

বাঙালির আড্ডার বিবর্তনের প্রতীকী ছবি - AI
৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আড্ডা। এটা বাঙালির কাছে স্রেফ তিন অক্ষরের একটা শব্দ নয়। তার অস্তিত্বের, যাপনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক মহৌষধি। বেঁচে থাকার রসদ।
যুগের পর যুগ ধরে এই 'আড্ডা' বাঙালির সমাজ, রাজনীতি আর সংস্কৃতির নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং সব উপাদান এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের মধ্যে নিঃশব্দে স্থানান্তরিত করে চলেছে। সেই কবেকার চণ্ডীমণ্ডপের ধীরলয়ের আড্ডা বিবর্তিত হতে হতে আজ স্মার্টফোনের ছোট্ট স্ক্রিনে এসে ঠেকেছে। এই দীর্ঘ পথচলায় রাজনীতি বদলেছে। অর্থনীতি পালটেছে। বদলেছে মানুষের মনস্তত্ত্বও। সেইসব যুগপৎ বদলের প্রবল ধাক্কায় বারবার নিজের খোলস ছেড়ে নতুন রূপ নিয়েছে বাঙালির সাধের আড্ডা।
তখন বাংলা পুরোপুরি কৃষিনির্ভর। হাতে অঢেল সময়। বিশেষ করে সূর্য মাথার উপর থেকে পশ্চিম দিকে হেলে গেলেই সময় আর সময়। রাঢ় বাংলার গ্রামগুলোতে তখন আড্ডা জমত মূলত চণ্ডীমণ্ডপে, কিংবা গ্রামের সবচেয়ে পুরোনো বটগাছটার নিচে। সেখানে রামায়ণ-মহাভারতের গল্প, ধর্মকথা আর চাষবাসের হালহকিকত নিয়েই মূলত চলত মতবিনিময়। ওদিকে পূর্ব বাংলার নদীমাতৃক অঞ্চলের ছবিটা ছিল একটু অন্যরকম। সেখানে আড্ডার প্রাণকেন্দ্র ছিল নদীর ঘাটগুলো। এছাড়াও নৌকার পাটাতনেও জমত আড্ডা। মাঝিমাল্লাদের ভাটিয়ালি বা মুর্শিদি গানের বিষণ্ণ সুরে মিশে যেত গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ, মন কেমনের আভাস। জীবন তখন ঠিক এমনই সহজ, অকৃত্রিম ছিল।
আঠারো শতকে বাঙালির আড্ডার চরিত্রে এল প্রথম বড় ধাক্কা। সেই সময় মুর্শিদাবাদ বা কৃষ্ণনগরের মতো শহরের উত্থান ঘটছে। আর কলকাতায় তখন নতুন বাবু সমাজের রমরমা শুরু হচ্ছে। জমিদারি আর সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতি কিছু মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে বিপুল অর্থ। সেই অর্থ খাবে, না ছড়াবে, না মাখবে সেটাই তারা ঠিক করে উঠতে পারছে না! খুব স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব বাঙালির নিজেকে প্রকাশের, ভাবনা তুলে ধরার মাধ্যম আড্ডার উপর এসে পড়বেই। ফলে আড্ডার ঠিকানাও গেল বদলে। চণ্ডীমণ্ডপ বা নদীর ঘাটের এলোমেলো খাপছাড়া সহজ সরল পরিবেশ ছেড়ে শোভাবাজার রাজবাড়ি বা ছাতুবাবু-লাটুবাবুদের মতো বনেদি পরিবার, বা ঢাকার নবাবের কাছারিখানা বা যশোরের জমিদার বাড়ির কাছারিতে স্থানান্তরিত হয়ে গেল আড্ডার জায়গা। এইসব জায়গার সুসজ্জিত বৈঠকখানা হয়ে উঠল নতুন আড্ডাখানা। তবে এইসব আড্ডা মোটেও সর্বজনীন ছিল না। এখানে ছিল পৃষ্ঠপোষকতার গন্ধ।
কবিগান, খেউড়, কিংবা বাইজি নাচের আসরে মেতে থাকতেন সেকালের বিত্তবানরা। সাধারণ মানুষের আড্ডায় তখন সবে তামাক আর হুঁকোর প্রবেশ ঘটছে। তারা চণ্ডীমণ্ডপ বা নদীর ঘাটে আড্ডায় মাতত, তবে ফোকাসটা চলে গিয়েছিল সেখান থেকে।
উনিশ শতকের শুরু থেকে বঙ্গভঙ্গের সময় পর্যন্ত প্রায় ১০০ বছরের একটা সময়কাল বাংলার মনোজগতকে একেবারে তোলপাড় করে দেয়। একদিকে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, অন্যদিকে ছাপাখানার উদ্ভব। উঠে এল নতুন এক চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণি। যাদের বলা হত ভদ্রলোক। তখন বাঙালি অতি দ্রুতগতিতে বদলে যাচ্ছে।
