

কালীপ্রসন্ন সিংহ। ছবি - Google
৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তখন উনিশ শতক। কলকাতার এক অন্যরকম রঙিন ছবি। একদিকে নবজাগরণের আলো এসে পড়ছে শহরের বুকে। অন্যদিকে বাবু কালচারের চূড়ান্ত আস্ফালন। বলা ভালো বাবু কালচারের নামে দেদার ফুর্তি, অর্থের অপচয় আর বিপুল বিলাসের এক অজানা-অচেনা ঘটমান বাস্তব প্রত্যক্ষ করছে কলকাতার মানুষ। এই দুইয়ের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক বিস্ময়কর প্রতিভা। কালীপ্রসন্ন সিংহ। চেনার সুবিধার্থে বলা, ইনিই মহাভারত বাংলায় অনুবাদের কাণ্ডারী।
মাত্র তিরিশ'টা বছর এই পৃথিবীর বুকে বেঁচে ছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। কিন্তু এইটুকু সময়ের মধ্যেই তিনি যা করে গিয়েছেন, তা আক্ষরিক অর্থেই ইতিহাস। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এই প্রবাদপ্রতিম মানুষটির শেষ জীবন কেটেছিল চরম দুর্দশায়। জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত সিংহ পরিবারের বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়েও মৃত্যুর আগে তিনি সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে যান। এমনকি খাওয়ার পয়সাটুকু বলতে গেলে ছিল না!
কালীপ্রসন্নের পৈতৃক সম্পত্তির ভিত তৈরি হয়েছিল বেশ কয়েক প্রজন্ম আগে। তাঁদের পৈতৃক ভিটে ছিল হুগলি জেলার বোড়াই গ্রামে। পরিবারের উত্থানের মূল কারিগর ছিলেন শান্তিরাম সিংহ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন এক মানুষ। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
শান্তিরাম পাটনার রেভিনিউ চিফ টমাস রামবোল্ডের দেওয়ান হিসেবে নিযুক্ত হন। এখান থেকেই সিংহ পরিবারের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। প্রভূত অর্থ এবং ক্ষমতার অধিকারী হন শান্তিরাম। এরপর তিনি কলকাতায় এসে জোড়াসাঁকো অঞ্চলে বিশাল জমি কেনেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে প্রাণকৃষ্ণ সিংহ এই বিপুল সম্পত্তির মালিক হন।
তিনিও ছিলেন বাবার মতোই বিষয়বুদ্ধিসম্পন্ন। প্রাণকৃষ্ণের পর সম্পত্তির অধিকারী হন তাঁর দত্তক পুত্র নন্দলাল। এই নন্দলাল সিংহই হলেন কালীপ্রসন্ন সিংহের বাবা। বাবার মৃত্যুর পর অল্প বয়সেই এক বিশাল জমিদারির একমাত্র উত্তরাধিকারী হন কালীপ্রসন্ন। ওড়িশা এবং বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তখন তাঁদের জমিদারি। খাস কলকাতাতেই তাঁদের বহু বড় বড় সম্পত্তি ছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল- আজকের বিখ্যাত বেঙ্গল ক্লাব যেখানে দাঁড়িয়ে সেই জমিও।
অগাধ সম্পত্তি হাতে পেয়ে কালীপ্রসন্ন কিন্তু সাধারণ বাবুদের মতো কেবল মদ আর বাইজিতে ডুব দেননি। তাঁর নেশা ছিল সাহিত্য এবং সমাজ সংস্কার। কিন্তু মুশকিল হল, তাঁর কোনও নির্দিষ্ট হিসেববোধ ছিল না। যখন যা মনে হত, দু'হাত উপুড় করে খরচ করতেন।
হিসেব না করে খরচের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল মহাভারত অনুবাদের কাজ। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি সংস্কৃত মহাভারত বাংলায় অনুবাদের এক দুঃসাধ্য প্রজেক্ট হাতে নেন। সাতজন বড় বড় পণ্ডিতকে নিয়োগ করেন। দীর্ঘ আট বছর ধরে কাজ চলে বরাহনগরের বাগানবাড়িতে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য তাঁর খরচ হয়েছিল সেকালের প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা! চমকের এখানেই শেষ নয়। সতেরোটি খণ্ডে প্রকাশিত এই মহাভারতের প্রতিটি খণ্ডের প্রায় তিন হাজার কপি তিনি বিনামূল্যে সাধারণ মানুষকে বিতরণ করেন! এমনকি বাইরে থাকা কেউ ডাকযোগে নিতে চাইলে, তার খরচও কালীপ্রসন্ন নিজেই দিতেন। এমন চরম বেহিসেবী খরচের দরুন সেই সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পত্তি বেচতে হয়েছিল।
