

বিশ্বনাথ দত্ত। ছবি - Google
বিশ্বনাথ দত্তের জীবন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জগমোহন ডালমিয়ার কথা আসবেই। ১৯৭৭ সালে জগমোহন ডালমিয়াকে সিএবি কোষাধ্যক্ষ হিসেবে ক্রিকেট প্রশাসনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বিশ্বনাথ দত্তের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
ভারতীয় ক্রীড়া প্রশাসনে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের অবদান শুধু তাঁদের পদ বা দায়িত্ব দিয়ে মাপা যায় না। তাঁদের প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় তাঁরা কেমন প্রতিষ্ঠান গড়ে গেলেন, কাদের কাজের সুযোগ করে দিলেন এবং নিজেদের কর্মজীবনের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কী রেখে গেলেন তার মধ্যে দিয়ে। বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। কলকাতা ময়দানে যাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, যাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সিএবি, ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ প্রশাসন এবং বাংলার ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাস। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খেলার মাঠে ক্রিকেটার ও ফুটবলাররা যেমন নিজেদের প্রতিভা দিয়ে ইতিহাস লেখেন, তেমনই মাঠের বাইরে কিছু মানুষ নীরবে সেই ইতিহাস রচনার পরিবেশ তৈরি করেন। শতবর্ষ পূর্ণ হওয়ার দিনে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে বারবার মনে হয়, একজন প্রশাসকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর চেয়ারে নয়, তাঁর কাজের মধ্যে। আর তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার বেঁচে থাকে তাঁর কাজের সাফল্যেই।
১৯২৬ সালের ১২ অক্টোবর জন্ম বিশ্বনাথ দত্তের। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ক্রীড়া প্রশাসন মানে শুধু ক্ষমতা ভোগ করা নয়। এর অর্থ দায়িত্ব নেওয়া, কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রয়োজনে নিজের সিদ্ধান্তের দায় স্বীকার করার সাহস রাখা। কলকাতার ময়দানে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ প্রশাসক হিসেবে। তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল দৃঢ়তা, সিদ্ধান্তে ছিল স্পষ্টতা। কিন্তু তাঁর গুরুত্ব শুধু কঠোরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বুঝতেন, একটি ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে সংগঠনের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হয়। ক্লাব, ক্রিকেটার, ফুটবলার এবং প্রশাসকদের নিয়ে গড়ে ওঠা বিশাল ক্রীড়াজগৎকে সঠিক পথে চালানোর জন্য প্রয়োজন নীতি, শৃঙ্খলা এবং দূরদৃষ্টি। এই কারণেই কলকাতার ময়দানের ইতিহাসে তিনি একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এমন এক ক্রীড়া সংস্কৃতি, যেখানে মানুষের পরিচয় তৈরি হতো দীর্ঘদিনের কাজ, নিষ্ঠা এবং গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে দিয়ে।
সিএবি-র সঙ্গে বিশ্বনাথ দত্তের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘ এবং গভীর। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি সিএবি-র সচিব, ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত সভাপতি এবং ১৯৮৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বাংলার ক্রিকেটকে সংগঠিত রাখা, প্রশাসনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। আজ আমরা যখন ইডেন গার্ডেন্সের দিকে তাকাই, বাংলার ক্রিকেটের দীর্ঘ ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলি, তখন মনে রাখা দরকার, এই ইতিহাস শুধু মাঠে ব্যাট-বলের লড়াই দিয়ে তৈরি হয়নি। এর পিছনে ছিলেন এমন কিছু প্রশাসক, যাঁরা দিনের পর দিন সংগঠনের ভিত শক্ত করেছেন। বিশ্বনাথ দত্ত তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
১৯৮২ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৮ সালে তিনি বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়ের ভারতীয় ক্রিকেট আজকের মতো বিপুল অর্থ ও বাণিজ্যিক শক্তির অধিকারী ছিল না। কিন্তু সেই সময়েই ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার মতো একাধিক ঘটনা ঘটছিল। ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপ প্রথমবার ইংল্যান্ডের বাইরে ভারত ও পাকিস্তানে আয়োজিত হয়েছিল। বোর্ডের সহ-সভাপতি হিসেবে বিশ্বনাথ দত্ত সেই সময়ের ক্রিকেট প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। তাঁর প্রশাসনিক জীবনের আরও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ১৯৮৯ সালের ঘটনা। অনুমতি ছাড়া বিদেশে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে যাওয়ার পর কয়েকজন নামী ভারতীয় ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে বোর্ড কঠোর শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে আদালতের পর্যবেক্ষণের পর সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। এই ঘটনা তাঁর প্রশাসনিক জীবনের জটিল দিকটিও সামনে আনে। একজন প্রশাসকের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে সবাই একমত হবেন, এমন নয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রশ্নে তাঁর দৃঢ়তা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের অবস্থান সংশোধন করার ঘটনাও তাঁর কর্মজীবনের অংশ।
