

জানবাজার রাজবাড়ির তিনটি দুর্গাপুজো। ছবি - Google
২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কলকাতার ঐতিহাসিক জানবাজার রাজবাড়িটি উনিশ শতকে বাবু প্রীতরাম দাস ও তাঁর পুত্র রাজচন্দ্র দাস নির্মাণ করেন, যার হাল পরবর্তীকালে ধরেন মহীয়সী রানি রাসমণি। বিশাল এই রাজপ্রাসাদে প্রায় তিনশত কক্ষ ও ছয়টি উঠোন রয়েছে। রানি রাসমণির মৃত্যুর পর তাঁর চার কন্যার পরিবারের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ হয়ে যাওয়ায়, সেই ঐতিহ্য মেনে আজও একই রাজবাড়ির আলাদা তিনটি ঠাকুরদালানে প্রতি বছর পৃথকভাবে তিনটি ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়।
কলকাতার অলিগলিতে ছড়িয়ে রয়েছে কত শত ইতিহাস, কত ঐতিহ্য আর রাজকীয় স্মৃতি। সেই সব ঐতিহাসিক অধ্যায়ের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল এক নাম— রানি রাসমণি এবং মধ্য কলকাতার বিখ্যাত জানবাজার রাজবাড়ি। দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী কালীমন্দিরের প্রতিষ্ঠাত্রী হিসেবে বাঙালি রানি রাসমণিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে, কিন্তু তাঁর বাসভবন জানবাজার রাজবাড়ির দুর্গোৎসবের রূপটিও কম চিত্তাকর্ষক নয় । কলকাতার বুকে এই রাজবাড়িটি এমন এক বিরল স্থান, যেখানে আজও প্রতি বছর এক ছাদের নিচে অনুষ্ঠিত হয় তিনটি স্বতন্ত্র দুর্গাপূজা।
জানবাজার রাজবাড়ির ইতিহাস শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের সূচনালগ্নে। ১৮০৫ সালে ধনকুবের ব্যবসায়ী বাবু প্রীতরাম দাস এই সুবিশাল অট্টালিকা নির্মাণের কাজ শুরু করেন। পরবর্তীকালে ১৮১৩ সালে তাঁর যোগ্য পুত্র বাবু রাজচন্দ্র দাস এর নির্মাণ সম্পন্ন করেন। তৎকালীন কলকাতার বনেদি স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন ছিল এই বাড়িটি। প্রায় তিনশো ঘরবিশিষ্ট এই রাজপ্রাসাদে ছিল ছয়টি সুবিশাল উঠোন, চমৎকার ঠাকুরদালান, নাটমন্দির, অস্ত্রাগার এবং ভেতরের বিশাল একটি পুকুর।
বাবু রাজচন্দ্রের অকালপ্রয়াণের পর গোটা পরিবারের দায়িত্ব ও সুবিশাল জমিদারি এসে পড়ে তরুণী রানি রাসমণির কাঁধে। সে যুগে যখন সমাজে মেয়েদের ভূমিকা ঘরের চৌকাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হতো, তখন রানি রাসমণি দৃঢ় হাতে হাল ধরেন। তিনি কেবল দক্ষ শাসকই ছিলেন না, বরং সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। গঙ্গায় জেলেদের মাছ ধরার ওপর ব্রিটিশ সরকার অন্যায্য কর চাপালে তিনি রাজপথ ও জলপথ অবরুদ্ধ করে ঔপনিবেশিক শাসককে পিছু হটতে বাধ্য করেছিলেন। রাজা রামমোহন রায়ের সহযাত্রী হিসেবে সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ ও বাল্যবিবাহ রোধে ভূমিকা রাখা থেকে শুরু করে হিন্দু কলেজ ও ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরির মতো বিদ্যায়তনে মুক্তহস্তে দান— তাঁর জনহিতৈষী কীর্তি আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।
জানবাজারের দুর্গাপূজার আবহ বরাবরই ছিল আভিজাত্য ও ভক্তিপূর্ণ ঐতিহ্যের মিশেল। রানি রাসমণির মৃত্যুর পর তাঁর সুবিশাল সম্পত্তি তাঁর চার কন্যার উত্তরাধিকারী পরিবারের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। পরিবারের এই শাখা বিন্যাসের কারণেই কালক্রমে একই রাজবাড়ির আলাদা আলাদা অংশে স্বতন্ত্রভাবে পূজার আয়োজন শুরু হয়।
বর্তমানে জানবাজার রাজবাড়ির প্রাঙ্গণেই তিনটি পৃথক ঠাকুরদালানে প্রতি বছর শারদোৎসব উদযাপিত হয়। একই স্থাপত্যের আঙিনায় একযোগে বেজে ওঠে তিনটি ভিন্ন ঢাকের আওয়াজ, প্রজ্জ্বলিত হয় তিনটি পৃথক হোমকুণ্ডের শিখা। একই পরিবারের বংশধরেরা নিজস্ব রীতিনীতি ও নিষ্ঠা বজায় রেখে দেবী দুর্গাকে আবাহন জানান।
আজকের থিম পূজার ভিড়ে জানবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপূজা শহরবাসীকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় প্রাচীন কলকাতার বনেদি আভিজাত্যের দিনে। লাল মেঝে, খিলানযুক্ত থাম এবং সাবেকী প্রতিমার রূপ দর্শনার্থীদের মনে এক গভীর নস্টালজিয়া তৈরি করে। সময়ের স্রোতে শহর বদলে গেলেও জানবাজারের এই তিন পূজার ঐতিহ্য আজও অটুট, যা রানি রাসমণির স্মৃতি ও আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে কলকাতার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
