১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
পাল যুগ থেকে ঔপনিবেশিক বাংলায় বিয়ের ভোজের বিবর্তন

বাঙালি বিয়ের ভোজের বিবর্তন। ছবি - AI

পাল যুগ থেকে ঔপনিবেশিক বাংলায় বিয়ের ভোজের বিবর্তন

calender icon 2 ৩১শে আগস্ট, ২০২৬

মূল বিষয়

আজকের দিনে বাঙালি বিয়েবাড়ি মানেই আলো-ঝলমলে মণ্ডপ। সেইসঙ্গে বিরিয়ানির ম-ম করা সুঘ্রাণ। কিন্তু আজ থেকে হাজার বছর আগের বাংলার বিয়ের ভোজ ঠিক কেমন ছিল? তখন তো আজকের মতো কোন‌ও ক্যাটারার ছিল না। ছিল না বুফে।

পাল সাম্রাজ্যের সময় থেকে গত শতাব্দীর গোড়ার দিক পর্যন্ত কীভাবে ধাপে ধাপে বাঙালির বিয়ের ভোজ, তার পরিবেশনের ধরন বারেবারে বদলেছে, পদে ফিউশন ঘটেছে, নতুন সংযোজন হয়েছে সেই দিকে এক ঝলক তাকিয়ে দেখা যাক। এর পরের অধ্যায়গুলোর সঙ্গে আমরা বরং কম বেশি পরিচিত। এক্ষেত্রে গোড়াতেই বলে রাখা ভালো- বাঙালি বিয়ের ভোজের এই পরিবর্তনের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে সমাজ, ধর্ম আর অর্থনীতির এক দুর্দান্ত মিশেল। এক্ষেত্রে আমরা শুরুর সময় যেটা ধরেছি, সেই তখন থেকে শেষের সময় এসে দেখবেন গোটাটাই পুরো বদলে গেছে!

মাটির গন্ধ বনাম রাজকীয় আড়ম্বর

প্রাচীন বাংলার কথা উঠলেই চর্যাপদ বা ভবদেব ভট্টের স্মৃতিশাস্ত্রের পাতা উল্টোতে হয়। সেই সময় বঙ্গ সমাজ ছিল পুরোপুরি কৃষি নির্ভর। সাধারণ প্রজা বা কৃষিজীবীদের বিয়ের ভোজে খুব একটা চাকচিক্য ছিল না। বরং ছিল আটপৌরে মাটির গন্ধ। শালি ধানের লাল চালের ভাত, সঙ্গে একটু কাঁজি বা গাঁজানো চালের জল।
বড়জোর পুঁটি, মৌরলা, খলসের মতো ছোট মাছ বা শামুক-কাঁকড়ার ঝোল। আর মিষ্টি বলতে স্রেফ আখের বা খেজুরের গুড়। সঙ্গে বড়জোর নারকেলের নাড়ু। বিয়ের ভোজে এর বেশি কিছু করাটা পাল বা সেন বংশের শাসনামলে গ্রামবাংলার সাধারণ বাঙালির পক্ষে সম্ভব ছিল না।

কিন্তু ওই সময়ে রাজপরিবার বা অভিজাত পরিবারের বিয়ের ভোজের ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে ভোজের আসরে শোভা পেত সুগন্ধি সরু চালের ভাত। রান্নায় পড়ত কর্পূর আর এলাচ। রুই, কাতলা, চিতল তো বটেই, রাজকীয় ভোজে হরিণ, ছাগল বা ভেড়ার মাংসের বিশেষ চল ছিল। শেষ পাতে আসত খাঁটি চিনির খণ্ড, মালপোয়া আর গাঢ় দুধের ক্ষীর।

ধর্মভেদেও ছিল স্পষ্ট ফারাক। পাল রাজারা ছিলেন মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বৌদ্ধ ধর্মে অহিংসার বাণী থাকলেও, বাঙালি বৌদ্ধদের বিয়ের ভোজে মাছ-মাংস একেবারেই ব্রাত্য ছিল না। তবে একাদশ-দ্বাদশ শতকে সেন যুগে, ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থানের পর নিয়ম বেশ কঠোর হয়। উচ্চবর্ণের হিন্দুদের জন্য মুরগি, পেঁয়াজ, রসুন খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। মাংস বলতে কেবল ঈশ্বরের সামনে বলিকৃত পাঁঠার মাংসই ছিল শাস্ত্রসম্মত। মানে সেটা খাওয়ায় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ছাড়পত্র ছিল। তবে উত্তর ভারতের মতো বাংলার ব্রাহ্মণদের মাছ খাওয়া কিন্তু সেন যুগে নিষিদ্ধ ছিল না। ভবদেব ভট্ট রীতিমতো শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেছিলেন, বাঙালির ভোজে মাছ চলতেই পারে। সেই থেকে বাংলার হিন্দু বিয়েতে মাছ এক অপরিহার্য ও মঙ্গলজনক পদে পরিণত হয়। তবে নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা স্বাভাবিক মাংস খেতে পারত।

