

জলভরা সন্দেশের সৃষ্টি মুহূর্তের প্রতীকী ছবি - AI
২৪শে আগস্ট, ২০২৬
বাঙালি মানেই বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর প্রতিটা পার্বণের সঙ্গেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে মিষ্টি। মিষ্টি ছাড়া বাঙালি ভাবাই যায় না। তবে বাংলার বিখ্যাত সব মিষ্টির নেপথ্য কাহিনীগুলো জানতে পারলে চমকে উঠবেন। স্রেফ জামাইকে বোকা বানানোর জন্য নাকি একটা আস্ত মিষ্টি আবিষ্কার হয়েছিল! এবং সেটা আজ অত্যন্ত বিখ্যাত।
১৮১৮ সাল। ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগরের গায়ে গা লাগিয়ে অবস্থান ভদ্রেশ্বরের। সেখানকার তেলিনিপাড়ার জমিদার বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে সাজসাজ রব। সদ্য বিবাহিত মেয়ে-জামাই আসবে। জামাই বাবাজীবন আবার বৈদ্যবাটির নামকরা জমিদার বাড়ির ছেলে। টাকা আর আভিজাত্যের তো কোনও অভাব নেই। তাহলে তাঁকে চমকে দেওয়া যায় কীভাবে? প্রথম জামাইষষ্ঠী বলে কথা।
এই নিয়ে সাত সতেরো ভাবতে ভাবতে তেলিনিপাড়ার জমিদারের মাথায় চাপল এক অদ্ভুত খেয়াল। জামাইকে ঠকাতে হবে। এমনভাবে ঠকাতে হবে, যাতে সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, অথচ রাগের বদলে মুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি।
ডাক পড়ল চন্দননগরের নামকরা ময়রা সূর্যকুমার মোদকের। জমিদার নির্দেশ দিলেন, "এমন একটা মিষ্টি বানাও, যা দেখতে হবে একেবারেই সাধারণ, কিন্তু খেতে গেলেই চমক লাগবে!"
সূর্যকুমার মোদক পড়লেন মহা ফাঁপরে। দিনরাত এক করে ভাবতে বসলেন। অনেক ভেবে চিন্তে শেষে একটা বিষয় পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ছানা নিয়ে শুরু হল তাঁর নতুন এক মিষ্টি তৈরির পরীক্ষা।
কড়া পাকের সন্দেশ তৈরি করলেন সূর্যকুমার। আকার দিলেন ঠিক তালের শাঁসের মতো। কিন্তু আসল ম্যাজিকটা লুকিয়ে রাখলেন সন্দেশের একেবারে গভীরে। ভেতরে পুরে দিলেন খাঁটি, সুগন্ধি গোলাপজল। বাইরে থেকে বোঝার কোনও উপায়ই নেই যে ভেতরে এমন এক তরল বিস্ময় চুপিচুপি অপেক্ষা করছে।
অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। রুপোর থালায় থরে থরে সাজানো রকমারি মিষ্টি। মাঝখানে বেশ বড়সড়, নিরীহ দর্শন সেই তালশাঁস সন্দেশ। জামাই বাবাজীবন তো কিছুই জানেন না। তিনি জমকালো দামি সিল্কের পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে খেতে বসেছেন। শালপাতার ওপর রাখা সেই সন্দেশ তুলে বেশ আয়েস করে সবে এক কামড় বসিয়েছেন... ব্যস! ফিনকি দিয়ে ছিটকে এল সুগন্ধি গোলাপজল। দামি সিল্কের পাঞ্জাবি তো ভিজলই, সঙ্গে জামাই বাবাজীবনেরও চক্ষু চড়কগাছ। আর তাঁর সেই গোবেচারি মুখ দেখে চারদিকে তখন হাসির রোল।
এদিঊ রাগ করার বদলে নতুন ধরনের মিষ্টির অপূর্ব স্বাদে আর এমন অভিনবত্বে মুগ্ধ হয়ে যান। এভাবেই জন্ম হয় বাংলার কিংবদন্তি মিষ্টি 'জলভরা সন্দেশ'-এর।
এই জলভরার নেপথ্যে সূর্যকুমারের যে কারিগরি দক্ষতা ছিল, তা আজকের দিনের ফুড-ইঞ্জিনিয়ারিংকেও হার মানায়। কড়া পাকের ছানার ভেতরে তরল আটকে রাখা মুখের কথা নয়। ছানার দেয়াল একটু পাতলা হলেই লিক করে যাবে, আবার বেশি মোটা হলে স্বাদ নষ্ট হবে। এই নিখুঁত ব্যালেন্সটাই সূর্য মোদকের সিগনেচার।
আর এখানেই আসে সেই বিখ্যাত কিংবদন্তি। শোনা যায়, সূর্যকুমারের এই সৃষ্টি যখন কলকাতায় নকল হতে শুরু করল, তখন নাকি এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। অন্য ময়রাদের তৈরি জলভরা নাকি ট্রে-তে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারত না। তরলের ভারে আর পাকের দোষে তাদের শুইয়ে রাখতে হত।
আর সূর্য মোদকের জলভরা? সে আজও চন্দননগরের দোকানে বুক চিতিয়ে, সগর্বে লম্বালম্বি দাঁড়িয়ে থাকে। প্রচলিত আছে, ভদ্রেশ্বরের সেই তেলিনিপাড়ার জমিদারের আশীর্বাদেই নাকি এমনটা ঘটেছে। তিনি সূর্য মোদককে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, তোমার জলভরাই কেবল দাঁড়িয়ে থাকবে। বাকিদের সব শুয়ে পড়বে!
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলভরায় এসেছে বদল। সারা বছর গোলাপজল বা কেশর-জল থাকলেও, শীতকাল এলেই গোলাপজলের জায়গা দখল করে নেয় তরল নলেন গুড়। এখন তো শুধু চন্দননগর নয়, গোটা বাংলা জুড়েই জলভরার রমরমা। কেক-পেস্ট্রির যুগেও বাঙালি শীতের দুপুরে একটা নলেন গুড়ের জলভরা দেখলে আর লোভ সামলাতে পারে না।
দুই শতকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ফরাসিরা চন্দননগর ছেড়েছে কবেই। তেলিনিপাড়ার জমিদারদের সেই রবরবাও আর নেই। কিন্তু সূর্যকুমার মোদক রয়ে গেছেন। তাঁর সেই ছোট্ট দোকানটা আজ একটা আস্ত প্রতিষ্ঠান।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
