

মুঘল তৈলচিত্রে দারা শিকোহ। ছবি - Google
১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১৬৫৮ সালের সামুগড়ের প্রান্তরে শাহজাহানের দুই পুত্র—স্বপ্নবিলাসী দারা শিকোহ এবং কঠোর বাস্তববাদী আওরঙ্গজেবের যুদ্ধ কেবল মুঘল সিংহাসন দখলের লড়াই ছিল না, তা ছিল ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সামরিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলের অভাবে দারার পরাজয় কট্টরপন্থী আওরঙ্গজেবের শাসনের পথ প্রশস্ত করে। দারা বিজয়ী হলে ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক নতুন অধ্যায় সূচিত হতে পারত, যা হয়তো পরবর্তী কালের সাম্প্রদায়িক বিভাজনকেও প্রতিরোধ করতে পারত।
১৬৫৮ সালের মে মাস। আগ্রার অদূরে সামুগড়ের প্রকাণ্ড প্রান্তর সাক্ষী হল এক ভয়াবহ ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের। একদিকে দাঁড়িয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের কনিষ্ঠ যুবরাজ আওরঙ্গজেব। তাঁর সঙ্গে আছে গোঁড়া ইসলামের পক্ষ নেওয়া, কিন্তু চূড়ান্ত সুশৃঙ্খল এক সেনাবাহিনী। অন্যদিকে বিশাল, কিন্তু এক বিশৃঙ্খল সেনাদল নিয়ে অপেক্ষায় সম্রাট শাহজাহানের প্রিয় পুত্র তথা তখনও পর্যন্ত সিংহাসনের উত্তরাধিকারী দারা শিকোহ।
ইতিহাস প্রসিদ্ধ এই যুদ্ধ কেবল মুঘল সিংহাসন দখলের লড়াই ছিল না। এটি ছিল সমগ্র ভারত ভূমির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক নির্ণায়ক মুহূর্ত। আওরঙ্গজেব সেই যুদ্ধে জিতেছিলেন। মুঘল সাম্রাজ্য পেয়েছিল এক কট্টরপন্থী শাসককে। কিন্তু সেদিন যদি দারা জিততেন, তবে আজ হয়ত এই উপমহাদেশের মানচিত্রটাই অন্যরকম হত!
দারা এবং আওরঙ্গজেবের জীবনের পথ ছোটবেলা থেকেই একেবারে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। দারা ছিলেন স্বপ্নবিলাসী ও শিল্পানুরাগী। অন্যদিকে আওরঙ্গজেব ছিলেন কঠোর বাস্তববাদী এবং সামরিক শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী। নিজে শিল্পানুরাগী মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র দারাকে এতটাই ভালোবাসতেন যে তাঁকে চোখের আড়াল করতে চাইতেন না। হলো তো যুবরাজ হিসেবে আগ্রা আর দিল্লিতেই মূলত দারার গোটা সময়টা কেটেছে। কোনও সামরিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই তিনি পেয়েছিলেন সর্বোচ্চ সামরিক পদমর্যাদা, ৬০ হাজার সেনার মনসবদারি! অন্যদিকে আওরঙ্গজেবকে মাত্র ষোলো বছর বয়স থেকে দাক্ষিণাত্য থেকে বলখ পর্যন্ত কঠিন সব সামরিক অভিযানে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিল। এই তীব্র বৈষম্য আওরঙ্গজেবের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়।
১৬৩৩ সালে এক হাতির লড়াইয়ে 'সুধাকর' নামের এক পাগলা হাতি যখন আওরঙ্গজেবের দিকে তেড়ে আসে, দারা তখন দূর থেকে কেবল চিৎকার করেছিলেন, ভাইকে বাঁচাতে ছুটে আসেননি। মাত্র ১৪ বছরের আওরঙ্গজেব তখন একটা বল্লম নিয়ে চরম সাহসিকতার সঙ্গে সেই হাতির মোকাবিলা করেন। গোটা ঘটনাটাই শাহজাহানের চোখের সামনে ঘটে। তিনি কনিষ্ঠ পুত্রের সাহসের প্রশংসা করলেও মন পড়েছিল দারার কাছেই। দুই ভাইয়ের মধ্যে মানসিক দূরত্বের প্রাচীর সেদিন থেকেই স্থায়ী রূপ নেয়।
জ্ঞানচর্চা এবং আধ্যাত্মিকতার জগতেই দারা সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তিনি কাদিরিয়া সুফি তরিকার একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। হিন্দু যোগী, সন্ন্যাসী এবং অতীন্দ্রিয়বাদীদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। এই উদার মানসিকতাই তাঁকে আওরঙ্গজেব এবং মুঘল দরবারের কট্টরপন্থী উলেমাদের থেকে যোজন দূরে সরিয়ে দেয়। আওরঙ্গজেবের চোখে দারা হয়ে ওঠেন 'ধর্মত্যাগী'।