এই ভদ্রলোকদের আড্ডায় শুরু হল এক নতুন দ্বন্দ্ব। পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ বনাম দেশীয় ঐতিহ্যের যুক্তি-তর্কের লড়াই। ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনা গৃহ থেকে শুরু করে ঢাকা বা ময়মনসিংহের শিক্ষিত সমাজের বৈঠকখানা, সর্বত্রই তখন সমাজ সংস্কার নিয়ে তুমুল তর্ক। আর ঠিক এই সময়েই বাবুদের অভিজাত বৈঠকখানা থেকে আড্ডা আবার ধীরে ধীরে নেমে আসতে শুরু করল সাধারণ মানুষের কাছাকাছি। পাড়ার ‘দাওয়া’ বা ‘রোয়াক’-এ।
কলকাতা বা তার নিকটবর্তী মফস্বলগুলোয় তখন যে সকল বাড়ি তৈরি হত, তার অনেকেরই সামনে কিছুটা করে রোয়াক থাকত। এই রোয়াকে ৮ থেকে ৮০, পাড়ার বেকার বখাটে ছেলে থেকে অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী সকলেই নিজেদের মতো করে আড্ডায় মেতে উঠতেন। সেখানে কখনও মননশীল যুক্তি, আবার কখনও পাড়ার বখাটে ছেলেদের খেউড়-খিল্লিও চলত।
বিশ শতকের প্রথমার্ধ। সময়টা বড়ই অশান্ত। স্বদেশি আন্দোলন, সশস্ত্র বিপ্লব, মন্বন্তর এবং সব শেষে দেশভাগ। ফলে আড্ডার মেজাজটাও গেল বদলে। পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা ব্যায়ামাগার আর গুপ্ত সমিতিগুলো হয়ে উঠল বিপ্লবীদের গোপন আড্ডার জায়গা। অন্যদিকে, গ্রাম থেকে দলে দলে যুবকরা শহরে এল চাকরির খোঁজে। জন্ম নিল ‘মেসবাড়ি’ সংস্কৃতি। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর মেসের ছাদে বা সামনের রোয়াকে রাতের আড্ডাই ছিল তাদের একমাত্র স্বস্তি।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এল দেশভাগের পর। উদ্বাস্তু কলোনিগুলোর রোয়াকে, কলোনি বা পাড়ার মুখে দাঁড়িয়ে আড্ডার জটলায় ভেসে বেড়াত ফেলে আসা ভিটের স্মৃতিচারণ। পূর্ব বাংলার নস্টালজিয়া। আর সদ্য স্বাধীন দেশে মাথা গোঁজার তীব্র লড়াই। এই সবকিছু মিলে রোয়াকেও আড্ডা হয়ে ওঠে বাস্তুহারা বাঙালির টিকে থাকার এক অদ্ভুত রসদ।
এইসব রোয়াকের আড্ডা থেকে কত যে অমলিন সাহিত্য, নাটক তৈরি হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। আজ বাঙালির জীবন থেকে রোয়াকের আড্ডা হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাঙালি যতদিন টিকে থাকবে, তার সংস্কৃতি যতদিন টিকে থাকবে ততদিন সেখানে রোয়াকের আড্ডার অবদান জ্বলজ্বল করে জ্বলবে।
পঞ্চাশ থেকে নব্বইয়ের দশক, অনেকেই এটাকে বাঙালির আড্ডার সেরা সময় বলে থাকেন। এইসময় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। বেকারত্ব বেড়েছে। আর গোটা বিশ্বজুড়ে বইছে সমাজতান্ত্রিক চেতনার হাওয়া। কলকাতার কফি হাউসের টেবিলে বসেই হাংরি জেনারেশনের নকশা তৈরি হয়েছে। বোনা হয়েছে নকশাল আন্দোলনের স্বপ্ন। ওপারেও ছবিটা এক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন, টিএসসি বা শাহবাগ হয়ে উঠেছে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের বুদ্ধিবৃত্তিক আঁতুড়ঘর।
এর পাশাপাশি এই সময়েই আরেকটা দারুণ জিনিস শুরু হয়। লোকাল ট্রেনের ডেইলি প্যাসেঞ্জারি। ট্রেনের কামরায় তাস পেটাতে পেটাতে বাজারের দরদাম থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি- সবকিছু নিয়ে সহযাত্রীদের মধ্যে তুমুল তর্ক। মফস্বলের বাঙালির এ এক নিজস্ব আড্ডার সংস্কৃতি হয়ে উঠেছিল। এটা অবশ্য এখনও কিছুটা বজায় আছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার গুণগতমান পড়ে গিয়েছে। এছাড়া ওই সময়ে পাড়ার চায়ের ঠেক আর টংয়ের দোকানগুলোর আড্ডা প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা থাকলে বুঝবেন, সেগুলো এক একটা যেন মিনি-পার্লামেন্ট হয়ে উঠত!
