১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
ষাঁড়ের মূত্র খাইয়ে শুদ্ধিকরণ! কলকাতার পার্সিদের সব রহস্যময় প্রথা

কলকাতার পার্সি সমাজের রহস্যময় প্রথার প্রতীকী ছবি - AI

ষাঁড়ের মূত্র খাইয়ে শুদ্ধিকরণ! কলকাতার পার্সিদের সব রহস্যময় প্রথা

calender icon 2 ৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মূল বিষয়

কল্লোলিনী কলকাতার অলিগলিতে কান পাতলে আজও শোনা যায় নানা ভাষা, নানা সংস্কৃতির ফিসফাস। যুগ যুগান্ত থেকে কত জাতিই না এসেছে এখানে। পর্তুগিজ, ইংরেজ, আর্মেনীয়, গ্রিক, ইহুদি, চিনা সবাই মিলে একটা সময় কলকাতাকে আক্ষরিক অর্থেই এক আন্তর্জাতিক ‘মেল্টিং পট’-এ পরিণত করেছিল। কালের নিয়মে এদের কেউ প্রয়োজন শেষে পাততাড়ি গুটিয়েছে, আবার কেউ কলকাতার প্রাণের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। কিন্তু বাইরে থেকে কলকাতায় আগতদের মধ্যে যদি কাউকে সবচেয়ে অবরুদ্ধ, রহস্যময় আর কৌতূহলোদ্দীপক বলতে হয়, তবে সেই তালিকায় একেবারে প্রথমে থাকবে পার্সি-রা।

যুগ যুগ ধরে বাঙালির প্রতিবেশী হয়েও তারা যেন এক অদৃশ্য দেওয়ালের ওপাশে বাস করে। তাদের ধর্ম, প্রথা এবং নিজস্ব আচার-আচরণের এমন কিছু দিক রয়েছে, যা আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে শুনলে বা জানতে পারলে রীতিমতো গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে!

যেভাবে কলকাতায় পার্সি'রা

১৭৬৭ সালে সুরাট থেকে বাণিজ্যের তাগিদে কলকাতায় এসে পৌঁছন দাদোভাই বেহরামজি বানাজি। তিনিই ছিলেন এই শহরে পা রাখা প্রথম পার্সি। এরপর রুস্তমজি কাওয়াসজি বানাজির হাত ধরে উনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতায় পার্সিদের রমরমা শুরু হয়। জাহাজ নির্মাণ, আফিমের ব্যবসা থেকে শুরু করে রিয়েল এস্টেট- সব মিলিয়ে শহরের ব্যবসা-বাণিজ্যে তারা একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এজরা স্ট্রিট, বউবাজার, মেটকাফ স্ট্রিট হয়ে ওঠে তাদের মূল আস্তানা।

সমাজের উঁচু তলায় পার্সিদের ছিল অবাধ বিচরণ। টাটা বা ওয়াদিয়াদের মতো আধুনিক মনস্ক পার্সি ব্যবসায়ী পরিবারের উত্থান সবই চোখের সামনে ঘটেছে। কিন্তু বহিরঙ্গের এই আধুনিকতার আড়ালেই তারা সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিল হাজার হাজার বছরের পুরোনো কিছু চরম রক্ষণশীল ও চাঞ্চল্যকর গুপ্ত প্রথা।

মেটকাফ স্ট্রিটের নিষিদ্ধ ফায়ার টেম্পল ও পবিত্র আগুন

মধ্য কলকাতার মেটকাফ স্ট্রিটের কোলাহলের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে পার্সিদের উপাসনালয় ‘অগিয়ারি’ বা ফায়ার টেম্পল। কিন্তু সাবধান! ভেতরে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। পার্সিরা বাইরের মানুষদের ‘জুদ-দিন’ বা বিধর্মী বলে মনে করে। একজন অ-পার্সির এই মন্দিরের মূল অংশে প্রবেশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি কোনও বহিরাগতের ছায়াও যদি পবিত্র আগুনের উপর পড়ে, তারা মনে করে আগুন অপবিত্র হয়ে গেছে। তাই তারা মন্দিরের মূল অংশে তাদের সেই পবিত্র আগুন, যা কোন‌ও সময়‌ই নেভে না, সেটাকে রীতিমতো লুকিয়ে রাখে।

সবচেয়ে রোমহর্ষক বিষয় হল এই ফায়ার টেম্পলের সর্বোচ্চ স্তরের আগুন, যাকে বলা হয় ‘আতাশ বেহরাম’, তা তৈরির প্রক্রিয়া। এই আগুন ১৬টি ভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হয়, যার মধ্যে বজ্রপাতের আগুনের পাশাপাশি থাকে হিন্দু বা অন্য ধর্মের মানুষের শবদেহ দাহ করার শ্মশানের চিতার আগুন! জ্বলন্ত চিতা থেকে অত্যন্ত গোপনে পার্সিরা সেই আগুন সংগ্রহ করে। তারপর সেই আগুন থেকে কাঠের খণ্ড জ্বালায়। সেই কাঠের খণ্ড থেকে আবার আগুন সংগ্রহ করে তা দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ৯১ বার শুদ্ধ করে তবেই উপাসনালয়ে স্থাপন করা হয়!

