২৯শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
পুজো শেষে মন খারাপ? Post-Puja Blues কাটানোর অব্যর্থ দাওয়াই

পোস্ট-পুজো ব্লুজ দূর করার টোটকা। ছবি - AI

পুজো শেষে মন খারাপ? Post-Puja Blues কাটানোর অব্যর্থ দাওয়াই

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

পোস্ট-পুজো ব্লুজ কী?

হঠাৎ যেন চারপাশটা বড্ড শান্ত হয়ে গেছে। এই যে দুর্গাপুজোর পর মন একটা কেমন করা অনুভূতি, এটা কিন্তু শুধুই আবেগ নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর বিজ্ঞান। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় 'পোস্ট-হলিডে ব্লুজ' বা 'পোস্ট-ভ্যাকেশন সিনড্রোম'। আমাদের অতি পরিচিত ভাষায় এটাই হল 'পোস্ট-পুজো ব্লুজ'। উৎসবের প্রবল উত্তেজনার মধ্যে কটা দিন কাটানোর পর আবার সেই চেনা একঘেয়ে রুটিনে ফেরার সময় এমনটা হয়।

মূল বিষয়

বাঙালির সারা বছরের অপেক্ষার পালা শেষ। উমা বাপের বাড়ি ঘুরে আবার কৈলাসে ফিরে গিয়েছেন। ফলে চারিপাশে ঢাকের বাদ্যি থেমেছে। বিশাল বিশাল সব মণ্ডপের আলোগুলোও আর জ্বলছে না। বিজয়ার মিষ্টিমুখের পালাও মোটামুটি সাঙ্গ। সব মিলিয়ে চারপাশ কেমন যেন খাঁ খাঁ করছে। অবশ্য এটা বাস্তবে যত না খাঁ খাঁ করছে, তার থেকে অনেক বেশি বাঙালির মনের মধ্যে শূন্যতা ঘিরে ধরেছে।

আসলে দুর্গাপুজোর এক-দেড় মাস আগে থেকে শপিংয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। তারপর মহালয়া থেকে শুরু হওয়া একটানা উন্মাদনা, প্যান্ডেলে হপিং আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার পর দশমিটা যেতেই সবকিছু যেন হঠাৎ করে থেমে গিয়েছে। হঠাৎ যেন চারপাশটা বড্ড শান্ত হয়ে গেছে। এই যে দুর্গাপুজোর পর মন একটা কেমন করা অনুভূতি, এটা কিন্তু শুধুই আবেগ নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর বিজ্ঞান। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় 'পোস্ট-হলিডে ব্লুজ' বা 'পোস্ট-ভ্যাকেশন সিনড্রোম'। আমাদের অতি পরিচিত ভাষায় এটাই হল 'পোস্ট-পুজো ব্লুজ'। উৎসবের প্রবল উত্তেজনার মধ্যে কটা দিন কাটানোর পর আবার সেই চেনা একঘেয়ে রুটিনে ফেরার সময় এমনটা হয়। এই সময় এটা মানুষের মস্তিষ্কের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক জৈবিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু কেন এমনটা হয়? এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায়টাই বা কী?

ডোপামিন ক্র্যাশ

আমাদের আনন্দ, উত্তেজনা আর ফুর্তির অনুভূতিগুলো মূলত নিয়ন্ত্রণ করে ডোপামিন এবং সেরোটোনিনের মতো কিছু রাসায়নিক পদার্থ। পুজোর কটা দিন নতুন জামা পরে ঠাকুর দেখা বা প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর কারণে মস্তিষ্কে প্রচুর পরিমাণে ডোপামিন নির্গত হয়। মস্তিষ্ক তখন একটা চরম আনন্দের ঘোরের মধ্যে থাকে। কিন্তু দশমীর পর উৎসবের আমেজ যখন হঠাৎ থেমে যায়, তখন ডোপামিনের মাত্রাও এক ধাক্কায় অনেকটা নিচে নেমে আসে। মহালয়া থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিদিন সকালে ওঠার যে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে, একাদশীর সকালে উঠে সেই লক্ষ্যটাই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। মস্তিষ্ক তখন ডোপামিনের প্রবল অভাব বোধ করে। এই রাসায়নিক শূন্যতাই আসলে মন খারাপের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রঙিন দুনিয়া থেকে সাদামাটা বাস্তবে ফেরা

