৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
‘মৃত্যুভোজ’ নিয়ে বদলাচ্ছে সমাজের পুরনো ভাবনা

মৃত্যুভোজের প্রতীকী ছবি - AI

‘মৃত্যুভোজ’ নিয়ে বদলাচ্ছে সমাজের পুরনো ভাবনা

calender icon 2 ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

মৃত্যু বাড়িতে ভোজ, না কি শোকের ভার?

মৃত্যু পরবর্তী শোকের আবহ ঘিরে পৃথিবীর নানান দেশে, বিভিন্ন সমাজে ও ধর্মে নানান রকম প্রথা প্রচলিত আছে। তার অন্যতম হল 'মৃত্যুভোজ'। এই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে আপনি কি মৃত্যুভোজের পক্ষে, না কি চান এক্ষেত্রে সামাজিক চাপের বদল ঘটুক?

মূল বিষয়

মৃত্যু মানেই থেমে যাওয়া নয়। বরং প্রিয় কোনও মানুষ চলে যাওয়ার পর তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি, অভ্যাস, কথা আর ভালবাসা আরও গভীর ভাবে থেকে যায়। বাড়ির দেওয়ালে টাঙানো ছবির দিকে তাকিয়ে চোখ ভিজে ওঠে। পরিচিত মানুষটির অনুপস্থিতি তখন প্রতিটি ঘর, প্রতিটি কোণে যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়।

কিন্তু সেই শোকের আবহের মধ্যেই কয়েক দিনের মধ্যে শুরু হয় অন্য এক আয়োজন। বাড়িতে রান্নাবান্না, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ, একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া। কোথাও তা শ্রাদ্ধের অঙ্গ, কোথাও মৃতের স্মরণে সামাজিক আয়োজন, আবার কোথাও পরিচিত ‘মৃত্যুভোজ’ নামে!

রীতি থেকে প্রশ্ন

সময়ের সঙ্গে বদলেছে পরিবার, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, বদলেছে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও। ফলে পুরনো এই রীতিকে ঘিরে উঠছে নতুন প্রশ্ন, মৃত মানুষের স্মরণে বড় করে ভোজের আয়োজন কি সত্যিই জরুরি? নাকি শোকের সময়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত সমাজের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব?

এর উত্তর অবশ্য এক কথায় দেওয়া যায় না। কারণ মৃত্যু-পরবর্তী আচার অঞ্চল, সম্প্রদায় এবং পারিবারিক রীতি অনুযায়ী ভিন্ন। বহু মানুষের কাছে প্রয়াত ব্যক্তির স্মরণে আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের খাওয়ানো দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথা। তাঁদের কাছে এটি কোনও আনন্দের অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রয়াত মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি মাধ্যম।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম

অনেক পরিবারে এই রীতি চলে আসছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। পরিবারের কোনও সদস্য মারা গেলে আত্মীয়েরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে একসঙ্গে হন। প্রয়াত মানুষটির সঙ্গে কাটানো দিনের কথা ওঠে। তাঁর স্বভাব, তাঁর কথা, তাঁর ভাল লাগা-মন্দ লাগার স্মৃতি ভাগ করে নেন সকলে।

সেই জায়গা থেকে দেখলে, এই আয়োজনের অর্থ শুধু খাওয়াদাওয়া নয়। বহু পরিবারের কাছে এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আত্মীয়তার বন্ধনকে আবার এক জায়গায় নিয়ে আসার একটি উপলক্ষও।

অন্য ছবিটাও আছে

তবে বাস্তবের অন্য দিকটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে বড় করে মৃত্যুভোজের আয়োজন অনেক সময় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

পরিবারের উপার্জনক্ষম একজন মানুষকে হারানোর পরে যেখানে সংসারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, সেখানে কয়েকশো মানুষকে খাওয়ানোর খরচ জোগাড় করা কঠিন হতে পারে। তবু অনেক পরিবার সামাজিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে।  ‘এত দিনের রীতি’, ‘আত্মীয়রা কী বলবেন’, ‘পাড়ায় কী কথা উঠবে’- এই প্রশ্নগুলি কখনও কখনও শোকের মধ্যেও পরিবারকে বড় আয়োজনের দিকে ঠেলে দেয়।

শ্রদ্ধা কি শুধু ভোজেই?

