৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
শ্রীলঙ্কার বিস্ময়কর দুর্গ সিগিরিয়া-এর নেপথ্যে পিতৃহত্যার ইতিহাস!

পিতৃহত্যার কলঙ্ক জড়িয়ে আছে শ্রীলঙ্কার সিগিরিয়া রক ফোর্ট্রেসের সঙ্গে। ছবি - Google

শ্রীলঙ্কার বিস্ময়কর দুর্গ সিগিরিয়া-এর নেপথ্যে পিতৃহত্যার ইতিহাস!

calender icon 2 ১লা অক্টোবর, ২০২৬

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাচীন দুর্গ সিগিরিয়া রক ফোর্ট্রেস গড়ে উঠেছিল প্রাণের ভয় থেকে!

প্রাণের ভয় থেকে তৈরি হয়েছিল প্রাচীন এই বিস্ময়কর দুর্গ! শ্রীলঙ্কার অতিবিখ্যাত সিগিরিয়া রক ফোর্ট্রেস গোটা দুনিয়া নজর কাড়ে। অথচ বাবাকে জীবিত দেওয়ালের মধ্যে গেঁথে দিয়ে এক বিদ্রোহী রাজকুমার প্রাণের ভয়ে গড়ে তুলেছিল এই অভেদ্য দুর্গ। যদিও সেই রাজকুমারের শেষ পরিণতিও ছিল মর্মান্তিক।

মূল বিষয়

শ্রীলঙ্কার ঘন সবুজ অরণ্যের বুক চিরে হঠাৎ করেই যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল গ্রানাইট পাথর। দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতির খেয়ালে তৈরি হওয়া কোনও বিচ্ছিন্ন স্তম্ভ। প্রায় ২০০ মিটার উঁচু এই পাথরের চূড়ায় এবং পাদদেশে ছড়িয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম সেরা এক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং স্থাপত্যের বিস্ময়। নাম সিগিরিয়া রক ফোর্ট্রেস।

১৯৮২ সালে ইউনেস্কো একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অনেকেই একে বিশ্বের 'অষ্টম' আশ্চর্য বলেন। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এর রূপ দেখে মুগ্ধ হন। কিন্তু এই চোখধাঁধানো বিস্ময়ের পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর পারিবারিক ইতিহাস। সিংহাসনের লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা এবং পিতৃহত্যার মতো জঘন্য অপরাধের প্রেক্ষাপট জড়িয়ে আছে এই বিস্ময়কর স্থাপত্যের সঙ্গে।

স্থাপত্য, বিজ্ঞান ও নান্দনিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন

সিগিরিয়ার গঠনশৈলী প্রাচীন নগর পরিকল্পনা এবং ল্যান্ডস্কেপ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অনন্য মাস্টারপিস। পাহাড়ের ঠিক নিচেই রয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত বাগান। সেখানে প্রতিসম নকশা এবং জটিল হাইড্রোলিক সিস্টেম ব্যবহার করে চমৎকার সব ঝরনা তৈরি করা হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হল, দেড় হাজার বছর আগে তৈরি হওয়া সেই হাইড্রোলিক প্রযুক্তি এতই উন্নত ছিল যে তা আজও সক্রিয় আছে। আজ‌ও বর্ষাকালে প্রাচীন ঝরনাগুলো সচল হয়ে ওঠে।

পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে ওঠার পথে দেখা মেলে বিখ্যাত সিগিরিয়া ফ্রেস্কো। খাড়া পাথরের গায়ে আঁকা এই রঙিন অপ্সরাদের ছবিগুলো আজও অমলীন। এরপর রয়েছে বিখ্যাত আয়না দেয়াল। প্রাচীনকালে এই দেওয়ালটিকে চিনামাটি ও অন্যান্য উপাদান দিয়ে এতটাই মসৃণ করে পালিশ করা হয়েছিল যে রাজা হেঁটে যাওয়ার সময় তাতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেতেন। পরবর্তীতে দর্শনার্থীরা এই দেওয়ালে তাঁদের অনুভূতি কবিতায় লিখে রেখে গেছেন। একে সিগিরিয়া গ্রাফিতি বলা হয়। এটি প্রাচীন সিংহলি ভাষার বিবর্তনের এক অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক দলিল।

