

DNA-তে কতটা লেখা থাকে স্মৃতি হারানোর ভবিষ্যৎ? ছবি - Google
২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বাবা আলঝাইমার্সে আক্রান্ত। মায়েরও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতি দুর্বল হয়েছিল। পরিবারের ইতিহাসে এমন ঘটনা থাকলে একটা ভয় অজান্তেই মাথায় ঢুকে পড়ে, পরিণতি কি একই হতে চলেছে? যে রোগ ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি, পরিচিত মুখ, পরিচিত জায়গা, এমনকি নিজের জীবনের টুকরো টুকরো স্মৃতিও মুছে দিতে পারে, তার বীজ কি জন্মের সময়ই শরীরে নিয়ে আসতে হয়?
উত্তরটা এতটা সরল নয়। আলঝাইমার্সের সঙ্গে জিনের সম্পর্ক রয়েছে ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে DNA কোনও ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ করে না। কোনও কোনও জিন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, আবার বিরল কিছু জিনগত পরিবর্তন সরাসরি রোগের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বয়স, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, খাদ্যাভ্যাস, হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ-সব মিলিয়েই তৈরি হয় আলঝাইমার্সের সামগ্রিক ঝুঁকি।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে APOE জিন। বিশেষ করে তার APOE ε4 ভ্যারিয়্যান্ট। দেরিতে শুরু হওয়া আলঝাইমার্সের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচিত জিনগত ঝুঁকি। কারও শরীরে APOE ε4-এর একটি কপি থাকলে আলঝাইমার্সের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। দুটি কপি থাকলে সেই ঝুঁকি আরও বাড়ে। কিন্তু এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা, APOE ε4 থাকা মানেই আলঝাইমার্স হবেই, এমন নয়। আবার আলঝাইমার্সে আক্রান্ত বহু মানুষের শরীরেও APOE ε4 থাকে না। অর্থাৎ, APOE ε4-কে রোগের ‘টিকিট’ ভাবলে ভুল হবে। এটি মূলত ঝুঁকির একটি সূচক। একজনের শরীরে এই জিনগত ভ্যারিয়্যান্ট রয়েছে, কিন্তু তিনি কখনও আলঝাইমার্সে আক্রান্ত হলেন না, এমন ঘটনাও দেখা যায়। আবার কারও শরীরে এটি নেই, তবু বয়স বাড়ার সঙ্গে রোগ দেখা দিতে পারে। জিনের প্রভাব তাই একক নয়, অনেকগুলি কারণের সঙ্গে মিলে কাজ করে।
বাবা বা মা, কিংবা ভাই-বোনের মতো প্রথম-স্তরের আত্মীয় আলঝাইমার্সে আক্রান্ত হলে নিজের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বাড়তে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেই রোগ উত্তরাধিকার সূত্রে নিশ্চিত ভাবেই পরবর্তী প্রজন্মের শরীরে চলে আসবে। একই পরিবারের মানুষ একই ধরনের খাবার খান, একই পরিবেশে থাকেন, একই রকম জীবনযাপন করেন। ফলে পারিবারিক ঝুঁকির মধ্যে জিনের পাশাপাশি পরিবেশ ও জীবনযাপনেরও ভূমিকা থাকতে পারে।
তবে সব ধরনের আলঝাইমার্স এক রকম নয়। একটি অত্যন্ত বিরল ধরনের ক্ষেত্রে জিনের ভূমিকা অনেক বেশি সরাসরি। APP, PSEN1 এবং PSEN2—এই তিনটি জিনের নির্দিষ্ট ক্ষতিকর পরিবর্তন বংশগত আলঝাইমার্সের সঙ্গে যুক্ত। এগুলি সাধারণত পরিবারের একাধিক সদস্যের মধ্যে তুলনামূলক কম বয়সে রোগ দেখা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পায়। Alzheimer's Association-এর তথ্য অনুযায়ী, এই তিন জিনের মিউটেশন সব আলঝাইমার্স ডিমেনশিয়ার 1%-এরও কম ক্ষেত্রে দায়ী।
এই ধরনের ক্ষেত্রে পারিবারিক ছবিটা সাধারণত আলাদা। একই পরিবারের কয়েক প্রজন্মে অস্বাভাবিক কম বয়সে আলঝাইমার্সের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকেরা বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেন। National Institute on Aging-এর তথ্য অনুযায়ী, APP, PSEN1 বা PSEN2-এর নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গেলে 65 বছরের আগেই আলঝাইমার্স হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি হতে পারে। তবে এই ধরনের জিনগত আলঝাইমার্স অত্যন্ত বিরল।
তাই পরিবারের কোনও একজনের 75 বা 80 বছর বয়সে আলঝাইমার্স হয়েছিল বলেই নিজের শরীরে এমন কোনও ‘মারণ জিন’ রয়েছে ধরে নেওয়ার কারণ নেই। বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল, পরিবারে কত জন আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের বয়স কত ছিল এবং কয়েক প্রজন্ম ধরে একই ধরনের রোগের পুনরাবৃত্তি হয়েছে কি না।
আর একটি ভুল ধারণা ভাঙা জরুরি। অল্প বয়সে আলঝাইমার্স হলেই যে APP, PSEN1 বা PSEN2-এর মিউটেশন রয়েছে, এমন নয়। 65 বছরের আগেও আলঝাইমার্স হতে পারে, কিন্তু সেই সব ঘটনার বড় অংশের পিছনে এই তিনটি নির্দিষ্ট জিন থাকে না। ফলে শুধু বয়স কম বলে জিনগত রোগ ধরে নেওয়াও ঠিক নয়।
