

২৮ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর দেশে জুড়ে ব্যাঙ্ক ধর্মঘট। ছবি - Google
২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সরকারের সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পরই একাধিক দাবি দাওয়া নিয়ে আগামী ২৮ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কগুলির কর্মী ও আধিকারিকদের যৌথ মঞ্চ। তারা সরকারের বিরুদ্ধে চুক্তি না মানার মতো গুরুতর অভিযোগ এনেছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ রবিবার ব্যাঙ্ক খোলা থাকবে বলে নির্দেশিকা জারি করেছে কেন্দ্র।
গণেশ চতুর্থী চলে গিয়েছে মানে দেশে উৎসবের মরশুম শুরু হয়ে গিয়েছে। বাংলায় তো এখন দুর্গাপুজোর কেনাকাটা তুঙ্গে উঠেছে। এমন সময় সাধারণ মানুষের হাতে টাকার দরকার সবচেয়ে বেশি থাকে। অথচ এই অবস্থায় দেশে টানা পাঁচ দিন যাবতীয় ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকা আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল! টানা পাঁচ দিন না বন্ধ থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্ক কর্মচারী ও অফিসারদের যৌথ মঞ্চের ডাকে টানা তিনটে কাজের দিন ধর্মঘটের জেরে কার্যত বন্ধ থাকতে চলেছে দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা।
আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ শনিবার। তার পরের দিন রবিবার। এই দু'দিনের সাধারণ ছুটির ঠিক পরেই ২৮ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ সামনের সপ্তাহের সোমবার থেকে বুধবার টানা তিন দিনের ব্যাঙ্ক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ইউনাইটেড ফোরাম অফ ব্যাঙ্ক ইউনিয়নস (UFBU)। সব মিলিয়ে টানা পাঁচ দিন ব্যাঙ্ক পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে। ব্যাঙ্ক কর্মী ও অফিসারদের মোট সাতটি সংগঠনের এই যৌথ মঞ্চ কেন এমন চরম পথে হাঁটল তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে গ্রাহকদের দুর্ভোগ কমাতে কেন্দ্রীয় সরকারও হাত গুটিয়ে বসে নেই।
ব্যাঙ্ক ধর্মঘটের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজের দাবি। বর্তমানে ব্যাঙ্কগুলোতে মাসের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ শনিবার ছুটি থাকে। বাকি শনিবারগুলোতে কর্মীদের পুরো দিনই কাজ করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাঙ্ক ইউনিয়নগুলো দাবি করে আসছে, আইটি সেক্টর বা অন্যান্য সরকারি অফিসের মতো তাদেরও সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজের সুযোগ দিতে হবে।
এই দাবি পূরণের লক্ষ্যে গত ২০২৪ সালের ৮ মার্চ একটি বড়সড় অগ্রগতিও হয়। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের সংগঠন ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কস অ্যাসোসিয়েশনের (IBA) সঙ্গে ইউনিয়নগুলির দ্বাদশ দ্বিপাক্ষিক বেতন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেখানে একটি নীতিগত সমঝোতা হয়। স্থির হয়েছিল, শনি ও রবিবারের ছুটির ক্ষতিপূরণ হিসেবে সপ্তাহে বাকি পাঁচ দিন প্রতিদিন ব্যাঙ্কের কাজের সময় ৪০ মিনিট করে বাড়ানো হবে। কর্মীরা বাড়তি সময় কাজ করতে রাজি হন, যাতে সাপ্তাহিক ব্যাঙ্কিং পরিষেবার মোট সময় কম না হয় এবং গ্রাহকদের অসুবিধা না হয়। কিন্তু সমস্যা বাঁধে এর পর। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এটি কার্যকর করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ মন্ত্রকের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন। অথচ মাসের পর মাস কেটে গেলেও সরকার এই বিষয়ে কোনও নির্দেশিকা জারি করেনি। মাঝখানে দু'বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। সরকারের এই দীর্ঘসূত্রিতা কর্মীদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
কাজের দিন কমানোর পাশাপাশি পারফরম্যান্স লিঙ্কড ইনসেনটিভ বা PLI নিয়ে প্রবল অসন্তোষ তৈরি হয়েছে ব্যাঙ্ক কর্মী ও আধিকারিকদের মধ্যে। ব্যাঙ্কের বার্ষিক আর্থিক ফলাফলের উপর ভিত্তি করে কর্মীদের বেসিক পে-এর নির্দিষ্ট শতাংশ অতিরিক্ত উৎসাহভাতা হিসেবে দেওয়া হয়। ব্যাঙ্কের লাভ বাড়লে কর্মীরাও তার ভাগ পাবেন, এটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
সম্প্রতি এই ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন নিয়মে উপরেরতলার আধিকারিকদের বেশি সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে নিচুতলার অফিসার এবং সাধারণ কর্মীদের এর আওতা থেকে বাদ দেওয়া বা তাদের প্রাপ্য ইনসেনটিভ কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই বিষয়ে ইউনিয়নগুলোর বক্তব্য হল, একটি ব্যাঙ্কের ব্যবসা বৃদ্ধি কোনও একক আধিকারিকের কৃতিত্ব নয়। কাউন্টারে বসা ক্যাশিয়ার থেকে শুরু করে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই ব্যাঙ্কের মুনাফা হয়। তাই ইনসেনটিভ দেওয়ার ক্ষেত্রে পদমর্যাদা অনুযায়ী এমন বৈষম্য সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
