

সত্যি কি ১১,০০০ বছরের শহর? ছবি - Google
৩রা অক্টোবর, ২০২৬
বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, এক ভয়ঙ্কর বন্যার হাত থেকে পৃথিবীর জীবজগতকে বাঁচাতে নোহ একটি বিশাল নৌকা তৈরি করেছিলেন। বন্যা শেষে সেই নৌকা মাউন্ট আরারাত পর্বতে (যা আজকের তুরস্কের মধ্যে পড়ে) এসে থেমেছিল বলে অনেকের বিশ্বাস। ভ্যান হ্রদ থেকে এই মাউন্ট আরারাতের দূরত্ব মাত্র ১৪৫ কিলোমিটার। এই ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণেই ভ্যান হ্রদের জলের তলায় প্রাচীন শহর পাওয়ার খবরটি দ্রুত নোহ'র নৌকার গল্পের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।
পৃথিবীতে এমন অনেক রহস্য আছে যার উত্তর আজও পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। যদিও সেই সমস্ত উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রতিনিয়ত মাটি খুঁড়ে বা জলের তলা থেকে তুলে আনছেন বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতার নানান বিস্ময়। তুরস্কের ভ্যান হ্রদ ঠিক এমনই এক রহস্যময় জায়গা। সম্প্রতি এই হ্রদের ৭৫ ফুট জলের তলায় এমন এক আবিষ্কার সকলের সামনে উঠে এসেছে, যা গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। পাওয়া গেছে এক অতি প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ। কেউ কেউ বলছেন এই শহর ১১ হাজার ৭০০ বছরের পুরোনো। আবার অনেকের দাবি এর সঙ্গে বাইবেলে বর্ণিত নোহ'র নৌকার সরাসরি যোগ রয়েছে। কিন্তু আসল সত্যিটা ঠিক কী?
গবেষক এবং জনপ্রিয় ইউটিউবার ম্যাথিউ ল্যাক্রোইক্স তুরস্কের ভ্যান হ্রদের নিচে এক অদ্ভুত কাঠামোর সন্ধান পান। জলের প্রায় ৭৫ ফুট গভীরে পাথরের তৈরি একটি গোলাকার ইটের দেওয়াল দেখতে পান তিনি। দেওয়ালটি তিনটি ধাপে তৈরি। ম্যাথিউয়ের দাবি অনুযায়ী, এই কাঠামোটির বয়স প্রায় ১১ হাজার ৭০০ বছর। বরফ যুগের শেষের দিকের নানা ভৌগোলিক পরিবর্তনের তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে তিনি এই বয়স নির্ধারণ করেছেন। যদিও এত পুরোনো হওয়া সত্ত্বেও এর নির্মাণশৈলী বেশ আধুনিক। ম্যাথিউ মনে করেন এটি কোনও বৃহত্তর প্রাচীন শহরের একটি অংশ মাত্র। মানুষ হয়ত প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে বাঁচতে এমন শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করেছিল।
বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, এক ভয়ঙ্কর বন্যার হাত থেকে পৃথিবীর জীবজগতকে বাঁচাতে নোহ একটি বিশাল নৌকা তৈরি করেছিলেন। বন্যা শেষে সেই নৌকা মাউন্ট আরারাত পর্বতে (যা আজকের তুরস্কের মধ্যে পড়ে) এসে থেমেছিল বলে অনেকের বিশ্বাস। ভ্যান হ্রদ থেকে এই মাউন্ট আরারাতের দূরত্ব মাত্র ১৪৫ কিলোমিটার। এই ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণেই ভ্যান হ্রদের জলের তলায় প্রাচীন শহর পাওয়ার খবরটি দ্রুত নোহ'র নৌকার গল্পের সঙ্গে জুড়ে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং বেশ কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নোহ'র নৌকার শেষ আশ্রয়স্থলের কাছেই এই প্রাচীন শহর গড়ে উঠেছিল।
কিন্তু মূলধারার বিজ্ঞানীরা এই দাবি নস্যাৎ করে দিয়েছেন। তাঁদের মতে, মাউন্ট আরারাত এলাকায় নোহ'র নৌকার কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আজও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ভ্যান হ্রদের আবিষ্কারের সঙ্গে নোহ'র নৌকার সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। খবরটিকে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতেই মূলত এই দুই বিষয়কে জুড়ে দেওয়া হয়েছে হয়েছে বলে মনে করা হয়।