তা হলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী? উত্তর, বয়স। বয়স বাড়ার সঙ্গে আলঝাইমার্সের ঝুঁকি বাড়ে। তবে বয়স বাড়া মানেই আলঝাইমার্স হওয়া নয়। NIA-র তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ আলঝাইমার্স রোগীর বয়স 65 বা তার বেশি; 65 বছরের আগে শুরু হওয়া ঘটনা মোট আক্রান্তের 10%-এরও কম।
বয়সের বাইরে আরও কিছু কারণ নিয়ে গবেষণা হয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির সমস্যা, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অস্বাস্থ্যকর মদ্যপান, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং বায়ুদূষণ- এসব কারণ ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ জিন গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুরো গল্পটা জিনের নয়।
সবার জন্য উত্তর ‘হ্যাঁ’ নয়। বিশেষ করে উপসর্গহীন কোনও ব্যক্তির APOE পরীক্ষা করলেই ভবিষ্যতে আলঝাইমার্স হবে কি না, তার নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যায় না। পরীক্ষার ফল সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বলতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না। তাই শুধু কৌতূহল থেকে জেনেটিক পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট হাতে তুলে নেওয়া সব সময় অর্থবহ নয়। রিপোর্টের ব্যাখ্যা নিয়েও চিকিৎসক বা জেনেটিক কাউন্সেলরের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।
তবে পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে সেই সব পরিবারে, যেখানে একাধিক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় অস্বাভাবিক কম বয়সে আলঝাইমার্সে আক্রান্ত হয়েছেন। এমন ক্ষেত্রে নিউরোলজিস্ট, জেরিয়াট্রিশিয়ান বা জেনেটিক কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলে APP, PSEN1 বা PSEN2-এর মতো নির্দিষ্ট জিনের পরীক্ষা প্রয়োজন কি না, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। পরীক্ষার আগে জেনেটিক কাউন্সেলিংও গুরুত্বপূর্ণ।
আবার APOE পরীক্ষার চিকিৎসাগত ব্যবহার নিয়ে একটি আলাদা দিকও সামনে এসেছে। আলঝাইমার্সের উপসর্গ থাকা কিছু রোগীকে নির্দিষ্ট অ্যামাইলয়েড-লক্ষ্যযুক্ত চিকিৎসা দেওয়ার কথা বিবেচনা করার সময় চিকিৎসকেরা APOE status ব্যবহার করে কিছু চিকিৎসাজনিত ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারেন। অর্থাৎ APOE পরীক্ষা শুধুই ‘আমার ভবিষ্যতে রোগ হবে কি না’ জানার পরীক্ষা নয়; চিকিৎসার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এর ভূমিকা থাকতে পারে।
প্রথম কাজ আতঙ্কিত না হয়ে পারিবারিক ইতিহাসটা পরিষ্কার ভাবে জানা। কার আক্রান্ত হওয়ার সময় বয়স কত ছিল, পরিবারের আর কেউ আক্রান্ত হয়েছেন কি না, একাধিক প্রজন্মে এমন ঘটনা ঘটেছে কি না, এই তথ্য চিকিৎসকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিজের রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, ওজন এবং সামগ্রিক হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান বন্ধ করা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ-ডায়াবেটিস-কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক ভাবে সক্রিয় থাকা, মানসিক ভাবে সক্রিয় থাকা এবং শ্রবণশক্তির সমস্যা থাকলে তার চিকিৎসা- এসব অভ্যাস সুস্থ বার্ধক্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। WHO-র 2026 সালের নির্দেশিকাতেও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে পরিবর্তনযোগ্য এই ধরনের কারণগুলির উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, DNA-তে ঝুঁকি থাকতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ পুরোপুরি লেখা থাকে না। APOE ε4 ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কিন্তু রোগ নিশ্চিত করে না। APP, PSEN1 এবং PSEN2-এর বিরল মিউটেশন কিছু পরিবারে বংশগত আলঝাইমার্সের শক্তিশালী কারণ হতে পারে, কিন্তু সেই ঘটনাও অত্যন্ত বিরল। আর অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে বয়স, জিন, হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য, জীবনযাপন এবং পরিবেশ—সবকিছুর মিলিত প্রভাবেই তৈরি হয় রোগের ঝুঁকি।
তাই পরিবারের ইতিহাসে আলঝাইমার্স থাকলে প্রশ্নটা শুধু ‘আমার DNA-তে কী আছে?’ নয়। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আমার সামগ্রিক ঝুঁকি কতটা এবং এখন থেকেই কোন কোন ঝুঁকি কমানো সম্ভব? সেই উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা, প্রয়োজন হলে জেনেটিক কাউন্সেলিং এবং নিজের জীবনযাপনের দিকে নজর। কারণ জিন হয়তো ঝুঁকির দরজা খুলতে পারে, কিন্তু আলঝাইমার্সের পুরো গল্পটি শুধু DNA দিয়ে লেখা নয়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
