

জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে এই বিতর্ক কি হওয়ারই ছিল? ছবি - Google
২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ভারতের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতি ও সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই সহকর্মী কমিশনারের আপত্তি ফাঁসের ঘটনায় গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। দেশজুড়ে বিতর্কিত 'এসআইআর' প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি নাম বাদ পড়া এবং প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে নতুন নিয়মে কমিশনার নিয়োগের পটভূমিতে বিরোধীরা একে নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা হনন বলে তোপ দেগেছেন। সাংবিধানিক নিয়ম ভেঙে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এই অভিযোগ বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের শীর্ষ নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই এখন বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অহংকার ছিল তার অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা। আর সেই কাঠামোর মেরুদণ্ড ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। তবে সাম্প্রতিক এক জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা যেকোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকের কপালে গভীর ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। অভিযোগ উঠেছে, কমিশনের ভেতর থেকেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার গুপ্তের একনায়কতান্ত্রিক কার্যপদ্ধতির বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীকে কার্যত অন্ধকারে রেখে একের পর এক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার যে বয়ান সামনে এসেছে, তা স্বাধীন ভারতের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন সংকট।
সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা হয়েছে—কমিশনের সব সদস্য সমমর্যাদার। কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হলে তা হতে হবে সর্বসম্মত, অথবা অন্তত সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে। অথচ তথ্য বলছে, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার দুই কমিশনারকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই তিক্ত রূপ নেয় যে, তাঁরা খোদ ক্যাবিনেট সচিবের কাছে চিঠি পাঠাতে বাধ্য হন।
এখানে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—যেখানে তিনজন শীর্ষ কর্মকর্তার যৌথ সিদ্ধান্তে দেশ চলার কথা, সেখানে একা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কীভাবে সব সিদ্ধান্ত কব্জা করলেন? কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্র্য আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? নির্বাচন কমিশন যদিও বিবৃতি দিয়ে একে "অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ও স্বাভাবিক আলোচনা" বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু নীতিগত বিরোধ আর তথ্য গোপন করে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে, তা আর কারও অজানা নয়।
কমিশন দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য যে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) চালাচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। উদ্দেশ্য হিসেবে মৃত, স্থানান্তরিত বা জাল ভোটার বাদ দেওয়ার কথা বলা হলেও, বাস্তবে এই প্রক্রিয়ায় দেশজুড়ে বাদ পড়েছে প্রায় ১২ থেকে ১৩ কোটি ভোটারের নাম।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এই জটিল প্রক্রিয়ায় যেসব নথিপত্র চাওয়া হচ্ছে, তা প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের কাছে থাকা অসম্ভব। বিরোধীদের স্পষ্ট অভিযোগ—কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপিকে সুবিধা করে দিতেই সুপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। খোদ পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম কাটার পর নির্বাচন পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; একই সুরে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এই ঘটনাকে গণতন্ত্রের সঙ্গে ‘দেশদ্রোহিতা’ বলে আখ্যা দিয়ে সিইসি-র পদত্যাগ ও বিচার দাবি করেছেন। যখন অভ্যন্তরীণ স্তরেই দুই কমিশনার এই ভোটার তালিকার বিশুদ্ধতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আপত্তি তুলছিলেন, তখন স্পষ্ট হয় যে বিরোধীদের সংশয় একেবারে অমূলক ছিল না।
সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পরিচিতি ও অতীত প্রশাসনিক ভূমিকা খতিয়ে দেখলে এই প্রশ্নগুলো আরও ঘনীভূত হয়। ১৯৮৮ ব্যাচের কেরল ক্যাডারের এই আইএএস অফিসার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের একজন নির্ভরযোগ্য আমলা হিসেবেই ক্ষমতার অলিন্দে তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে।
কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিলের নেপথ্যে যে প্রশাসনিক ও আইনি ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হয়েছিল, ব্লুক্র্যাফট ডিজিটাল ফাউন্ডেশনের বই অনুযায়ী জ্ঞানেশ কুমার ছিলেন সেই ‘ক্র্যাক টিম’-এর অন্যতম সদস্য। এছাড়া বিতর্কিত রাম মন্দির ট্রাস্ট গঠন ও সমবায় মন্ত্রকের মাধ্যমে রাজ্যগুলির সমবায় সংস্থাকে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রক্রিয়ায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অবসর নেওয়ার মাত্র দেড় মাসের মাথায় তাঁকে তড়িঘড়ি নির্বাচন কমিশনার পদে বসানো হয়—তা-ও ঠিক এমন এক সময়ে, যখন লোকসভা নির্বাচনের ঠিক মুখে কমিশনার অরুণ গোয়েল পদত্যাগ করেছিলেন। আনুগত্যের এই সমীকরণ কমিশনের নিরপেক্ষতার ধারণার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা আজ জনমানসে বড় প্রশ্ন।
এই সংকটের মূল প্রোথিত রয়েছে ২০২৩ সালের বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনে। ২০২৩ সালের মার্চে সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট জানিয়েছিল—কমিশনের ওপর নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র প্রভাব কমাতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটিই কমিশনারদের নিয়োগ করবে। কিন্তু মোদী সরকার সেই নির্দেশকে পাশ কাটিয়ে সংসদের মাধ্যমে এমন আইন তৈরি করল, যেখান থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে বসানো হলো একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে। ফলে নিয়োগ কমিটির সমীকরণ দাঁড়াল দুই বনাম এক—অর্থাৎ সরকারের ইচ্ছাই সেখানে শেষ কথা। সংবিধানে বি আর আম্বেদকর যে নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ শাসনবিভাগীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখার স্বপ্ন দেখেছিলেন, বর্তমান আইন তাকে সরাসরি ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলি আসবে-যাবে, কিন্তু শাসনতন্ত্রের স্তম্ভগুলো যদি নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে, তবে সেই ক্ষতের নিরাময় বহু প্রজন্মেও সম্ভব হয় না। নির্বাচন কমিশনের সদর দফতর ‘নির্বচন সদন’ যদি কেবল ক্ষমতাসীন দলের নির্দেশের বাস্তবায়ন কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবে সাধারণ নাগরিকের ব্যালটের ওপর আস্থা থাকবে কেন?
আজ নির্বাচন কমিশন আত্মপক্ষ সমর্থনে পরিসংখ্যান আওড়াতে পারে, কিংবা বিজেপি একে বিরোধীদের "ষড়যন্ত্র" আখ্যা দিতে পারে; কিন্তু বাস্তব এটাই যে কমিশনের ভেতর থেকেই আজ পচনের গন্ধ বের হচ্ছে। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া শুধু কোনো রাজনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি নাগরিকের সার্বভৌম অস্তিত্বের ওপর আঘাত। জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ করবেন কি করবেন না, তা হয়তো রাজনৈতিক সমীকরণে নির্ধারিত হবে, কিন্তু নিরপেক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থার যে মর্যাদা ধুলোয় মিশে গেল, তা পুনরুদ্ধার করা স্বাধীন ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