পোলাওয়ের প্রবেশ ও নবাবি সুবাস

সেন বংশের অবসানের পর চতুর্দশ শতকে বাংলায় সুলতানি শাসন কায়েম হয়। এই পরিবর্তনের হাত ধরে বাংলার খাদ্য রীতিতে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে যায়। পারস্য আর মধ্য এশিয়ার হাওয়া এসে ধাক্কা মারে বাংলার রন্ধনশৈলীতে। সেই প্রথম বাঙালি হিন্দু আর মুসলিম অভিজাতদের বিয়ের ভোজের মেনুতে একটা সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা তৈরি হয়।

মুসলিম অভিজাত পরিবারের ভোজে সাধারণ ভাতের একাধিপত্য খর্ব করল সুগন্ধি 'পিলাউ' বা পোলাও। উজবেক সহ মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলিম শাসকদের হাত ধরে বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের বিয়ের ভোজের মেনুতে ঢুকে পড়ে গরুর মাংস, দুম্বা আর মোরগ-মুসাল্লম। রান্নায় পেঁয়াজ, রসুন, জাফরান, কেওড়া আর গোলাপ জলের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। কাবাব, কোর্মা আর কোফতার সুবাসে ম-ম করতে থাকে বিয়ের আসর।

অন্যদিকে, চণ্ডীমঙ্গলের মতো কাব্যে দেখা যায়, হিন্দু জমিদারদের ভোজে তখনও সাবেকিয়ানার জয়জয়কার ছিল। পঞ্চাশোর্ধ পদের উল্লেখ পাওয়া যায় সেখানে। শুরু হত তেতো বা শুক্তো দিয়ে। তারপর পঞ্চব্যঞ্জন, মুগ ডাল, ঘণ্ট আর মাছের নানা পদ। শাক্তদের ভোজে গাওয়া ঘি আর আদা-জিরে দিয়ে রাঁধা বলির পাঁঠার নিরামিষ মাংস ছিল আবশ্যিক। ফলে বুঝতেই পারছেন, বাঙালি হিন্দুদের ফাইন ডাইনিং ধারণাটি ঠিক কীভাবে ধারাবাহিকভাবে বয়ে চলেছে।

আরও পড়ুন
জামাই ঠকাতে জন্ম হয়েছিল জলভরা সন্দেশের!
বাঙালির হেঁশেলের সেকাল: পাল-সেন-সুলতানি যুগের ফুড কালচার
উড়িয়া ঠাকুরদের হাতের জাদুতে বদলে গেল বাঙালির হেঁশেল
পর্তুগিজদের হাত ধরে বাংলার রান্নাঘরে কাঁচালঙ্কার প্রবেশ!

এদিকে শ্রীচৈতন্য পরবর্তী যুগে বৈষ্ণব অভিজাতদের বিয়ের ভোজ হয়ে যায় পুরোপুরি নিরামিষ। সেখানে মূলত ধোঁকা, ছানার ডালনা আর দুধ-ক্ষীরের রকমারি মিষ্টি থাকত। হিন্দু ভোজে পেঁয়াজ-রসুন তখনও চরম অচ্ছুৎ ছিল।

এদিকে মুসলিম অভিজতদের বিয়ের ভোজের নবাবিয়ানার প্রায় কিছুই সাধারণ গরিব মুসলমান বা হিন্দুর কুঁড়েঘর পর্যন্ত পৌঁছয়নি। নিম্নবিত্ত হিন্দু বা ধর্মান্তরিত মুসলিমদের বিয়ের ভোজে সেই মোটা চালের ভাত, পুকুরের ছোট মাছ, লাউ-কুমড়ো আর দই-গুড়ই রয়ে গিয়েছিল।

অঞ্চলভেদে পদের বৈচিত্র্য

অষ্টাদশ শতক থেকে বিংশ শতকের গোড়া পর্যন্ত অখণ্ড বাংলায় ভৌগোলিক বৈচিত্র্য অনুযায়ী বিয়ের ভোজে এক অদ্ভুত বদল এল। এলাকা বদলালেই বদলে যেত পদ আর পরিবেশন।

পূর্ববঙ্গে, বিশেষত ঢাকা ও সংলগ্ন নদীমাতৃক অঞ্চলে রান্নায় মশলা আর তেলের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। ইলিশ, চিতল আর কৈ ছাড়া সেখানে বিয়ের ভোজ ছিল অসম্পূর্ণ। ঢাকার নবাবদের প্রভাবে কাচ্চি বিরিয়ানি, মোরগ পোলাও আর বোরহানি ধীরে ধীরে পূর্ববঙ্গের অভিজাত হিন্দু ভোজেও উঁকি দিতে শুরু করে।

