

দলিত হলেই কি সে সাবঅল্টার্ন হয়? ছবি - AI
৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কিছু না জানাটা বা কোনও কিছু ভুল করাটা একটুও অপরাধ নয়। কিন্তু ভুল ধরিয়ে দিলে সেটাকে উপেক্ষা করা এবং "ওটা তেমন কোনও ব্যাপার নয়" গোছের মনোভাব দেখানো আসলে মূর্খের অহঙ্কার। আর এই মূর্খরা প্রয়োজনে যখন-তখন খেলছে সাবঅল্টার্ন কার্ড। ফলে ভোঁতা হচ্ছে শোষিতের নিজস্ব প্রতিষ্পর্ধী সংস্কৃতি
শিক্ষা ও জ্ঞানের অহঙ্কার ঔদ্ধত্যের পরিচয় দেয়। কিন্তু মূর্খের আত্মম্ভরিতা?
তা স্রেফ অশিক্ষার দাদাগিরি ছাড়া আর কিছুই নয়।
কোনও কিছু না জানা, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকাটা বা অক্ষর জ্ঞান না থাকাটাও অপরাধের নয়। বিশেষ করে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে স্রেফ শিক্ষার নিক্তিতে মানুষকে বিচার করতে গেলে পদে পদে ঠকতে হবে। এখানে না আছে শিক্ষালাভের সমান সুযোগ, না আছে শিক্ষার মর্যাদা। এমনকি দেশের এমন বহু অঞ্চল আছে যেখানে নামকে ওয়াস্তে শিক্ষালাভের পথও এই একবিংশ শতকে এসেও প্রায় রুদ্ধ। তার উপর বিভিন্ন সরকার যেভাবে জোর কদমে নিজেদের দায় দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে শিক্ষায় বেসরকারি থাবা আরও মজবুত করার পথ বেছে নিয়েছে, তাতে দেশের নাগরিকদের একটা বড় অংশ যে শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে সবসময়ই বঞ্চিত থেকে যাবে, তা বিধির বিধানের মতোই অনিবার্য!
এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কে কতটা পুঁথিগত বিদ্যায় বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত তা দিয়ে এই ভারতে, এই ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় কিছুই নির্ধারিত হয় না। সেইসঙ্গে এখানে শিক্ষা কেন্দ্রিক আরেকটা সমস্যা আছে। একদল আছেন, যাঁরা প্রকৃত শিক্ষিত। কিন্তু এঁদের সংখ্যা অত্যন্ত কম। আর একটা বিরাট অংশ আছে যারা পুঁথিগত শিক্ষায় যথেষ্ট উচ্চশিক্ষিত, বড় বড় ডিগ্রি আছে। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত মাহাত্ম্য বরাবরের জন্য তাদের কাছে অধরা থেকে যায়। আরেকটা অংশ তো খুব পরিষ্কারভাবে অবস্থান করে, যারা সেই অর্থে শিক্ষার আলোটুকু পায়নি। তবে এই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত অংশটিকে আন্ডারএস্টিমেট বা অবহেলা করার কোনও জায়গা নেই। কারণ এনাদের জীবন উপলব্ধি এতটাই গভীর যে, তা বহু তথাকথিত শিক্ষিত সারাটা জীবন সাধনা করেও তা অর্জন করতে পারেন না।
জাতপাত ও ধর্মীয় বিভাজনে বিধ্বস্ত ভারতে তথাকথিত নিম্ন শ্রেণির এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া একটা বিপুল অংশের মানুষ আজীবন শুধু শোষিত হয়েই আসছে। না তারা ক্ষমতার পরিসরে নিজেদের ছাপ রাখতে পারে (সেই সুযোগটা তাদের দেওয়াও হয় না), না তাদের সঠিকভাবে পড়াশোনা করিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেওয়া হয়, না তাদের উপযুক্ত সম্মান দিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকারটুকু দেয় এতদিন ধরে ক্ষমতার ছড়ি ঘুড়িয়ে আসা উচ্চবর্ণের উচ্চবিত্তরা।
ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিম্ন বর্ণের উচ্চকিত সংস্কৃতির একটা পাল্টা প্রসার এই দেশে ঘটেছে। যা সাবঅল্টার্ন কালচার নামে পরিচিত। শোষণের প্রতিস্পর্ধী হিসেবে এমন সংস্কৃতের বিকাশ ঘটাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যতদিন যাচ্ছে শোষিতের এই সংস্কৃতি একাংশের হাতে ধরে ন্যাক্কারজনক ও কুৎসিত গাজোয়ারির চর্চায় পরিণত হচ্ছে। মজার ব্যাপার হল, বিষয়টা ঘটছে শোষিতদের একটা অংশের হাত ধরেই। কিন্তু তা চালাচ্ছে বা তাদের সুতো বাঁধা শোষকের হাতে।
সাবঅল্টার্নের নামে একটি অংশের মধ্যে গাজোয়ারি ডালপালা মেলতে মেলতে এখন দেশের তথাকথিত নামজাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যন্ত প্রসার লাভ করেছে। তার একটা উৎকৃষ্ট নমুনা দেখা গিয়েছে বছরখানেক আগে সাবঅল্টার্ন কালচার নিয়ে এই দেশে চর্চার অন্যতম পথিকৃৎ গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের একটি সেমিনারে।
দিল্লির বুকে আয়োজিত ওই সেমিনারে আলোচনার প্রাথমিক পর্ব শেষ হয়ে যখন উপস্থিত শ্রোতাদের কাছ থেকে প্রশ্ন নেওয়া হচ্ছিল, সেই সময় অংশুল কুমার নামে এক শ্রোতা উঠে দাঁড়িয়ে গায়ত্রীকে প্রশ্ন করতে যান। কিন্তু সেদিন যার উপর আলোচনা হচ্ছিল, সেই মার্কিন সমাজতত্ত্ববিদ ডব্লিউ. ই. বি. ডু বয়েস (W.E.B. Du Bois)-এর নামটাই অংশুল ভুল উচ্চারণ করেন। গায়ত্রী অংশুলকে থামিয়ে সেই ভুল উচ্চারণ শুধরে দেন। তাতে ওই ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া ছিল খানিকটা এমন, "ও ঠিক আছে। এইসব ছোটখাটো ব্যাপার সরিয়ে রেখে যদি আমরা মূল কথায় যেতে পারি..."