শকুন, চার-চোখা কুকুর ও একঘরে শববাহক

বেলেঘাটা ক্রসিংয়ের কাছে (ফুলবাগান এলাকায়) রয়েছে পার্সিদের নিজস্ব সমাধিক্ষেত্র। এখানেই অবস্থিত তাদের 'টাওয়ার অফ সাইলেন্স' বা 'দখমা'। পার্সিরা মৃতদেহ পোড়ায় না বা কবরও দেয় না। তাদের বিশ্বাস আগুন ও মাটি পবিত্র। তাই মৃতদেহ কবর দেওয়া বা আগুনে পোড়ানো মানে মাটি ও আগুনকে অপবিত্র করে ফেলা। এটা পার্সিদের কাছে মহাপাপ। তাই তারা দখমার (বিশেষ ধরনের টাওয়ার) উঁচু কাঠামোর উপর খোলা আকাশের নিচে মৃতদেহ রেখে আসে, যাতে শকুন তা খেতে পারে। এভাবেই পার্সিরা মৃতদেহ সৎকর করে।

কেউ মারা গেলে তার সৎকার শুরু করার আগে পার্সিদের আরও একটি চাঞ্চল্যকর প্রথা আছে। তা হল ‘সাগদিদ’ বা চার-চোখা কুকুরের দৃষ্টি! মৃতদেহ দখমায় নেওয়ার আগে দুই চোখের উপর দুটি বিশেষ দাগ থাকা একটি কুকুরকে মৃতদেহের সামনে আনা হয়। পার্সিদের বিশ্বাস, মৃত্যুর পর দেহে অশুভ পিশাচ (দ্রুজ-ই-নাসুশ) ভর করে। এই বিশেষ কুকুরটি যদি মৃতদেহের দিকে না তাকায়, তবে ধরে নেওয়া হয় পিশাচ তখনও দেহে রয়ে গেছে! ফলে তখনকার মতো সাময়িকভাবে সৎকারের প্রক্রিয়া থেমে যায়। আর কুকুরটি যদি মৃতদের দিকে তাকায়, তাহলে ধরে নেওয়া হয় সেই পিশাচ মৃতদেহ ছেড়ে চলে গিয়েছে।

আরও পড়ুন
নস্টালজিয়ার পথ ধরে কলকাতার ট্রামের অজানা অতীত
কলকাতার ব্র্যাবোর্ন রোডের নিচে জলদস্যুদের সুড়ঙ্গ!
দেশে বেনামি সম্পত্তির ‘প্রাণপুরুষ’ কুমোরটুলির গোবিন্দরাম মিত্র!

এখানেই শেষ নয়। যারা এই মৃতদেহ বহন করেন, সেই ‘নাসেসালা’ বা শববাহকদের জীবন চরম দুখঃজনক হয়। মৃতদেহ ছোঁয়ায় পার্সি সমাজই তাদের অস্পৃশ্য বলে গণ্য করে। সাধারণ পার্সিদের সঙ্গে তাদের মেলামেশা বা সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। তাদের বিয়েও হয় নিজেদের সম্প্রদায়ের অন্যান্য শববাহক পরিবারের মধ্যেই। অথচ এই শববাহকরাও পার্সি ধর্মেরই হয়ে থাকে। এই প্রথা পার্সিদের চরম অন্ধত্ব ও জাতিগত বৈষম্যের দিকে ইঙ্গিত করে।

ষাঁড়ের মূত্র ও মধ্যরাতের গুপ্ত উপাসনা

আধুনিকতার মোড়কে থাকা পার্সি সমাজের অন্দরে উঁকি দিলে এমন কিছু আচারের দেখা মেলে, যা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে শুধু বিশ্বাস করাই অসম্ভব নয়, রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। যেমন ‘গোমেজ’ বা ‘নিয়ঁরং’। এটি হল মন্ত্রপূত সাদা ষাঁড়ের মূত্র! নবজাতকের নামকরণ থেকে শুরু করে গুরুতর পাপ থেকে মুক্তি, যে কোনও দীর্ঘ শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ায় (‘বরেশনুম’) এই ষাঁড়ের মূত্র শরীরে লেপন করা হয়, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পানও করানো হয়!