এছাড়া এই পর্যায়ে পাড়ায় পাড়ায়, গলিতে গলিতে ক্লাব বা ঠেক সংস্কৃতি চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছিল। সন্ধ্যেবেলায় কাজ থেকে ফিরে কোথাও পাকা চালের আবার কোথাও দরমার ছাউনি দেওয়া ক্লাবে ঢুকে ক্যারাম বা তাস পিটতে পিটতে নিজেদের মধ্যে গল্প করাটা ছিল অনেকের বেঁচে থাকার অক্সিজেন।
নব্বইয়ের দশকে এল বিশ্বায়নের ঝাপটা। বহির্বিশ্বের অর্থনীতির সামনে হাট করে খুলে দেওয়া হল ভারতের দরজা। এল স্যাটেলাইট টিভি। আড্ডার অভিমুখ আবার বদলাল। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে টুকরো হল। ব্যস্ততা বাড়ল। রকের, চায়ের ঠেক, পাড়ার ক্লাবের আড্ডা ধীরে ধীরে উঠে এল ড্রয়িংরুমে। মেগা-সিরিয়াল আর ক্রিকেট ম্যাচকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে শুরু করল আড্ডা। তরুণ প্রজন্মের আড্ডা সরে গেল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাল্টিপ্লেক্স বা আধুনিক ক্যাফেগুলোতে।
২০১০ সালের আশেপাশে করে বাঙালির হাতে হাতে স্মার্টফোন ছেয়ে গেল। ফোর-জি, ফাইভ-জির স্পিড। পাড়ার চেনা চাতাল বা রোয়াকগুলো ফ্ল্যাটবাড়ির চাপে কবেই বিলুপ্ত। কাজের তাগিদে বাঙালি আজ ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। নির্দিষ্ট সময়ে পাড়ার মোড়ে জড়ো হওয়ার ফুরসত কোথায়? তবে কি আড্ডা প্রিয় বাঙালির আড্ডার মৃত্যু ঘোষণা হল একবিংশ শতকে এসে?
একদমই নয়। আড্ডা মরেনি। শুধু তার ভূগোলটা বদলে গিয়েছে। আড্ডা এখন ‘ভৌগোলিক’ থেকে ‘আগ্রহ-কেন্দ্রিক’ হয়ে পড়েছে। আগে ছিল একই পাড়ার বা একই মেসবাড়ির লোকজনের মধ্যে আড্ডা জমত। কিন্তু এখন আড্ডা জমে একই আগ্রহের বাঙালিদের মধ্যে।
নিউ ইয়র্কে বসে থাকা এক প্রবাসী বাঙালি এখন চাইলেই মাঝরাতে বেঙ্গালুরুতে ঢাকা তার বাঙালি বন্ধুর সঙ্গে তর্কও জুড়ে দিতে পারে। আর তার মাধ্যম হিসেবেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক ইত্যাদি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং প্লাটফর্ম। ফলে আড্ডা এখন খণ্ডিত, কিন্তু সময়ের বাঁধনে বন্দি নয়। চাইলেই আপনি সারাদিন টেক্সট, ইমোজি, মিম আর ভয়েস নোটের মাধ্যমে বন্ধু বা সমমনস্কদের সঙ্গে আড্ডা চালিয়ে যেতে পারেন।
কিন্তু এই ডিজিটাল ধারাবাহিকতার একটা মস্ত বড় বিপদ আছে- ‘ইকো চেম্বার’। আগে রকের আড্ডায় নানা মতের মানুষ মুখোমুখি বসতেন। ফলে ভিন্ন মত শোনার আর সহ্য করার একটা সহনশীলতা গড়ে উঠত। কিন্তু বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের 'অ্যালগরিদম' আমাদের শুধুই সমমনস্ক বা সমমনোভাবাপন্নদের মধ্যে সংযোগ গড়ে তুলতে সহায়তা করছে। ফলে ভিন্নমত, ভিন্ন ধারণার সঙ্গে পরিচয় যেমন ক্রমশ কমছে, তেমনই তা শোনার ধৈর্য, সহনশীলতা ক্রমশ চলে যাচ্ছে। এরই কু-প্রভাব হিসেবে ভিন্নমত এলেই তা ব্যক্তিগত আক্রমণ বা ট্রোলিংয়ের ঢেউ-এ পরিণত হচ্ছে।
ভাঁড়ের চায়ে চুমুক দিয়ে একে অপরের পিঠে হাত চাপড়ে কথা বলার যে উষ্ণতা, স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে টাইপ করার মধ্যে সেটা কোনভাবেই পাওয়া যায় না। কিন্তু ওই যে, বাঙালি তো। চুপ করে থাকতে পারে না। মতপ্রকাশের তীব্র একটা তাগিদ তার শিরা দিয়ে বয়ে চলা প্রতিটি রক্তবিন্দু বহন করে নিয়ে চলেছে। প্রযুক্তি হয়তো মাধ্যম বদলেছে। কেড়ে নিয়েছে মুখোমুখি বসার সময়। কিন্তু ডিজিটাল অক্ষরেও বাঙালি ঠিকই তার নিজস্ব ‘ঠেক’ খুঁজে নিয়েছে। মাধ্যম বদলেছে ঠিকই। তবে বাঙালির ডিএনএ-তে মিশে থাকা আড্ডার সেই আদিম স্পিরিটটা আজও অমলিন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