দারার বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ হল ১৬৫৪ বা ৫৫ সালে লেখা ফার্সি গ্রন্থ 'মজমা-উল-বাহরাইন'। এর অর্থ দুই সমুদ্রের মিলন। এই বইতে দারা সেই সময়ের নিরিখে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, ইসলামি সুফিবাদ এবং হিন্দু বেদান্ত দর্শনের মধ্যে মৌলিক কোনও পার্থক্য নেই। উভয় পথই এক নিরাকার ঈশ্বরের দিকে যায়। বিখ্যাত সুফি সাধক ইবনে আরাবির 'ওয়াহদাত-উল-ওজুদ' বা সর্বেশ্বরবাদের সঙ্গে তিনি অদ্বৈত বেদান্তের সরাসরি মিল খুঁজে পান।
এই গ্রন্থে দারা দেখান, পরিভাষার পার্থক্য ছাড়া আর কোনও তফাত নেই। সুফিবাদের 'রূহ' এবং বেদান্তের 'আত্মা' আদতে একই ঐশ্বরিক সত্তা। ঈশ্বরের ধারণা বোঝাতে 'হক' বা 'আল্লাহ' এবং 'ব্রহ্ম' শব্দের তুলনামূলক আলোচনা করেন তিনি। কট্টরপন্থীদের তোয়াক্কা না করে দারা দাবি করেছিলেন, কোরআনে বর্ণিত গুপ্ত গ্রন্থটি আসলে নাকি উপনিষদ! এই যুগান্তকারী চিন্তাভাবনাই পরবর্তীতে আওরঙ্গজেবের হাতে দারার মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অজুহাত হিসেবে কাজ করেছিল।
১৬৫৭ সালের সেপ্টেম্বরে শাহজাহান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। শুরু হয় মুঘল উত্তরাধিকারের এক নির্মম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। শাহ সুজা বাংলা থেকে এবং মুরাদ গুজরাট থেকে বিদ্রোহ করেন। আওরঙ্গজেব মুরাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আগ্রার দিকে অগ্রসর হন। সামুগড়ের প্রান্তরে মুখোমুখি হয় দুই বাহিনী। দারার কাছে আওরঙ্গজেবদের মিলিত বাহিনীর থেকেও অনেক বড় সৈন্যদল ছিল। কিন্তু তাঁর অহঙ্কার ও সামরিক অযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতার ডেকে আনে।
সেনাপ্রধান হিসেবে বা সামরিক রণকৌশলের দিক থেকে দারা একেবারেই অপটু ছিলেন। মে মাসের প্রচণ্ড গরমে তিনি আওরঙ্গজেবের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে নিজের সৈন্যদের সারাদিন বর্ম পরিয়ে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। ফলে যুদ্ধ শুরুর আগেই তাঁর বাহিনী ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
তবে চূড়ান্ত বোকামিটা দারা করেছিলেন যুদ্ধের মাঝপথে। একটি গোলা লেগে তিনি যে হাতিতে বসেছিলেন তার মাহুত মারা যায়। এলপর তিনি হাতি থেকে নেমে একটি ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসেন। এরফলে দূর থেকে দারাকে তাঁর সেনারা আর দেখতে পায়নি। ফলে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর বিশাল বাহিনীর মধ্যে গুজব রটে যায়, দারা নিহত হয়েছেন। চোখের পলকে সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। ফলে আওরঙ্গজেব সহজেই আগ্রা দখল করে বৃদ্ধ পিতা শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে বন্দি করেন। শাহজাহানকে তাঁর জীবনের শেষ আটটি বছর সেই বন্দিদশাতেই কাটাতে হয়েছিল।
এরপর দারা পালিয়েছিলেন। যদিও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে শেষ পর্যন্ত ঔরঙ্গজেবের হাতে ধরা পড়েন। তাঁকে ছিন্নভিন্ন পোশাকে হাতির পিঠে বসিয়ে দিল্লিতে ঘোরানো হয়। তারপর ইসলাম ধর্ম ত্যাগের অজুহাতে মৃত্যুদণ্ড দেন ঔরঙ্গজেব।