ঋতুমতী নারীদের প্রতিও পার্সিদের দৃষ্টিভঙ্গিও চরম রক্ষণশীল। প্রাচীন রীতি অনুযায়ী, ঋতুস্রাবকে অশুভ শক্তির প্রভাব হিসেবে দেখা হতো। আগেকার দিনে কলকাতার পার্সি পরিবারগুলোতে এই সময়ে নারীদের একটি প্রায়ান্ধকার ঘরে একঘরে করে রাখা হতো। আগুন, জল বা গাছপালা ছোঁয়ার অধিকার তাদের ছিল না। আজও ঋতুমতী নারীদের উপাসনালয়ে প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি ঋতুমতী নারীকে দূর থেকে খেতে দেওয়া হয়, যাতে সে স্পর্শ করে ফেলতে না পারে।

এর পাশাপাশি রয়েছে মধ্যরাতের গুপ্ত উপাসনা ‘ভেন্ডিদাদ’। অশুভ পিশাচদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক এই আচার দিনের বেলায় করা নিষিদ্ধ। মধ্যরাত থেকে ভোরের মধ্যে মন্দিরের একেবারে গোপন প্রকোষ্ঠে এটি সম্পন্ন হয়, যেখানে সাধারণ পার্সিদেরও প্রবেশাধিকার নেই। এমনকি তাদের আহার গ্রহণের সময়কার ‘বাজ’ প্রথাও বেশ অদ্ভুত। খাবার খাওয়ার আগে মন্ত্র পড়ে শুরু হয় সম্পূর্ণ নৈঃশব্দ্য। খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটা শব্দ করাও বারণ, পাছে অশুভপ শক্তি মুখ দিয়ে শরীরে ঢুকে পড়ে!

আবার নিজেদের চুল বা নখ কাটার পর তা যেখানে-সেখানে ফেলাও নিষেধ। ‘নাসু’ বা এই মৃত অংশগুলো ব্যবহার করে কেউ যাতে কালো জাদু করতে না পারে বলে পার্সিরা বিশ্বাস করে। তার জন্য বিশেষ মন্ত্র পড়ে এই কাটা চুল ও নক গর্তে পুঁতে রাখার গুপ্ত প্রথা আজও অনেক গোঁড়া পরিবার মেনে চলে।

রক্তের বিশুদ্ধতা এবং বৈষম্যের অদৃশ্য শৃঙ্খল

পার্সিরা ধর্মান্তরে বিশ্বাসী নয়। নিজেদের রক্তধারা টিকিয়ে রাখতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে। দীক্ষার পর থেকে প্রত্যেক পার্সিকে সারাজীবন একটি সাদা সুতির জামা (সুদ্রেহ) এবং পবিত্র সুতো (কুস্তি) পরতে হয়। এই কুস্তি খোলার এবং বাঁধার মন্ত্র ও নিয়ম বাইরের জগতের কাছে সম্পূর্ণ গোপন থাকে।

কিন্তু এই সমাজকাঠামোর ভেতরেই রয়েছে চরম বৈষম্য। তাদের ধর্মীয় ব্যবস্থা পুরোহিত শ্রেণির (অ্যাথোরনান) কুক্ষিগত। একজন সাধারণ পার্সি যতই জ্ঞানী হোন না কেন, তিনি কখন‌ওই পুরোহিত হতে পারবেন না।

সবচেয়ে বড় বৈষম্যটি হল মিশ্র বিবাহের ক্ষেত্রে। কোনও পার্সি পুরুষ যদি অ-পার্সি মহিলাকে বিয়ে করেন, তবে তাঁর সন্তানরা পার্সি হিসেবে স্বীকৃতি পান। কিন্তু কোনও পার্সি নারী যদি অ-পার্সি পুরুষকে বিয়ে করেন, তবে তাঁকে সমাজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পর দখমায় জায়গা হয় না, তাঁর সন্তানদেরও পার্সি বলে মানা হয় না। এই লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে কলকাতার পার্সি সমাজেও দীর্ঘ আইনি ও সামাজিক লড়াই চলেছে, কিন্তু কট্টরপন্থীরা আজও তাদের ভাবনায় অনড়।

আজকের কলকাতায় ফুরিয়ে আসা একটি অধ্যায়

বর্তমান কলকাতায় পার্সিদের সংখ্যা কমতে কমতে মেরেকেটে তিনশো থেকে চারশোতে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে বা মুম্বাইয়ে। এজরা স্ট্রিটের পার্সি পাড়া আজ বলতে গেলে অতীত স্মৃতির ভারে ন্যুব্জ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বো ব্যারাক বা ট্যাংরার চিনাদের মতো তারা কিন্তু কখন‌ওই কলকাতার আমজনতার সঙ্গে মিশে যায়নি। ব্যবসার খাতিরে অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে করমর্দন করেছে ঠিকই, কিন্তু দিনের শেষে নিজেদের গোপনীয় নিয়ম-কানুনগুলোকেই আঁকড়ে থেকেছে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য