এছাড়াও আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি রয়েছে।অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ককর্মীদের জন্য বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন কাঠামো আপডেট করার কথা বারবার বলা হয়েছে। বর্তমানে ২০ বছর আগে অবসর নেওয়া কর্মী এবং সাম্প্রতিককালে অবসর নেওয়া কর্মীদের পেনশনের মধ্যে বিশাল তারতম্য রয়েছে। পাশাপাশি ন্যাশনাল পেনশন স্কিমের বদলে পুরনো পেনশন স্কিমে ফিরে যাওয়ার দাবিও রাখা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে ইউনাইটেড ফোরাম অফ ব্যাঙ্ক ইউনিয়নসের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা জানিয়েছে, ধর্মঘট প্রথম পছন্দ নয়। এটি নেহাতই শেষ অস্ত্র। সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলা বা গ্রাহকদের হয়রানি করা তাদের একেবারেই উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু দীর্ঘ আলাপ আলোচনা ও চুক্তি হয়ে যাওয়ার পরেও সরকার যেভাবে সাপ্তাহিক কাজের দিনের বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রেখেছে তাতে তাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। নিজেদের ন্যায্য অধিকার এবং সম্মান আদায়ের লড়াইয়ে তাই ধর্মঘট করতে তারা বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে আগামী এক মাসের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে ২৬ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের ব্যাংক ধর্মঘটের পথে হাঁটবে।
উল্লেখ্য, ইউনাইটেড ফোরাম অফ ব্যাঙ্ক ইউনিয়নসের দাবি মতো, দেশের সর্বক্ষেত্র, সর্বস্তরের ব্যাঙ্ক কর্মী ও আধিকারিকদের মধ্যে ৯০% এর বেশি তাদের সংগঠনের ছাতার তলায় আছে। মূলত বেসরকারি ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রের একটি অংশের কর্মী ও আধিকারিকরা এই ধর্মঘটের শামিল হচ্ছে না বলে জানা গিয়েছে।
টানা পাঁচ দিন ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকলে দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। সেটা সরকার খুব ভালো করেই জানে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে আসরে নেমেছে অর্থ মন্ত্রক এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। একটি নজিরবিহীন নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর রবিবার দেশের সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক এবং আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাঙ্কগুলি সম্পূর্ণ খোলা থাকবে।
স্বাভাবিক কাজের দিনের মতোই রবিবার ব্যাঙ্কগুলোতে কাজকর্ম চলবে। শুধু শাখাগুলোই নয়, ব্যাঙ্কের কারেন্সি চেস্ট এবং এটিএম লিঙ্কড ব্রাঞ্চগুলোকেও পুরোদমে সচল রাখার কড়া নির্দেশ দিয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। অর্থ মন্ত্রক ইতিমধ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে চিঠি দিয়ে ব্যাঙ্কের ডেটা সেন্টার ও চেক ক্লিয়ারিং সেন্টারের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বলেছে।
তবে বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির শাখা রবিবার খোলা থাকবে কিনা সেটা সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
সরকারের এই দ্রুত পদক্ষেপের ফলে গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে। ধর্মঘট শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিন ব্যাঙ্কে গিয়ে জরুরি চেক জমা দেওয়া বা ডিমান্ড ড্রাফট তৈরির মতো কাজগুলো সহজেই সেরে ফেলা যাবে। ফিজিক্যাল নথিপত্র জমা দেওয়ার কাজও মিটে যাবে ছুটির দিনে। কারেন্সি চেস্ট খোলা থাকায় এটিএমগুলোতে পর্যাপ্ত টাকা ভরে রাখা সম্ভব হবে। ফলে ধর্মঘটের তিন দিন ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকলেও গ্রাহকদের অন্তত নগদ টাকার সঙ্কটে খুব বেশি ভুগতে হবে না।
এই রবিবার ব্যাঙ্ক খোলা রাখার পেছনে সরকারের দিক থেকে আরও একটি বড় কারণ রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ব্যাঙ্কগুলোর অর্ধবার্ষিক হিসাব বা হাফ ইয়ার্লি ক্লোজিংয়ের শেষ দিন। এই সময়ে ট্রেজারি অপারেশন থেকে শুরু করে ব্যালেন্স শিট মেলানো এবং প্রভিশনিংয়ের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল কাজ থাকে। রবিবার ব্যাঙ্ক খোলা রেখে সরকার মূলত সেই চাপ অনেকটাই কমিয়ে ফেলতে চাইছে। দেশের অর্থনৈতিক লেনদেনের ধারা অব্যাহত রাখা এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি কমানোই সরকারের মূল লক্ষ্য। এই অবস্থায় মাসের শেষে বেতন হতে যাতে কোনরকম সমস্যা না হয়, তার জন্য চলতি মাসের ২৫ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ শুক্রবার কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের সেপ্টেম্বর মাসের বেতন মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে।
অবশ্য সরকারের এই পদক্ষেপকেও ভালোভাবে নেয়নি ধর্মঘটী ব্যাঙ্ক সংগঠনগুলো। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ব্যাঙ্ক খোলা রাখার এই সিদ্ধান্তকে অমানবিক বলে তীব্র সমালোচনা করেছে তারা। তাদের মতে, এটি কর্মীদের প্রাপ্য ছুটি কেড়ে নেওয়া এবং ন্যায্য আন্দোলনকে দুর্বল করার একটি মরিয়া কৌশল মাত্র।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