বিশ্বনাথ দত্তের জীবন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জগমোহন ডালমিয়ার কথা আসবেই। ১৯৭৭ সালে জগমোহন ডালমিয়াকে সিএবি কোষাধ্যক্ষ হিসেবে ক্রিকেট প্রশাসনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বিশ্বনাথ দত্তের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরবর্তী সময়ে ডালমিয়া ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসনের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের নেতৃত্বে পৌঁছে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক মানচিত্রে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু তাঁর এই যাত্রার প্রথম দিকে একজন মানুষ ডালমিয়ার মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন। তাঁকে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন, প্রশাসনের পরিসরে এগিয়ে আসতে সাহায্য করেছিলেন। এখানেই বিশ্বনাথ দত্তের দূরদৃষ্টির পরিচয়। একজন যোগ্য মানুষকে চিনতে পারা এক ধরনের ক্ষমতা। আর তাঁকে কাজের সুযোগ দিয়ে নিজের দক্ষতা প্রমাণের জায়গা তৈরি করে দেওয়া আরও বড় গুণ। একজন মানুষের নিজের সাফল্য অবশ্যই তাঁর নিজের পরিশ্রমের ফল। কিন্তু সেই সাফল্যের প্রথম দরজাটি যিনি খুলে দেন, তাঁর অবদানও ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকা উচিত। বিশ্বনাথ দত্তের জীবন আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
বিশুদা (বিশ্বনাথ দত্তকে এই নামেই সকলে ডেকে এসেছেন) শুধু ক্রিকেট প্রশাসনের মানুষ ছিলেন না। ভারতীয় ফুটবল প্রশাসনেও তাঁর অবদান ছিল দীর্ঘদিনের। ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি আইএফএ-র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কলকাতার ময়দানে ফুটবলের যে ঐতিহ্য, যে ক্লাব সংস্কৃতি এবং যে আবেগ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে রয়েছে, তার সঙ্গে তাঁর কর্মজীবনের গভীর যোগ ছিল। ক্রিকেট ও ফুটবল, দুটি আলাদা খেলা। তাদের চাহিদা আলাদা, প্রশাসনিক সমস্যাও আলাদা। অথচ দুই ক্ষেত্রেই নিজের কাজের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা সহজ নয়। বিশ্বনাথ দত্ত সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন, যাঁর নাম দুই খেলার প্রশাসনিক ইতিহাসেই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁর নিজের ভাই প্রয়াত প্রদ্যুৎ দত্ত পরবর্তীকালে তাঁর স্থানেই আইএফএ সচিব হন। এমনকী বিশুদা-র ছেলে সুব্রত দত্তও আইএফএ সচিব হন পরবর্তী ক্ষেত্রে, তিনি ফেডারেশনেরও সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন দীর্ঘদিন।
মানুষ চলে যান। সময় বদলে যায়। নতুন প্রজন্ম আসে। পুরনো দিনের অনেক ঘটনাই ধীরে ধীরে স্মৃতির আড়ালে চলে যায়। কিন্তু কিছু নাম থেকে যায় আমাদের চেনা জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে। ইডেন গার্ডেন্সের বিশ্বনাথ দত্ত স্ট্যান্ড তেমনই একটি স্মারক। ইডেন শুধু একটি ক্রিকেট মাঠ নয়। এই মাঠের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার ক্রিকেটপ্রেম, অসংখ্য ক্রিকেটারের স্বপ্ন, বহু প্রজন্মের আবেগ এবং ভারতীয় ক্রিকেটের অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত। সেই মাঠের একটি স্ট্যান্ডে বিশ্বনাথ দত্তের নাম থাকা তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবনের প্রতি যথার্থ সম্মান। তবে কোনও স্ট্যান্ডের নামের চেয়েও বড় স্মারক হল তাঁর কাজ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জানা।
২০১৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্বনাথ দত্তের প্রয়াণে ভারতীয় ক্রীড়াজগৎ একজন অভিজ্ঞ প্রশাসককে হারিয়েছিল। তৎকালীন সিএবি সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে ‘মাস্টার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’ বলে স্মরণ করেন। সেই কথার মধ্যেই ছিল তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি।
(প্রাক্তন ক্রিকেটার আব্দুল মোনায়েমের সঙ্গে কথার ভিত্তিতে লেখা)
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