মনস্তত্ত্বে 'কন্ট্রাস্ট এফেক্ট' বলে একটি চমৎকার বিষয় রয়েছে। এটি হল দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির তুলনামূলক প্রভাব। পুজোর সময় আমাদের চারপাশের পরিবেশ আলোয় মোড়া থাকে। কাজের কোনো চাপ থাকে না। চারদিকে শুধু উৎসবের আমেজ আর মানুষের ভিড়। এরপর হঠাৎ করেই যখন আবার সেই চেনা রুটিনের জীবনে ফিরতে হয়, তখন মস্তিষ্ক এই প্রবল বৈপরীত্য সহজে মেনে নিতে পারে না। অষ্টমীর রাতে শহরের ভিড় ঠেলে আনন্দ করার ঠিক দু'দিন পরেই অফিসে গিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসা বা আবার প্রতিদিনের সংসার সামলানোর মধ্যে আকাশপাতাল তফাত রয়েছে। রঙিন উৎসবের পর রোজকার জীবনকে মস্তিষ্কের কাছে বড্ড বেশি সাদামাটা এবং একঘেয়ে বলে মনে হতে থাকে।

অপেক্ষার আনন্দের সমাপ্তি

মনোবিজ্ঞান বলছে, মানুষ মূল ঘটনার চেয়ে সেই ঘটনার জন্য অপেক্ষার সময়টাকে বেশি উপভোগ করে। একে বলা হয় 'অ্যান্টিসিপেটরি জয়'। পুজোর কয়েক মাস আগে থেকে প্ল্যানিং, কেনাকাটা এবং দিন গোনার মধ্যে দিয়ে আমাদের মনে একটা বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হতে থাকে। কিন্তু দশমীর পর সেই দীর্ঘ অপেক্ষারও সমাপ্তি ঘটে। সামনে আর কোনও বড় আনন্দের লক্ষ্য না থাকায় মন স্বাভাবিকভাবেই বিষণ্ণ হয়ে পড়ে।

সোশ্যাল জেটল্যাগ

পুজোর কদিন আমাদের স্বাভাবিক ঘুমের চক্র পুরোপুরি ব্যাহত হয়। সারা রাত জেগে ঠাকুর দেখা, অনিয়মিত খাওয়া দাওয়া আর প্রচুর হাঁটাচলার ফলে শরীর চরম ক্লান্ত থাকে। রুটিনের এই আকস্মিক পরিবর্তনকে সোশ্যাল জেটল্যাগ বলা হয়। শরীর যখন ক্লান্ত থাকে তখন তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের উপর। শারীরিক ক্লান্তির কারণেই উৎসব শেষের দিনগুলোতে মানুষের মধ্যে খিটখিটে ভাব, অকারণ কান্না পাওয়া বা বিষণ্ণতা দেখা যায়।

আরও পড়ুন
ফ্রিজ থেকে খাবার বার করে গরম করছেন? সর্বনাশ!
দিনে কত কাপ চা-কফি নিরাপদ? কিডনি বাঁচাতে জানুন!
পুজোর ‘হ্যাংওভার’ কাটছে না? কাজে ফেরার ৩ টোটকা

এই 'পোস্ট-পুজো ব্লুজ' বা উৎসব-পরবর্তী বিষণ্ণতাকে খুব বেশি প্রশ্রয় দিলে রোজকার জীবনে ফেরা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবে এটাও ঠিক যে জীবনের চেনা ছন্দে মসৃণভাবে ফেরার জন্য দরকার একটা মোক্ষম রুটিন।

গিয়ার পরিবর্তনের মতো রুটিনে ফেরা

গাড়ির গিয়ার যেমন এক ধাক্কায় এক থেকে হঠাৎ চারে তোলা যায় না, ঠিক তেমনই দুর্গাপুজোর পর প্রাত্যহিক জীবন বা পরিচিত রুটিনে ফেরার ক্ষেত্রেও এক ধাক্কায় সবকিছু করে ফেলার চেষ্টা করবেন না। ছুটির পর এক ধাক্কায় কাজের পুরোপুরি চাপ নেওয়াটা মস্তিষ্কের জন্য বেশ কষ্টকর। তাই সুইচ চেঞ্জের এই পর্যায়টা হতে হবে কিছুটা ধীরে। ছুটির পর প্রথম অফিসে গিয়ে বা কাজে ফিরে প্রথমেই বড় কোনও প্রজেক্ট বা জটিল হিসাব নিয়ে বসাটা ঠিক নয়। বরং প্রথম দিনটা মেল চেক করা, ডেস্ক গোছানো, আগামী সপ্তাহের কাজের একটা তালিকা বানানো বা সহকর্মীদের সঙ্গে বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য বরাদ্দ রাখুন। এতে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে কাজের চাপ নেওয়ার জন্য বা পুরনো ছন্দে ফেরার জন্য প্রস্তুত হবে।

