ড ক্যানিংয়ের স্ত্রীর নামানুসারে ভীম চন্দ্র নাগ বানিয়েছিলেন 'লেডিকেনি'।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য