

বউবাজারের চন্দ্র বাড়ির দুর্গাপুজোয় দেবীর সামনে করজোড়ে অসুর। প্রতীকী ছবি - AI
৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
চন্দ্র পরিবার বৈষ্ণব মতাদর্শে বিশ্বাসী। অহিংসার পথ অনুসরণ করেন। তাঁদের মতে, দুর্গাপুজো একটি উৎসব। আর উৎসবের আনন্দে কোনরকম হিংসা বা রক্তপাতের ছবি থাকা উচিত নয়। তাই এখানে অসুর হাতজোড় করে দেবীর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন।
কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই সাবেকিয়ানা আর আভিজাত্যের এক অনন্য মিশেল। তবে এর চেনা ছবিগুলোর মধ্যেই কিছু পুজো নিজেদের স্বকীয়তায় একেবারে আলাদা। ঠিক তেমনই একটি ব্যতিক্রমী পুজো হল বউবাজারের চন্দ্র বাড়ির দুর্গাপুজো। এখানে মণ্ডপে ঢুকলে একটা অদ্ভুত শান্তির অনুভূতি হবে।
বাংলার আর পাঁচটা মণ্ডপে দেবী দুর্গার যে রণরঙ্গিণী রূপ আমরা দেখি, চন্দ্র বাড়িতে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এখানকার সবচেয়ে বড় চমক হল মহিষাসুর। অসুর এখানে দেবীর সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত নয়। তার বুকে দেবীর ত্রিশূলও গাঁথা নেই। বরং সে মাতৃমূর্তির পায়ের কাছে শান্ত হয়ে বসে আছে, আর তার দুই হাত জোড় করা। এমন করজোড়ে থাকা অসুর আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না।
বউবাজারের বনেদি এবং অত্যন্ত শিক্ষিত চন্দ্র-দের নাম কলকাতার ইতিহাসে বেশ উজ্জ্বল। এই পরিবারের অন্যতম স্বনামধন্য সদস্য ছিলেন গণেশ চন্দ্র। কলকাতার বিখ্যাত 'গণেশ চন্দ্র অ্যাভিনিউ' রাস্তাটি তাঁর নামেই রাখা হয়েছে। ১৮৭৭ সালে এই গণেশ চন্দ্রই বউবাজারের ২৩ নম্বর নির্মল চন্দ্র স্ট্রিটের বাড়িতে প্রথম দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন।
এই পরিবারের আরেক দিকপাল সদস্য ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, পণ্ডিত এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রতাপ চন্দ্র চন্দ্র। এই পরিবারের প্রতিটি পরতে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষা এবং সংস্কৃতির ছাপ। আজও সেই সুদৃশ্য ঠাকুরদালানে পা রাখলে বনেদিয়ানার গন্ধ যেন নাকে ভেসে আসে। এই সুবিশাল দালানের নকশা করেছিলেন সেই সময়কার প্রখ্যাত স্থপতি শ্রীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
চন্দ্র বাড়ির দুর্গাপুজোর এই ব্যতিক্রমী রূপের পিছনে রয়েছে তাঁদের পারিবারিক ধর্মীয় বিশ্বাস। চন্দ্র পরিবার বৈষ্ণব মতাদর্শে বিশ্বাসী। অহিংসার পথ অনুসরণ করেন। তাঁদের মতে, দুর্গাপুজো একটি উৎসব। আর উৎসবের আনন্দে কোনরকম হিংসা বা রক্তপাতের ছবি থাকা উচিত নয়। সেই ভাবনা থেকেই এখানকার প্রতিমার রূপ একেবারেই আলাদা।
মহিষাসুর এখানে কোনও দম্ভ বা আস্ফালন দেখায় না। অহিংসার প্রতীক হিসেবে সে দেবীর কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে। করজোড়ে থাকা অসুর আসলে ভক্তি এবং ক্ষমার প্রতীক। সে যেন নিজের সমস্ত অপরাধ স্বীকার করে মাতৃশক্তির কাছে মাথা নত করেছে। এই একটা দৃশ্যই চন্দ্র বাড়ির পুজোকে কলকাতার অন্যান্য সমস্ত পুজোর থেকে এক লহমায় আলাদা করে দেয়।
বনেদি বাড়ির পুজো মানেই নিজস্ব কিছু নিয়মকানুন থাকে। চন্দ্র বাড়ির পুজোতেও তার ব্যতিক্রম নেই। রথযাত্রার দিন রীতি মেনে কাঠামো পুজো দিয়ে এখানে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়। দেবী সেজে ওঠেন একেবারে সাবেকি ডাকের সাজে। তবে এই বাড়ির পুজোর একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও অনন্য প্রথা হল 'চারা পুজো'। বংশবৃদ্ধি, পরিবারের সার্বিক সমৃদ্ধি এবং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে এই বিশেষ আচারটি পালন করা হয়। মাতৃ আরাধনার পাশাপাশি প্রকৃতির আরাধনাকে এমন সুন্দরভাবে মিলিয়ে দেওয়ার দৃশ্য সত্যিই বিরল।
এছাড়া বৈষ্ণব মতে পুজো হওয়ায় এখানে কোনওদিন পশুবলির প্রথা ছিল না। দেবীকে সম্পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে নিরামিষ অন্নভোগ এবং নানা রকমের মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়।
সময় অনেক পাল্টেছে। শহরের বুকে মাথা তুলেছে সারি সারি বহুতল। কিন্তু বউবাজারের নির্মল চন্দ্র স্ট্রিটের ওই বাড়িটার অন্দরমহলে গেলে আজও যেন সময় থমকে যায়। পরিবারের সদস্যরা এখন অনেকেই নিজেদের কাজের প্রয়োজনে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছেন। তবে পুজোর কটা দিন সবাই আবার এক ছাদের তলায় ফিরে আসেন। বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরাও নিজেদের ঐতিহ্যকে সমানভাবে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। পুজোর সমস্ত দায়িত্ব পরিবারের সদস্যরাই ভাগ করে নেন। ঠাকুরদালান সংস্কার থেকে শুরু করে পুজোর আয়োজন, সবকিছুতেই থাকে পরিবারের সকলের সমান অংশগ্রহণ। পুরোনো ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়েই আজও চন্দ্র বাড়িতে ঠিক ততটাই নিষ্ঠা এবং ভক্তির সঙ্গে দেবীর আরাধনা হয়। করজোড়ে থাকা সেই অসুর আর শান্ত মাতৃমূর্তি আজও দর্শনার্থীদের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
