৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বৃষ্টি মানেই ডুববে কলকাতা?

কলকাতার দুর্ভোগের জলছবি। ছবি - Google

বৃষ্টি মানেই ডুববে কলকাতা?

calender icon 2 ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

শরতের মেঘে ফের প্রশ্ন- কবে বদলাবে কলকাতার জলযন্ত্রণা?

কলকাতা শহরের নিকাশি ব্যবস্থার বড় অংশের নকশা বহু দশক আগে তৈরি। মূল নিকাশি নেটওয়ার্কের একটি অংশ এমন সময় তৈরি হয়েছিল, যখন কলকাতার জনসংখ্যা, নির্মাণ এবং কংক্রিটের বিস্তার আজকের তুলনায় অনেক কম ছিল। মূল নিকাশি ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছিল ঘণ্টায় প্রায় 6 মিলিমিটার বৃষ্টির জল সামলানোর ক্ষমতা ধরে। ফলে আজকের কলকাতায় অল্প সময়ের মধ্যে তার চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টি হলেই চাপে পড়ে গোটা ব্যবস্থা।

মূল বিষয়

রাতভর বৃষ্টি। সকালেও থামার লক্ষণ নেই। শরতের আকাশে ফের বর্ষার মেজাজ। কোথাও হাঁটু জল, কোথাও রাস্তা আর নিকাশি নালা একাকার। গাড়ির চাকা ডুবে গিয়েছে জলে, ফুটপাথের অস্তিত্ব নেই। অফিসযাত্রী থেকে স্কুলপড়ুয়া, ভোগান্তির ছবিটা যেন প্রতি বর্ষাতেই এক। তাই প্রশ্নটাও পুরনো, বৃষ্টি হলেই কি কলকাতা ডুববে?

এ বারও সেই প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে গভীর নিম্নচাপ। উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে তৈরি হওয়া গভীর নিম্নচাপ স্থলভাগে ঢোকার পর তার প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি হয়েছে। কলকাতাতেও দফায় দফায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস। ইতিমধ্যেই শহরের একাধিক এলাকা জলমগ্ন। আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর।

প্রতিবার বৃষ্টি হলেই কেন একই ছবি?

উত্তরটা শুধু ‘বেশি বৃষ্টি’তে আটকে নেই। কলকাতা পুরসভার তথ্য বলছে, শহরের নিকাশি ব্যবস্থার বড় অংশের নকশা বহু দশক আগে তৈরি। মূল নিকাশি নেটওয়ার্কের একটি অংশ এমন সময় তৈরি হয়েছিল, যখন কলকাতার জনসংখ্যা, নির্মাণ এবং কংক্রিটের বিস্তার আজকের তুলনায় অনেক কম। পুরসভার তথ্য অনুযায়ী, মূল নিকাশি ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছিল ঘণ্টায় প্রায় 6 মিলিমিটার বৃষ্টির জল সামলানোর ক্ষমতা ধরে। আজকের কলকাতায় অল্প সময়ের মধ্যে তার চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টি নামলেই চাপ পড়ে গোটা ব্যবস্থায়।

বদলেছে শহরের চরিত্রও

তার উপর বদলে গিয়েছে শহরের চরিত্র। একের পর এক বাড়ি, রাস্তা, পার্কিং এলাকা, কংক্রিটের পরত- সব মিলিয়ে বৃষ্টির জল মাটিতে ঢোকার সুযোগ কমেছে। যে জল এক সময়ে মাটিতে শুষে যেত, তার বড় অংশ এখন সরাসরি নিকাশি ব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি করে। কলকাতা এবং তার আশপাশের জলাভূমির পরিবর্তনও এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ সমস্যা যেন একদিকে জল ঢোকার গতি, অন্য দিকে জল বেরোনোর ক্ষমতা। আকাশ থেকে অল্প সময়ে বিপুল জল নামছে। সেই জল দ্রুত নামানোর মতো পরিকাঠামো সর্বত্র নেই। কোথাও আবার নিকাশি নালায় পলি, কোথাও আবর্জনা, কোথাও গালিপিটের মুখ বন্ধ। ফলে বৃষ্টির জল রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে থাকার সময় আরও বাড়ছে।

জল নামানোর লড়াই!