ছোট আনন্দের খোঁজ

পুজোর বিশাল আনন্দগুলোর বদলে এবার দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট আনন্দের খোঁজ করতে হবে। অফিস থেকে ফিরে সোজা ঘুমিয়ে না পড়ে নিজের পছন্দের কিছু করার চেষ্টা করুন। হয়ত অনেকদিন ধরে ভাবছিলেন একটা ভালো বই পড়বেন বা পছন্দের কোনও সিনেমা বা সিরিজ দেখবেন, সেটা শুরু করতে পারেন। কিংবা ফুড ডেলিভারি অ্যাপ থেকে নিজের পছন্দের কোনও খাবার আনিয়ে নিন। এই ছোট ছোট প্রাপ্তিগুলো মস্তিষ্কে আবার নতুন করে ডোপামিন ক্ষরণ শুরু হতে সাহায্য করবে। মন বুঝবে যে উৎসব শেষ হলেও জীবনের আনন্দ ফুরিয়ে যায়নি।

বিজয়ার আড্ডাই হোক সোশ্যাল বাফার

পুজোর ওই চরম কোলাহল থেকে হঠাৎ করে সম্পূর্ণ একা হয়ে যাওয়াটা মন খারাপের একটা বিরাট কারণ। তাই এই শূন্যস্থান ভরাট করতে বিজয়ার ঐতিহ্যকে কাজে লাগান। পুজোর সময় যাদের সঙ্গে একদম দেখা হয়নি, ছুটির দিনের বিকেলে তাদের সঙ্গে পাড়ার কোনও ক্যাফেতে বসে চায়ের আড্ডা দিন বা নদীর পাড়ে বসে জমিয়ে গল্প করুন। বাড়িতে বন্ধুদের ডেকে একটু মিষ্টিমুখ আর পুজোর গল্প করার মধ্যে দিয়েও একাকীত্বের ধাক্কা অনায়াসে কাটিয়ে ওঠা যায়।

ডিটক্স এবং ঘুমের চক্র ঠিক করা

পুজোর সোশ্যাল জেটল্যাগ কাটাতে শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়াটা সবচেয়ে জরুরি। টানা কয়েকদিনের অনিয়ম আর বাইরের মশলাদার খাবারের পর পেটকে এবার একটু রেহাই দিন। বাড়িতে হালকা ঝোল ভাত বা সাধারণ খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। অন্তত এক সপ্তাহ রাত দশটা বা সাড়ে দশটার মধ্যে ঘুমোতে যাওয়ার রুটিন তৈরি করুন। আট ঘণ্টার নিশ্চিন্ত ঘুম শরীরকে তরতাজা করবে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবার আগে দরকার পর্যাপ্ত ঘুম।

পরবর্তী লক্ষ্যের প্রস্তুতি

সামনে কোন‌ও আনন্দের জন্য অপেক্ষা থাকলে মানুষের মন আপনাআপনি ভালো থাকে, খুশি খুশি অনুভূতিতে মজে থাকে। পুজোর অপেক্ষা শেষ হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু সামনেই তো শীতকাল আসছে। ফলে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস, জ্ঞান মঞ্চ, মধুসূদন মঞ্চ বা গিরিশ মঞ্চের মতো কোথাও গিয়ে নাটক দেখা অথবা বা নন্দনে আসন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়া। বন্ধুদের সঙ্গে কোনও শর্ট ট্রিপ বা শীতের পিকনিকের প্ল্যান এখন থেকেই শুরু করে দিন। এই নতুন পরিকল্পনাগুলো আপনাকে আবার সামনে তাকানোর বা নতুন করে কিছুর জন্য অপেক্ষা করার একটা দারুণ অনুভূতি দেবে। দেখবেন এভাবেই ধীরে ধীরে মন খারাপের মেঘ খুব সহজেই কেটে গেছে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য