সম্রাট হিসেবে দারা কতটা যোগ্য হতেন তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার দারাকে অত্যন্ত অমায়িক ও দয়ালু বলে বর্ণনা করলেও, তাঁর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সমালোচনা করেছেন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ স্যার যদুনাথ সরকার দারাকে একজন রাজনৈতিকভাবে অযোগ্য এবং অহঙ্কারী মানুষ হিসেবেই দেখেছেন।
বাস্তবে একটি বিশাল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনে যে নির্মমতা, কূটনীতি এবং রণকৌশলের দক্ষতা প্রয়োজন হয়, তা দারার চরিত্রে একেবারেই ছিল না। তিনি সবসময় চাটুকারদের প্রশ্রয় দিতেন এবং অভিজ্ঞ সেনাপতিদের তাচ্ছিল্য করতেন। তাই সিংহাসনে বসলেও মুঘল সাম্রাজ্যের মতো জটিল এক রাজনৈতিক পরিকাঠামো সামলানোর ক্ষমতা তাঁর কতটুকু ছিল, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
দারা শিকোহ যদি আওরঙ্গজেবের বদলে মুঘল সম্রাট হতেন, তাহলে আজকের ভারতবর্ষের চিত্রটা ঠিক কেমন হত? নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতো চিন্তাবিদরা মনে করেন, দারা জয়ী হলে ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাত। আকবরের তুলে দেওয়া ধর্মীয় বৈষম্যমূলক জিজিয়া কর সম্রাট হয়ে আওরঙ্গজেব আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন। তিনি বহু মন্দির ধ্বংস করে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সম্পর্কে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিলেন, দারার আমলে তা কখনওই হত না। ফলে সামাজিকভাবে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় একে অপরের অনেক কাছাকাছি থাকত।
এদিকে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মূল ভিত্তি ছিল দ্বিজাতি তত্ত্ব। দারা সম্রাট হলে এই তত্ত্বের কোনও দার্শনিক বা সামাজিক ভিত্তিই হয়ত তৈরি হত না। ব্রিটিশরা পরবর্তীতে যে বিভাজন নীতি প্রয়োগ করে ভারত ভাগ করেছিল, ধর্মীয় সম্প্রীতির আবহে তা প্রয়োগ করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হত। তবে ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র বা ইরফান হাবিবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দারা সিংহাসনে বসলে রাজনৈতিক দিক থেকে মুঘল সাম্রাজ্য সেক্ষেত্রে আরও আগেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেত। দারার প্রশাসনিক অযোগ্যতার কারণে মারাঠা বা রাজপুতরা অনেক আগেই স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে ফেলত। কিন্তু সেই বিভাজন হত খাঁটি রাজনৈতিক, কোনওভাবেই ধর্মীয় নয়।
দারার পতন না হলে এই উপমহাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা হয়ত এত তীব্র আকার নিত না। রাজনীতি এবং ক্ষমতার খেলায় তিনি হেরে গিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সমন্বয়ের দর্শন আজকের বাস্তবতায় শুধু ভারতবর্ষ নয়, বরং সমগ্র ভারত উপমহাদেশ জুড়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
সামুগড়ের প্রান্তরে আওরঙ্গজেব সেদিন কেবল তাঁর দাদাকে পরাজিত করেননি, তিনি অখণ্ড ভারতের আত্মায় এমন এক বিভেদের বীজ রোপণ করেছিলেন যা কয়েক শতাব্দী পর দেশভাগের রক্তাক্ত অধ্যায় রচনার সূতিকাঘর হিসেবে ভূমিকা পালন করে। দারা শিকোহ সম্রাট হলে হয়ত মুঘল সাম্রাজ্যের অনেক দ্রুত পতন হত, কিন্তু এই উপমহাদেশের মাটি ধর্মীয় বিদ্বেষের বিষ থেকে অনেকটাই মুক্ত থাকত।
তবে সবশেষে একটা স্বীকারোক্তি থাকুক, পুরোটাই সুখ কল্পনার ভিত মাত্র। দারা শিকোহ'র সঙ্গে সঙ্গে এই সম্ভাবনা সেদিনই মাটিতে মিশে গিয়েছিল!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