দানের ক্ষেত্রেও তাঁর কোনও বাছবিচার ছিল না। নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লেখা 'নীলদর্পণ' নাটক ইংরেজিতে অনুবাদ করে পাদ্রি জেমস লং বিপদে পড়েন। আদালত তাঁকে এক হাজার টাকা জরিমানা করেছিল। ভরা এজলাসে দাঁড়িয়ে কালীপ্রসন্ন সিংহ তৎক্ষণাৎ সেই টাকা মিটিয়ে দেন। হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের অকাল মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা স্ত্রীকে বাঁচাতেও তিনি জলের মতো টাকা খরচ করেছিলেন। বিদ্যোৎসাহিনী সভা স্থাপন, নিজের বাড়িতে বিশাল থিয়েটার মঞ্চ তৈরি এবং নামীদামি লেখকদের দেদার পুরস্কার দেওয়া তাঁর প্রাত্যহিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।
কালীপ্রসন্ন ছিলেন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ মানুষ। এই সুযোগটাই নিয়েছিল তাঁর চারপাশের চাটুকার এবং তথাকথিত বন্ধুরা। 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' লিখে তিনি কলকাতার বাবুসমাজের ভণ্ডামির মুখোশ সর্বসমক্ষে খুলে দিয়েছিলেন। বাস্তবে তিনি নিজেই সেই ভণ্ডদের শিকার হন। তাঁর চারপাশে সবসময় একদল মোসাহেব ঘুরঘুর করত। তারা নানা আছিলায় কালীপ্রসন্নের কাছ থেকে টাকা নিত। কখনও কোনও ভুঁইফোঁড় পত্রিকার নামে, কখনও বা কোনও সামাজিক উদ্যোগের মিথ্যে দোহাই দিয়ে তারা তাঁর পকেট কাটত।
কালীপ্রসন্ন কাউকে ফেরাতে পারতেন না। কিন্তু যখন একের পর এক সম্পত্তি বিক্রি করেও তাঁর দেনার পাহাড় শেষ হল না, তখন চিত্রটা সম্পূর্ণ বদলে যায়। পাওনাদাররা কালীপ্রসন্নর বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করলে, সেই মোসাহেবদের আর টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাযনি। যাঁদের তিনি বছরের পর বছর অন্ধের মতো টাকা বিলিয়েছেন, বিপদের দিনে তাঁদের একজনও কালীপ্রসন্নের পাশে এসে দাঁড়াননি। চরম একাকীত্ব এবং প্রতারণার শিকার হয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।
খরচের রাশ টানতে না পারায় ১৮৬৬ সালের পর থেকে কালীপ্রসন্নের বিরুদ্ধে ঋণের দায়ে একের পর এক মামলা রুজু হতে থাকে। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তাঁর সম্পত্তি একে একে নিলামে উঠতে শুরু করে। ওড়িশার বিশাল জমিদারি হাতছাড়া হয়। কলকাতার বেঙ্গল ক্লাবের জমিও বিক্রি হয়ে যায় জলের দরে।
আদালত তাঁর বাকি সম্পত্তির উপর রিসিভার বসিয়ে দেয়। দেনা মেটাতে না পারায় একসময় তাঁর নামে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়। যে মানুষটি নিজের পকেটের টাকা খরচ করে দেশের মানুষকে বাংলায় অনুবাদিত মহাভারত পড়িয়েছিলেন, তাঁকেই আসামির কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াতে হয়। গ্রেফতার এড়াতে তিনি নিজেরই বরাহনগরের বাগানবাড়িতে লুকিয়ে থাকতেন। শেষ পর্যন্ত বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন।
সম্পূর্ণ কপর্দকশূন্য এবং ঋণের দায়ে জর্জরিত এক নিঃস্ব মানুষ হিসেবে ১৮৭০ সালের ২৪ জুলাই বরানগরের বাগানবাড়িতে কালীপ্রসন্ন সিংহ একাকী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তখন মাত্র তিরিশ বছর বয়স।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
