

কলকাতার 'ফ্লিট স্ট্রিট' বটতলার প্রতীকী ছবি - AI
১লা অক্টোবর, ২০২৬
বটতলার সাহিত্যের কথা বললে সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষজন আজও সিঁটকায়, ঠিক যেমনটা উনবিংশ শতকে কলকাতার বাবুরা করেছিল। কিন্তু আম বাঙালির জীবন ও মননে এই বটতলা এবং তাকে কেন্দ্র করে ছাপাখানার যে বিপ্লব ঘটেছিল, তার অবদান বিপুল। এই পর্ব অনেকটাই বদলে দিয়েছিল বাঙালির মনন ও যাপনকে।
উনিশ শতকের কলকাতা আসলে নবজাগরণের কলকাতা। ওই সময়ই কলকাতায় বাবু সংস্কৃতি জাঁকিয়ে বসেছিল। তাদের জাঁকজমক আর আভিজাত্যের কথা আমরা সবাই জানি। এর ঠিক পাশেই খাস কলকাতার বুকে বয়ে চলেছিল এক অন্য জীবন। চিৎপুর রোড, শোভাবাজার আর গরানহাটার অলিগলিতে তখন এক নতুন বিপ্লব শুরু হয়েছিল। তার হাত ধরেই বহুলাংশে বদলে যায় আগামীর বাঙালির পরিচয়।
চিৎপুর রোড, শোভাবাজার আর গরানহাটার অলিগলি
তখন সিসার হরফ আর কালির গন্ধে ম ম করত। এই জায়গাটিরই চলতি নাম ছিল বটতলা। আজকের আধুনিক প্রকাশনার ও ছাপাখানার আঁতুড়ঘর বলা যায় একে।
বাংলায় ছাপাখানা বা প্রিন্টিং প্রেসের প্রথম কাজ শুরু হয়েছিল শ্রীরামপুর মিশন আর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হাত ধরে। কিন্তু সেগুলো ছিল মূলত ধর্মপ্রচার আর পাঠ্যবই ছাপার বিষয়। ওখানে প্রথম বাইবেল বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের পড়ার মতো জিনিস সেখানে খুব একটা ছিল না। ১৮০৭ সালের দিকে বাবুরাম নামের এক ব্যক্তি প্রথম দেশীয় উদ্যোগে সংস্কৃত ও হিন্দি বই ছাপার কাজ শুরু করেন। এরপর এগিয়ে আসেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য। তিনি প্রথম সস্তায় বাংলা বই ছাপার উদ্যোগ নেন।
এরপর চিৎপুর এলাকায় যেন রাতারাতি ম্যাজিক ঘটে। কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠতে শুরু করে ছোট বড় অজস্র ছাপাখানা। বটতলা হয়ে ওঠে বাংলার নিজস্ব 'ফ্লিট স্ট্রিট'। উল্লেখ্য ফ্লিট স্ট্রিট হল লন্ডনের একটি বিখ্যাত রাস্তা যা একসময় গোটা ব্রিটেনের সংবাদপত্র ও ছাপাখানা শিল্পের প্রধান কেন্দ্র ছিল। তৎকালীন কলকাতার প্রকাশনার মূল হাব হিসেবে বটতলার গুরুত্ব ঠিক কতটা ছিল, সেটা বোঝাতেই সেইই বিশ্বখ্যাত রাস্তার সাথে এই তুলনা।
সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে বই পৌঁছে দেওয়ার এই যে উদ্যোগ, তা কলকাতার সংস্কৃতিতে এক বিশাল বদল এনেছিল। কারণ এই নবজোয়ারের হাত ধরে সাধারণ বাঙালির কাছেও ছাপার অক্ষরে পৌঁছে যেতে শুরু করে বই। ফলে পড়াশোনার চল বাড়ে, জ্ঞানের স্পৃহা চরম আকার ধারণ করে। সেইসঙ্গে ছাপার অক্ষরের হাত ধরে আদি রসের চর্চাও বাড়তে থাকে।
বটতলার বইয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর দাম আর বিষয়বস্তু। তথাকথিত ভদ্রলোক সমাজের পরিশীলিত রুচির খুব একটা তোয়াক্কা করত না এই প্রকাশনাগুলো। কারণ প্রকাশকরা বুঝেছিলেন সাধারণ মানুষ আসলে কী চায়। সেই অনুযায়ী বই ছাপা হত। সেই চিরাচরিত ব্যবসার প্রথা।
সবচেয়ে বেশি বিক্রি হত পঞ্জিকা। এই বটতলার ছাপাখানাগুলোর হাত ধরে বেণীমাধব শীল বা পি এম বাগচীর পঞ্জিকা তখন প্রতিটি বাঙালি গৃহস্থের ঘরে ঘরে পৌঁছে যেতে শুরু করে। এর পাশাপাশি দেদার ছাপা হত সস্তার রামায়ণ, মহাভারত আর পাঁচালি। তবে শুধু ধর্মকর্ম নয়, রোম্যান্স আর কেচ্ছার বইয়ের চাহিদাও ছিল তুঙ্গে।
ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর কাব্য বটতলায় কতবার যে ছাপা হয়েছে তার কোনও ইয়ত্তা নেই। সমসাময়িক সমাজের নানা চাঞ্চল্যকর ঘটনা নিয়েও চটিবই বেরোত। যেমন তারকেশ্বরের মোহন্ত আর এলোকেশীর সেই বিখ্যাত কেচ্ছা। এসব নিয়ে চটকদার বই হু হু করে বিক্রি হত। যা বটতলা সাহিত্য নামে খ্যাত বা কুখ্যাত হয়ে আছে। সমাজের ভণ্ডামি বা ইংরেজি বাবুদের অন্ধ অনুকরণ নিয়ে লেখা শ্লেষাত্মক প্রহসনগুলোও মানুষ দারুণ উপভোগ করত।
বটতলার বইয়ের কথা বললে তার প্রচ্ছদ আর ভেতরের ছবির কথা বলতেই হয়। সেই যুগে মেটাল এনগ্রেভিং বা লিথোগ্রাফি ছিল খুব দামি। তাই প্রকাশকরা বেছে নিয়েছিলেন সস্তা এবং সহজলভ্য কাঠখোদাই বা উডকাট পদ্ধতি।
কারিগররা কাঠের ব্লকে উল্টো করে ছবি খোদাই করতেন। মূলত ঐতিহ্যবাহী সূত্রধর বা ভাস্করেরাই এই কাজ করতেন। এরপর তাতে কালি লাগিয়ে কাগজের ওপর জোরালো চাপ দিয়ে ছাপ নেওয়া হতো। এই ছবিগুলোর একটা আলাদা ধাঁচ ছিল। মোটা মোটা রেখা আর চরিত্রগুলোর মুখের দারুণ সব অভিব্যক্তি ছবিগুলোকে একেবারে জীবন্ত করে তুলত। দেবদেবীর ছবি থেকে শুরু করে সমকালীন সমাজের ব্যঙ্গচিত্র বা কোনও খুনের দৃশ্য ফুটে উঠত এই পাতায়। যাঁদের অক্ষরজ্ঞান ছিল না, তাঁরা কেবল এই ছবিগুলো দেখেই পুরো গল্পের স্বাদ নিতে পারতেন। সাধারণ মানুষের নিজস্ব শিল্প হয়ে উঠেছিল এই কাঠখোদাই।
তৎকালীন শিক্ষিত সমাজ বা এলিট শ্রেণিরা কিন্তু বটতলার এই সাহিত্যকে খুব একটা ভালো চোখে দেখতেন না। তাঁদের অনেকেই মনে করতেন, এই সাহিত্য অশ্লীল এবং সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর। তাছাড়া ছাপা বই এত সহজলভ্য হয়ে ওঠাটা এলিটদের কাছে একটু মর্যাদাহানিকরও হয়ে উঠেছিল। রেভারেন্ড জেমস লং বা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো মানুষেরা নানা সময়ে বটতলার সাহিত্যের কড়া সমালোচনা করেছেন।
তবে মজার ব্যাপার হল শিক্ষিত সমাজের এই অবজ্ঞাই ছিল বটতলার সবচেয়ে বড় শক্তি। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম বা বড়লোকদের পৃষ্ঠপোষকতার উপর এদের বাঁচামরা নির্ভর করত না। বটতলার বই পড়েই বাংলার অন্দরমহলের অনেক নারী প্রথম নিজেদের অক্ষরপরিচয় ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। বাজারের ব্যবসায়ী, কারিগর বা গ্রামের কৃষকদের কাছে অবসর যাপনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল এই সস্তার চটিবই। শিক্ষিত সমাজের নাক সিঁটকানি এর জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র আঁচড় কাটতে পারেনি।
আজকের দিনে বটতলা সাহিত্য বা কাঠখোদাইয়ের সেই পুরোনো জাঁকজমক আর নেই। আধুনিক ছাপাখানা আর ডিজিটাল প্রযুক্তির দাপটে উডকাট প্রিন্ট কবেই হারিয়ে গেছে। কিন্তু উনিশ শতকের কলকাতার আসল স্পন্দনটা লুকিয়ে আছে ওই সস্তা কাগজের পাতাতেই। সাধারণ মানুষের হাসি, কান্না, রাগ আর বিনোদনের এমন খাঁটি দলিল আর কোথাও পাওয়া মুশকিল। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বটতলা শুধু একটা ভৌগোলিক জায়গার নাম নয়, এটি আসলে সমাজের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের নিজস্ব এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নাম।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