এখানেই প্রশ্নটা আরও গভীর। মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা কি শুধু বড় করে ভোজ আয়োজনের মধ্যেই প্রকাশ পেতে পারে? নাকি তাঁর নামে কোনও দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করা, কোনও ছাত্রের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া, গাছ লাগানো, হাসপাতাল বা আশ্রমে দান করা কিংবা প্রয়াত মানুষটির অসম্পূর্ণ কোনও ভাল কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও হতে পারে স্মরণের পথ?

আরও পড়ুন
“রাস্তার নাম পালটায় একদিন”
নারীদের বিবস্ত্র করার পুরস্কার! দেবী সিংকে ‘মহারাজ’ করে ব্রিটিশরা
বাঙালির আড্ডার বিবর্তন: চণ্ডীমণ্ডপ থেকে ফেসবুক থ্রেড

একজন মানুষের জীবনকে স্মরণ করার উপায় যে শুধু একটি দিনের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়, এই ভাবনাই ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে সমাজে।

সামাজিক চাপ নয়, পরিবারের ইচ্ছা

মৃত্যুর পরে মানুষকে খাওয়ানোর রীতি কোনও পরিবার পালন করতে চাইতেই পারে। তাতে আপত্তির কারণ নেই। কিন্তু সেটি যেন সামাজিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত না হয়, এটাই গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ শোকের সময়ে একটি পরিবারের প্রয়োজন হয় সহানুভূতি, সময় এবং মানসিক সমর্থনের। অতিথির সংখ্যা কত হবে, কী কী রান্না হবে, অনুষ্ঠানে কত টাকা খরচ করতে হবে- এসব নিয়ে বাড়তি চাপ নয়। প্রিয়জনকে হারানোর মুহূর্তে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই তখন সবচেয়ে বড় সামাজিক দায়িত্ব হয়ে উঠতে পারে।

শোক ভাগ করে নেওয়ারও আয়োজন

আবার মৃত্যুভোজকে একেবারে অর্থহীন বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেক পরিবারের কাছে বহু দিন পরে আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের এক জায়গায় হয়ে ওঠার এই সুযোগটি প্রয়াত মানুষটির স্মৃতি ভাগ করে নেওয়ার সময়।

খাবারের টেবিলে তাঁর কথা ওঠে। কেউ বলেন তাঁর সঙ্গে কাটানো কোনও মজার ঘটনা, কেউ মনে করিয়ে দেন তাঁর কোনও ভাল কাজ। চোখে জল আসে, আবার কখনও সেই স্মৃতির মধ্যেই হাসিও ফিরে আসে। সেই অর্থে ভোজ নয়, মানুষের একসঙ্গে হয়ে ওঠাটাই হয়ে উঠতে পারে আসল বিষয়।

রীতির বদলে মানবিকতা

তাই ‘মৃত্যুভোজ’ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু ভোজ থাকবে কি থাকবে না, এমন প্রশ্নে আটকে থাকা উচিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কোনও পরিবার নিজের বিশ্বাস, সামর্থ্য এবং ইচ্ছা অনুযায়ী কী ভাবে প্রিয়জনকে স্মরণ করতে চায়।

কেউ হয়তো আত্মীয়দের খাওয়াবেন, কেউ দরিদ্রদের মধ্যে খাবার বিলি করবেন, কেউ দান করবেন, কেউ প্রয়াত মানুষের নামে কোনও সামাজিক কাজ করবেন। পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু উদ্দেশ্য এক, প্রিয় মানুষটিকে মনে রাখা।

স্মরণের আসল অর্থ

মৃত মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়তো কত জনকে খাওয়ানো হল, সেই সংখ্যায় নয়। কত টাকা খরচ হল, কত পদ রান্না হল, কত জন নিমন্ত্রিত হল, সেখানেও নয়। তিনি জীবনে যে ভালবাসা দিয়ে গিয়েছেন, তাঁর চলে যাওয়ার পরে সেই ভালবাসা কতটা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া গেল, হয়তো সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে স্মরণের প্রকৃত অর্থ।

মৃত্যুর পরে তাই ভোজ থাকুক বা না থাকুক, রীতি থাকুক বা বদলাক, সবচেয়ে জরুরি যেন থেকে যায় মানুষটির প্রতি ভালবাসা এবং তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মানবিকতা।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
সৌমালী চক্রবর্তী
সৌমালী চক্রবর্তী

2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য