শহরকে জলমুক্ত রাখতে অবশ্য প্রতি বছরই পুরসভার তরফে পাম্প বসানো হয়, নিকাশি নালা পরিষ্কার করা হয়, জলমগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত কর্মী মোতায়েন করা হয়। ভারী বৃষ্টির সময়ে দ্রুত জল নামানোর জন্য পোর্টেবল পাম্পও নামানো হয়। কিন্তু সেই ব্যবস্থাগুলি মূলত জরুরি পরিস্থিতি সামলানোর উপায়। প্রশ্ন হল, জল জমার কারণটাই যদি থেকে যায়, তা হলে প্রতি বছর একই ভাবে জল নামানোর লড়াই কত দিন চলবে?

বদলাচ্ছে বৃষ্টির ধরনও

এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বৃষ্টির ধরন বদলানোর কারণে। অল্প সময়ে অত্যন্ত বেশি বৃষ্টি, যাকে আবহাওয়াবিদেরা ‘ইনটেন্স রেইনফল’ বলেন, শহরের নিকাশির উপর আচমকা বিপুল চাপ তৈরি করে। 2025 সালের সেপ্টেম্বরেও কলকাতায় অল্প সময়ে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির পর বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়েছিল। সেই ঘটনাকে সামনে রেখে বিশেষজ্ঞদের একাংশ পুরনো নিকাশি কাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং জল বেরোনোর মূল পথগুলির বহনক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।

শুধু নালা বড় করলেই অবশ্য সমস্যার সমাধান হবে না। কলকাতার চারপাশের খাল, জলাভূমি এবং প্রাকৃতিক জলধারণের জায়গাগুলিও এই ব্যবস্থার অংশ। শহরের ভিতর যত জল দ্রুত ঢোকে, তার একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত খাল ও জলাশয়ের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। সেই পথ সংকুচিত হলে বা জলধারণের জায়গা কমে গেলে চাপ গিয়ে পড়ে রাস্তায়।

চায় জল নিষ্কাশনের সামগ্রিক পরিকল্পনা

সেই কারণেই কলকাতার জল-নিকাশি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রশ্নটি এখন শুধুমাত্র ‘আরও পাম্প চাই কি না’- এতে সীমাবদ্ধ নয়। পুরনো নিকাশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, বড় নালার বহনক্ষমতা বৃদ্ধি, খাল সংস্কার, জলাভূমি রক্ষা এবং নতুন নির্মাণের সঙ্গে জল নিষ্কাশনের পরিকল্পনা—সব কিছুকে একসঙ্গে দেখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম বৃষ্টির ঘটনা বাড়তে পারে, এই সম্ভাবনাকেও ভবিষ্যৎ পরিকাঠামো পরিকল্পনায় বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

তাই আজকের বৃষ্টি শুধু আজকের জলযন্ত্রণা নয়। এটি কলকাতার সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন রেখে যায়। শহর কি প্রতি বার বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় থাকবে? নাকি বৃষ্টি নামার আগেই এমন ব্যবস্থা তৈরি হবে, যাতে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি শহরকে অচল করে দিতে না পারে? কারণ কলকাতার মানুষের কাছে প্রশ্নটা আর ‘আজ জল কতটা জমবে?’ নয়। প্রশ্নটা আরও গভীর, বৃষ্টি হলেই কলকাতা ডুববে—এই পুরনো ধারণাটাই বা বদলাবে কবে?

ইতিমধ্যে রাজ্যে পালাবদল ঘটেছে ৷ এখন কলকাতা পুরসভার দায়িত্বে প্রশাসক৷ সব কিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের শেষে হতে পারে পুরভোট৷ সেক্ষেত্রে ভোটের পর শহরের নিকাশি সমস্যার সমাধানে পুর কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ করেন, সেদিকেই নজর থাকবে শহরবাসীর৷ বাসিন্দাদের একটাই বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি নয়, এবার তাঁর হাতে কলমে শহরের নিকাশী সমস্যার সমাধান দেখতে চান৷

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
সৌমালী চক্রবর্তী
সৌমালী চক্রবর্তী

2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য