ব্যাপারটি মোটেও গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের পছন্দ হয়নি। যে কোনও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন বিদ্বান মানুষের এমন প্রতিক্রিয়া পছন্দ না হওয়ারই কথা। তিনি আবার ওই ব্যক্তিকে উচ্চারণ শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাতে উপস্থিত বাকি শ্রোতাদের মধ্যে একটু হাসির উদ্রেক ঘটে অংশুলকে নিয়ে। কিন্তু ফের তিনি আগের মতোই প্রতিক্রিয়া দেন। যেন উচ্চারণের ভুলটা কার কাছে কোন ব্যাপার না। সেটা ওনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নাই হতে পারে। কিন্তু সভার প্রধান আলোচক সেই দিকে যখন নির্দেশ করছেন, তখন "ও তেমন কোনও ব্যাপার নয়" গোছের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত আপত্তিকর এবং দূর্বীনীত আচরণের প্রমাণ। এরপর অংশুল কুমার ফের কথা এগোনোর চেষ্টা করেন। তাতে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক তাঁকে থামিয়ে অন্য একজনের দিকে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়ে দেন।
এই ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়া এক্স প্ল্যাটফর্মে অংশুল কুমার নিজেকে দলিত পরিচয় দিয়ে গায়ত্রী চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে কার্যত কণ্ঠরোধ করার অভিযোগ আনেন। অনেক দলিত আন্দোলন কর্মী ও দলিত সাহিত্যিক এই বিষয়ে গায়ত্রীকে কাটগড়ায় তোলেন। এনাদের সকলেরই বক্তব্য ছিল, ঠিক এইভাবেই উচ্চবর্ণের এবং উচ্চবিত্তের মানুষেরা দরিদ্রের কন্ঠরোধ করার চেষ্টা করে। সেই কারণেই ইংরেজি উচ্চারণের মতো একটি সাধারণ বিষয়কে হাতিয়ার করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, অন্যের চোখে হাসির পাত্র করে তোলা হয়।
কিন্তু ভিক্টিম কার্ড খেলা ওই ব্যক্তিই হন বা তাঁর সমর্থনে যারা সুর চড়িয়েছিলেন তাঁরা, সকলেই সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ কটা পয়েন্ট এড়িয়ে গিয়েছেন। প্রথমত, অংশুল কুমার প্রশ্ন করার সময় একবারও বলেননি তিনি দলিত। ফলে আর যাইহোক, দলিত বলে তাঁর কন্ঠ চেপে দেওয়া হয়েছে এই অভিযোগ ধোপে টেকে না।
কিন্তু এর থেকেও বড় সমস্যাটা নিয়ে কথা বলার জন্য যা দিয়ে এই লেখাটা শুরু হয়েছিল সেই গোড়ায় ফিরে যাই। কোনও কিছু না জানাটা অপরাধ নয়। কিন্তু আপনি যদি, "আমি জানি না তো জানি না। বেশ করেছি জানি না।" বা "যেটা জানি না, সেটার গুরুত্ব নেই" গোছের মনোভাব দেখান, তবে সেটা মূর্খের উল্লাস ছাড়া আর কিছু নয়।
একজনকে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সত্বেও তিনি ভুলটাকে গুরুত্ব দিতে চাননি। অথচ প্রকৃত স্কলার হলে তিনি সেটা থেকে শিক্ষা নিতেন। গায়ত্রী দেবী হয়ত তাঁর জ্ঞানের ঔদ্ধত্য দেখিয়েছেন, সেটা নিশ্চয়ই সমালোচনার যোগ্য। কিন্তু মূর্খের অহঙ্কারের থেকে বড় বিপদ আর কিছু হতে পারে না!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