চূড়ায় ওঠার একেবারে শেষ ধাপটি শুরু হয়েছে পাথর কেটে তৈরি একটি বিশাল আকারের সিংহের থাবার ভেতর দিয়ে। একসময় এখানে ইটের তৈরি একটি পূর্ণাঙ্গ সিংহের মাথা ও মুখও ছিল। সেই কারণেই এর নাম সিগিরিয়া বা সিংহ গিরি। এই সুবিশাল থাবার মধ্য দিয়ে একদম চূড়ায় পৌঁছালে দেখা যায় রাজার বিলাসবহুল প্রাসাদ এবং সুইমিং পুলের ধ্বংসাবশেষ।

বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রের অন্যতম সেরা আকর্ষণ

বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে সিগিরিয়া আজ শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বড় আইকন। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ পর্যটক, ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতত্ত্ববিদ এখানে ছুটে আসেন। এটি শুধু একটি প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ নয়। এটি প্রকৃতি, শিল্প এবং প্রযুক্তির এমন এক সংমিশ্রণ যা আধুনিক যুগের স্থপতিদেরও রীতিমতো ভাবিয়ে তোলে। শ্রীলঙ্কার অন্যান্য প্রাচীন শহরের তুলনায় সিগিরিয়া অনেক বেশি নাটকীয় এবং রহস্যময়। আর ঠিক এই কারণেই পর্যটকরা এর প্রতি চুম্বকের মতো আকৃষ্ট হন।

সিংহাসনের লোভে পিতৃহত্যা

এত সুন্দর এবং সুরক্ষিত একটি দুর্গ কেন এমন দুর্গম এক পাহাড়ের চূড়ায় তৈরি করা হয়েছিল সেই প্রশ্ন মনে জাগা স্বাভাবিক। এর উত্তর খুঁজতে গেলে এক ভয়াবহ পারিবারিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হবে। ইতিহাসবিদ সেনারথ পরণবিতারন এবং প্রাচীন পালি গ্রন্থ চুলবংশ থেকে এই দুর্গ তৈরির ভয়ঙ্কর পারিবারিক কেলেঙ্কারির কথা জানা যায়।

আরও পড়ুন
মহাকাশের জানালায় হঠাৎ ধরা দিল অন্য পৃথিবী
মার্কিন বিচারবিভাগের ‘হল অফ ফেম’-এ ১৯ বছরের বঙ্গসন্তান!
প্রথম দু’জন জানতেনই না যে তাঁরা ‘দলাই লামা’!
সেক্সের নেশায় রানি থেকে সিরিয়াল কিলার!

তখন পঞ্চম শতাব্দীর শেষভাগ। শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুর রাজবংশের ক্ষমতায় তখন রাজা ধাতসেন। তাঁর দুই পুত্র ছিল। বৈধ রানির ছেলে মোগল্লান। বংশের নিয়ম এবং প্রথা অনুযায়ী তিনিই ছিলেন সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী। অন্যদিকে রাজার এক উপপত্নীর গর্ভজাত পুত্র ছিলেন। নাম কাশ্যপ। সেইসঙ্গে রাজা ধাতসেনের একটি কন্যাও ছিল। সেনাপতি মিগারার সাথে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন।

এদিকে মিগারা তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ রাজকন্যার উপর নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালাতেন। একসময় বিষয়টি জানতে পেরে যান রাজা ধাতসেন। তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এর শাস্তি স্বরূপ সেনাপতি মিগারার মাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারেন। এদিকে মিগারার মা আবার সম্পর্কে রাজার আপন বোন ছিলেন!

এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে উঠে পড়ে লাগেন সেনাপতি মিগারা। তিনি পাল্টা কৌশল হিসেবে রাজপুত্র কাশ্যপের মনে সিংহাসন দখলের লালসা জাগিয়ে তোলেন। মিগারার সামরিক সহায়তায় কাশ্যপ ৪৭৩ খ্রিস্টাব্দে সরাসরি রাজবিদ্রোহ করে বসেন। তিনি রাজা ধাতসেনকে সিংহাসনচ্যুত করে বন্দি করেন। এরপর কাশ্যপ পিতার কাছে রাজ্যের গুপ্তধনের সন্ধান চান। রাজা ধাতসেন তাঁকে কালাওয়েওয়া হ্রদের কাছে নিয়ে যান। সেখানে একমুঠো জল তুলে তিনি বলেছিলেন, "এটাই আমার একমাত্র গুপ্তধন।"