ম্যাথিউয়ের ১১ হাজার ৭০০ বছরের পুরোনো শহরের দাবিটি মূলধারার প্রত্নতাত্ত্বিকরা মেনে নেননি। জলের নিচে পাওয়া ওই পাথরের তৈরি গোলাকার ইটের দেওয়ালের কোনও কার্বন ডেটিং না হওয়ায় বৈজ্ঞানিকভাবে এই দাবিকে মান্যতা দিতে রাজি নন। তবে জলের নিচে প্রাচীন শহরের অস্তিত্ব একদমই মিথ্যে নয়। ২০১৭ সালে তুরস্কের একদল প্রত্নতাত্ত্বিক ভ্যান হ্রদের নিচেই একটি বিশাল দুর্গ আবিষ্কার করেন। বিজ্ঞানীদের মতে এই দুর্গটি প্রায় ৩ হাজার বছরের পুরোনো। এটি লৌহ যুগের বিখ্যাত উরার্তু সভ্যতার তৈরি। এই সভ্যতা ভ্যান রাজ্য নামেও পরিচিত ছিল।
অর্থাৎ জলের নিচে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন সত্যিই আছে। তবে সেটা ১১ হাজার বছরের পুরোনো নয়, বরং এখনও পর্যন্ত পাওয়া প্রমাণ অনুযায়ী তা ৩ হাজার বছরের প্রাচীন এক শক্তিশালী রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ।
প্রশ্ন জাগতে পারে, এত বড় একটা দুর্গ বা শহর জলের তলায় গেল কীভাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও একদিনের হঠাৎ আসা বন্যায় এই শহর ডোবেনি। এর পেছনে রয়েছে হাজার হাজার বছরের এক ভৌগোলিক পরিবর্তন। ৩ হাজার বছর আগে উরার্তু সভ্যতার মানুষ যখন এই দুর্গ বানিয়েছিল, তখন ভ্যান হ্রদের জলের স্তর বর্তমানের তুলনায় অনেক নিচে ছিল। সেই সময় দুর্গটি হ্রদের ধারের শুষ্ক মাটিতেই অবস্থিত ছিল। ভ্যান হ্রদ চারদিক থেকে আবদ্ধ। এর জল বেরিয়ে যাওয়ার কোনও প্রাকৃতিক পথ নেই।
প্রাগৈতিহাসিক যুগে আগ্নেয়গিরির লাভা হ্রদের জল বেরিয়ে যাওয়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ফলে হাজার হাজার বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হ্রদে জলের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। জলের এই ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলেই একসময়ের শক্তিশালী দুর্গটি সম্পূর্ণভাবে জলের নিচে তলিয়ে যায়।
ভ্যান হ্রদের জলের রাসায়নিক গঠন অত্যন্ত ক্ষারীয়। আর এই ক্ষারীয় জলের কারণেই ৩ হাজার বছর জলের তলায় থাকার পরও দুর্গের দেওয়ালগুলো প্রায় অবিকৃত রয়েছে।
প্রাচীন উরার্তু সভ্যতা তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এবং উন্নত এক সভ্যতা ছিল। আধুনিক তুরস্কের পূর্বাঞ্চল থেকে শুরু করে আর্মেনিয়া এবং ইরানের কিছু অংশ জুড়ে এদের রাজত্ব ছিল। তারা ব্রোঞ্জ এবং লোহার কাজে অত্যন্ত পারদর্শী ছিল। উঁচু পাহাড়ি এলাকায় বড় বড় পাথর দিয়ে শক্তিশালী দুর্গ তৈরিতে তাদের জুড়ি মেলা ভার ছিল। পাহাড়ি রুক্ষ এলাকাকে বসবাসযোগ্য করতে তারা অসাধারণ সব খাল ও বাঁধ নির্মাণ করেছিল। তাদের তৈরি কিছু খাল আজও স্থানীয় মানুষ ব্যবহার করেন। অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের মতো শক্তিশালী শত্রুর সঙ্গেও তারা দীর্ঘকাল লড়াই করেছিল।
ভ্যান হ্রদের জলের তলার এই আবিষ্কার আমাদের অতীত সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য দেয়। নোহ'র নৌকার কল্পকাহিনি বা ১১ হাজার বছরের পুরোনো শহরের জল্পনা বাদ দিলেও ৩ হাজার বছরের পুরোনো উরার্তু দুর্গটি কোনও অংশে কম বিস্ময়কর নয়। একইসঙ্গে এটা ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, প্রকৃতির কাছে মানুষ বড় অসহায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