আবার রাঢ়বঙ্গ, অর্থাৎ বর্ধমান, বাঁকুড়া বা বীরভূমের দিকে নদী কম। তাই সেখানে বিয়ের ভোজে ডাল, বড়ি, পোস্ত আর ঘিয়ের চল বেশি ছিল। এই অঞ্চলে বিয়ে উপলক্ষে যে ভোজের আসর বসত তার আসল আকর্ষণ ছিল মিষ্টি। সীতাভোগ, মিহিদানা বা মেদিনীপুরের বাবরসা ছাড়া রাঢ়বঙ্গের বিয়ে ভাবাই যেত না।

উত্তরবঙ্গে আবার সর্ষের তেলের কড়া ঝাঁঝ আর স্থানীয় বোরোলি বা তিস্তার স্থান মাছের কদর ছিল সবথেকে বেশি। এগুলো ওখানকার বিয়ের ভোজের আবশ্যিক পদ ছিল।

কিন্তু সবচেয়ে বড় ফিউশনটা ঘটছিল খাস কলকাতায়। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হওয়ায় এখানে ইংরেজ সংস্কৃতির সাথে বনেদি বাড়ির অদ্ভুত এক মেলবন্ধন ঘটে। সাধারণ হিন্দু পরিবারে তখনও বিয়ে উপলক্ষে কলাপাতা বা শালপাতায় মাটিতে শতরঞ্জি পেতে খাওয়ার চল, রান্নার দায়িত্বে থাকত পাড়ার পিসি-মাসিরা। কিন্তু শোভাবাজার রাজবাড়ি বা ছাতুবাবু-লাটুবাবুদের মতো জমিদার বাড়িতে বাবুয়ানির হাত ধরে সবকিছুই বদলে যায়।

রান্নার জন্য ওড়িশা থেকে নিয়ে আসা শুরু হয় বংশানুক্রমিক ওড়িয়া 'মহারাজ' বা ঠাকুরদের। এদের হাতেই পরবর্তী শতাব্দী জুড়ে এইসব বাবু পরিবারের বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের রান্নার দায়িত্ব ছিল। সাহেব অতিথিদের জন্য বরফ নিয়ে আসা হত বিদেশ থেকে। বিরাট বিরাট সব রুই-কাতলা কাটা হত। আর বাইরের অতিথিদের জন্য ইউরোপীয় আদলে তৈরি হত ফিশ ফ্রাই, ফিশ কবিরাজি, কাটলেট বা চপ। এগুলো বর্তমানে বাঙালির বিয়ের ভোজের স্টার্টার হিসেবে অনেকটাই নিজের জায়গা ধরে রেখেছে।

ছানার বিপ্লব ও নিরামিষ মাংস

বাঙালির বিয়ের ভোজের এই বিপুল বিবর্তননের মধ্যে দুটি চূড়ান্ত ব্যতিক্রমী ঘটনা বাংলার খাদ্যাভ্যাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। প্রথমটি হল 'ছানা'। প্রাচীনকাল থেকে হিন্দু সমাজে দুধ কেটে যাওয়া অংশ বা 'ছানা' চরম অশুভ বলে বিবেচিত হত। দেবকার্যে বা বিয়ের মতো পবিত্র অনুষ্ঠানে তা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফলে একটা সময় পর্যন্ত বাঙালির কাছে মিষ্টি বলতে ছিল কেবল ক্ষীর বা নারকেল। কিন্তু পর্তুগিজদের দেখাদেখি নবদ্বীপ ও কলকাতার ময়রাদের হাত ধরে বাংলায় যখন ছানার মিষ্টি তৈরি শুরু হয়, তখন সব শাস্ত্রীয় নিষেধ জিভের স্বাদের বিপুল চাহিদার কাছে ভেসে যায়। রসগোল্লা আর সন্দেশ হয়ে ওঠে বাঙালির বিয়ের ভোজের অবিসংবাদিত সম্রাট।

দ্বিতীয়টি হল 'নিরামিষ পাঁঠার মাংস'। বনেদি হিন্দু পরিবারগুলিতে পেঁয়াজ-রসুন নিষিদ্ধ থাকায়, তারা এমন এক রন্ধনশৈলী আবিষ্কার করেছিল যা আজও বিস্ময়কর। আদা, জিরে, ধনে, হিং, টকদই আর খাঁটি গাওয়া ঘিয়ে রাঁধা সেই মাংসের স্বাদ হার মানাত যে কোনও মোগলাই কোর্মাকেও।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য