

সাফল্যের শিখরে প্যারা তিরন্দাজ শীতল দেবী। ছবি - Google
১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ইচ্ছেশক্তিই আসল – এটা অনেকের কাছে কথার কথা নয়, বরং হয়ে ওঠে শক্তির একটা রূপও। শরীরে দুটি হাতই নেই, সেই মেয়ে আজ সারা দেশের গর্ব। তিনি তিরন্দাজিতে ইতিহাস গড়েছেন।
সেই অষ্টাদশীর নাম শীতল দেবী, যাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দুর্গা ঠাকুরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি সম্প্রতি ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, শীতল দেবী হলেন আমাদের সমাজের কাছে এক দৃষ্টান্ত, যিনি হারতে শেখেননি, তিনি আমাদের প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও জয়ের দিশা দেখিয়েছেন। তাঁকে দেখে সমাজের বহু মানুষ অনুপ্রাণিত হবে। জম্মু ও কাশ্মীরের ১৮ বছর বয়সি এই কন্যা এবার বিশ্ব তিরন্দাজিতে শুধু পদকই পাননি, তিনি প্রমাণ করেছেন স্রেফ সংকল্প, জেদ ও ইচ্ছেশক্তি থাকলে সব অসাধ্যসাধনই সম্ভব।
জন্ম থেকেই দুটি হাত নেই শীতলের। বিরল ‘ফোকোমেলিয়া’ রোগে আক্রান্ত ছিলেন ছোটবেলা থেকেই। এই রোগে প্রথমে হাত অবশ হয়ে যায়, তারপর ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা কমে যায় একেবারেই। শীতলের যাত্রা শুরু হয় জম্মু ও কাশ্মীরের কিশতওয়ার জেলার লোইধর গ্রামে, সেখানেই বেড়ে ওঠা। ২০১৯ সালে, কিশতওয়ারে একটি যুব অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তিরন্দাজ হিসেবে। সেইসময় শীতলের বয়স ১১। যেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর রাষ্ট্রীয় রাইফেলস ইউনিট তাঁর প্রতিভা চিনতে পেরেছিল। তারাই শীতলকে বিশেষ ট্রেনিং দেওয়া শুরু করে।
শীতলকে মূলত তৈরি করেছেন সেনাবাহিনীর দুই অভিজ্ঞ তিরন্দাজ কোচ অভিলাষা চৌধুরী ও কুলদীপ ধাওয়ান। শীতলের আত্মবিশ্বাস দেখে তাঁরা অবাকই হয়েছিলেন। শীতল যেহেতু ফোকোমেলিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তাই তাঁর কোনও হাত ছিল না। প্রথমে কোচরা তাঁকে কৃত্রিম হাত লাগিয়ে ট্রেনিং দেওয়া শুরু করেন, কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। কারণ স্বাভাবিক শরীরের যা ভারসাম্য, সেটি অচল হতে শুরু করেছিল। তখন শীতলকে পা ব্যবহার করতে বলা হয়, কারণ তাঁর পায়ে বাকিদের থেকে বেশি জোর ছিল। এমনকী তাঁকে গাছে ওঠার ট্রেনিংও দেওয়া হয়। দুটি হাত নেই, ওই মেয়ে পা দিয়ে গাছে চড়ে অসাধ্যসাধন করেছিলেন।
এর আগে জার্মানির অ্যাথলিট ম্যাট স্টুটজম্যান পা দিয়ে তীর ছুঁড়ে সোনা পেয়েছিলেন অলিম্পিকে। শীতলকে সেইভাবে তৈরি করা হয়। মাত্র ১১ মাসের মধ্যে পা দিয়ে তীর ছুঁড়ে প্যারা এশিয়ান গেমসে দুটি সোনার পদক জেতেন শীতল। তিনি প্রমাণ করেন, সব প্রতিকূলতা দূরে ঠেলেও আকাশ ছোঁয়া যায়। বর্তমানে পাতিয়ালায় কোচ গৌরব শর্মার তত্ত্বাবধানে নিজের স্টাইল আরও নিখুঁত করার চেষ্টায় রয়েছেন শীতল। তিনি এবার জাপানেও যাবেন প্যারা এশিয়ান গেমসে দেশের হয়ে লড়তে। আরও একটি ইতিহাস স্পর্শের বাকি রয়েছে। ২০২২ এশিয়ান প্যারা গেমসে প্রথম আন্তর্জাতিক পদক প্রাপ্তি। তারপর ২০২৪ প্যারিস প্যারালিম্পিকে মিক্সড টিম ব্রোঞ্জ। ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় বিশ্ব প্যারা আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে দুটি হাতবিহীন প্রথম প্যারা তিরন্দাজ হিসেবে সোনার পদক লাভ। তারপরেই শীতলের কথা সকলে জেনে যায়। খোদ প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাসভবনে চা-চক্রে শীতলকে আমন্ত্রণ জানান।
২০২৩ সালে ‘অর্জুন’ পুরস্কারে ভূষিত শীতল আজ ভারতের ক্রীড়া ইতিহাসের প্রেরণার প্রতীক। তাঁর সোনা জয় শুধু দৃষ্টান্ত নয়, এটি সমাজ ও বৈচিত্র্যের শক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়ার এক মাইলফলকও। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ ও নিখুঁত নিশানায় প্রতিপক্ষকে পিছনে ফেলে সোনার পদক জয় করে তিনি দেশের তামাম অ্যাথলিটদের কাছে প্রকৃতঅর্থের আইডল।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