এই কথা শুনে ক্ষুব্ধ ও হিতাহিত জ্ঞানশূন্য কাশ্যপ ভয়ঙ্কর ও জঘন্য একটি পদক্ষেপ করেন। পিতা অর্থাৎ রাজা ধাতসেনকে একটি দেওয়ালের মধ্যে জ্যান্ত গেঁথে নির্মমভাবে হত্যা করেন। এই ঘটনার কলঙ্ক আজও যেন শ্রীলঙ্কার ইতিহাসকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

প্রতিশোধের ভয় থেকে এক অভেদ্য দুর্গের জন্ম

পিতার এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর বৈধ উত্তরাধিকারী মোগল্লান প্রাণভয়ে ভারতে পালিয়ে যান। কিন্তু সিংহাসনের দখল পেলেও কাশ্যপের মনে কোনও শান্তি ছিল না। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, মোগল্লান একদিন ঠিক সেনাবাহিনী নিয়ে ফিরে আসবে এবং পিতার হত্যার চরম প্রতিশোধ নেবে। আর তাই অনুরাধাপুরের সমতল ভূমিতে রাজধানী রাখাটা মোটেও সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না বলে তিনি ঠিক করেন।

সৎ ভাইয়ের আক্রমণের এই প্যানিক ও ভয় থেকেই রাজা কাশ্যপ ৪৭৭ খ্রিস্টাব্দে অনুরাধাপুর থেকে রাজধানী সরিয়ে নেন। তিনি বেছে নেন দুর্গম এই সিগিরিয়া পাহাড়কে। এই খাড়া পাথরের চূড়াকে তিনি এক অভেদ্য দুর্গে পরিণত করেন। ভয় এতটাই তীব্র ছিল যে, কাশ্যপ সাধারণ কোনও প্রাসাদে থাকতে রাজি ছিলেন না। তাঁর প্রয়োজন ছিল এমন এক আশ্রয়, যেখানে কোনও শত্রু সহজে পৌঁছাতে পারবে না। টানা ১৮ বছর ধরে হাজার হাজার শ্রমিকের ঘামে ও রক্তে গড়ে ওঠে সিগিরিয়ার এই বিলাসবহুল, অথচ অবরুদ্ধ রাজপ্রাসাদ।

কাশ্যপের করুণ পরিণতি

এত সব চেষ্টা করে কাশ্যপ সিগিরিয়া গড়লেও নিয়তিকে ফাঁকি দিতে পারেননি। ৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সবচেয়ে বড় ভয়টিই সত্যি হয়ে ফিরে আসে। সৎ ভাই মোগল্লান দক্ষিণ ভারত থেকে এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে শ্রীলঙ্কায় ফিরে আসেন।

কাশ্যপ তাঁর দুর্ভেদ্য সিগিরিয়া দুর্গের ভেতরে সুরক্ষিত থাকতে পারতেন। কিন্তু অতিরিক্ত অহঙ্কার বা ভুল সামরিক সিদ্ধান্তের কারণে তিনি সিগিরিয়া থেকে নেমে আসেন। সমতল ভূমিতে হাতির পিঠে চড়ে তিনি মোগল্লানের বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে কাশ্যপের হাতি একটি জলাভূমির মধ্যে আটকে যায়। হাতিটিকে ঘোরাতে গেলে কাশ্যপের বিশাল সেনাবাহিনী ভুলবশত মনে করে, রাজা ভয় পেয়ে পিছু হটছেন। ফলে সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। কাশ্যপ যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন।

পরাজয় এবং শত্রুর হাতে বন্দি হওয়ার অপমান নিশ্চিত জেনে রাজা কাশ্যপ তাঁর নিজের তলোয়ার বের করেন। এরপর নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করেন! অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন, তিনি নিজের তলোয়ারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

মোগল্লান রাজা হওয়ার পর রাজধানী পুনরায় অনুরাধাপুরে ফিরিয়ে নিয়ে যান। আর সিগিরিয়ার সেই দুর্গ পরিণত হয় একটি শান্ত বৌদ্ধ বিহারে। সময়ের নিয়মে চোদ্দ শতকের পর এই স্থানটি পরিত্যক্ত হয় এবং জঙ্গলের আড়ালে হারিয়ে যায়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে উনবিংশ শতকে এটি পুনরায় খুঁজে পাওয়া যায়।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য